রাজবাড়ীর দৌলতদিয়া ঘাটে বাস ডুবির ঘটনায় স্বজনহারাদের আহাজারি যেন থামছে না। তাদের গগনবিদারী মাতমে ভারী হয়ে উঠছে পদ্মাপাড়ের পরিবেশ। বুধবার বিকালে ঘাটের পন্টুন থেকে পদ্মায় ডুবে যাওয়া বাস থেকে ২৬ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। তবে বিভীষিকাময় ওই ঘটনায় ১১ জন যাত্রী মৃত্যুর দুয়ার থেকে প্রাণে বেঁচে ফিরেন। এদের মধ্যে ৪ জন পন্টুনে ওঠার পর বাস থেকে নেমে পড়েন। বাকি সাতজন ডুবে যাওয়া বাসের ভেতর থেকে ভেসে ওঠেন। অলৌকিকভাবে বেঁচে ফেরা এসব যাত্রী বাস থেকে বেরিয়ে আসার লোমহর্ষক বর্ণনা দিয়েছেন।
ডুবে যাওয়া বাস থেকে বেরিয়ে আসার অলৌকিক ঘটনার বর্ণনা দেন মোহাম্মদ রাজীব সরদার। তিনি বলেন, বাস পানিতে পড়ার পর জানালা ধরে বের হওয়ার চেষ্টা করছিলাম। বাসের ভেতরে নিচের দিক থেকে পানি ঢুকে যে স্রোত তৈরি হইছে তার সঙ্গেই আমি ভেসে যাই। কীভাবে যে বের হইছি, উপরওয়ালা জানে। তিনি আরও জানান, গোয়ালন্দের জামলতা এলাকা থেকে দুর্ঘটনাকবলিত বাসটিতে উঠেছিলেন তিনি। বসেছিলেন বাসের একেবারে পেছনের দিকের একটি আসনে। দুর্ঘটনাকবলিত বাসটির সব আসনেই যাত্রী ছিল। দৌলতদিয়া ফেরিঘাটের জিরো পয়েন্ট, অর্থাৎ যেখানে যানবাহনগুলো ফেরির জন্য অপেক্ষা করে, সেখান থেকেও দুইজন যাত্রী ওই বাসে উঠেছিলেন। তিনি জানান, ফেরিতে উঠতে গিয়ে শেষ মুহূর্তে জায়গা না পাওয়ায় পন্টুনের সামনেই পরবর্তী ফেরির জন্য অপেক্ষা করছিল কুমারখালী থেকে ঢাকাগামী বাসটি। জানালা দিয়ে পরের ফেরিটি ঘাটেও ভিড়তে দেখেছিলেন তিনি। কিন্তু কী যে হলো, কিছুই বুঝি নাই। বাসটা হঠাৎ টান দিয়ে গিয়ে নদীতে পড়লো। রাজীব বলেন, পড়ে যাওয়ার পর বাস তখন পানির নিচে। পানির নিচে থাকার কারণে আমার গায়ের ওপরে প্রায় ১২-১৩ জন পড়ছে। আমি আপ্রাণ চেষ্টা করছি পানির মধ্যে, আমার গায়ের উপরে পড়ার কারণে তখন আমি আর পারছিলাম না। ওই সময় বাসের জানালা ধরে নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করেন রাজীব। তিনি বলেন, জানালা ধরার পরে আরও এক-দুজন পিঠের উপরে দাঁড়ায়, একজন ঘাড়ে। আমি সামনে দিয়ে না যাইয়া বাসের তলার দিকে যাই। সে সময় হঠাৎ পানির স্রোতের সহায়তা পান রাজীব। তিনি বলেন, বাস যখন দেবে গেছে পানির নিচে, তখন বাসের যে একটা ভুম করে জানালা দিয়ে পানির একটা স্রোত আসে। আমি ওই পানির স্রোতের ধাক্কায় উপরে উঠি। হঠাৎ দেখলাম আমি বাসের ভেতর থেকে বের হইছি। রাজীব বলেন, কোন জায়গা দিয়ে বের হইছি বা কীভাবে বের হইছি আমি নিজেও জানি না। পানি থেকে পন্টুনে উঠে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নেন রাজীব। পরে ভাইকে ফোন দিলে তিনি এসে তাকে বাড়িতে নিয়ে যান।
বাস ডুবির ঘটনায় অলৌকিকভাবে বেঁচে ফিরেছেন কুষ্টিয়ার খোকসার যুবক খাইরুল ইসলাম খাঁ (২৬)। তবে নদী সাঁতরে তীরে ওঠার পর এক তথাকথিত উদ্ধারকারীর হাতে নিজের মুঠোফোনটি খুঁইয়েছেন তিনি। মোবাইল ফোন হারালেও ভয়াবহ এ দুর্ঘটনা থেকে বেঁচে ফিরতে পেরে আল্লাহ্তায়ালার শুকরিয়া আদায় করছেন খাইরুল। ঈদের ছুটি শেষে বুধবার কুষ্টিয়া থেকে ছেড়ে আসা ঢাকামুখী সৌহার্দ্য পরিবহনের ওই বাসে করে কর্মস্থল ঢাকায় ফিরছিলেন খাইরুল। তিনি খোকসা উপজেলার আমবাড়ীয়া গ্রামের মৃত কুদ্দুস খাঁর ছেলে। চাকরি করেন ঢাকার একটি টেক্সটাইল মিলের মেশিনম্যান পদে। মৃত্যুর দুয়ার থেকে বেঁচে ফেরা খাইরুল জানান, বাসটিতে তার আসন নম্বর ছিল বি-২। দুপুর ২টা ৪২ মিনিটে খোকসা স্ট্যান্ড থেকে বাসটি ছাড়ার সময় প্রতিটি আসন পূর্ণ ছিল। দৌলতদিয়া ঘাটে বাসটি ফেরিতে উঠতে গিয়ে হঠাৎ প্রচণ্ড ঝাঁকুনি লাগে। মুহূর্তের মধ্যে বাসটি নদীতে পড়ে যায়। ওই সময় মাত্র কয়েক সেকেন্ডের ব্যবধানে নিজের সিটে বসে থাকা খাইরুল বাসের দরজা দিয়ে নদীতে ছিটকে পড়েন। তিনি বলেন, কীভাবে যে নদীতে ছিটকে পড়লাম বলতে পারি না। শুধু এটুকু মনে আছে- মাত্র ৫ সেকেন্ডের মধ্যে সব ওলটপালট হয়ে গেল। সাঁতরে তীরে ওঠার পর এক লোক সাহায্য করার নাম করে আমার ফোনটি নিয়ে আর ফেরত দেয়নি। খাইরুল ইসলাম জানান, তার পাশের সিটের যাত্রী সাদা টি-শার্ট পরা যুবকটিও খোকসা স্ট্যান্ড থেকে আগেই বাসে উঠে বসেছিলেন। তাদের বাসটি ফেরিঘাটে পৌঁছানোর পর পাশের সিটের যুবক নেমে যান। কয়েক মিনিট পর আবার সিটে ফিরে আসেন। খাইরুল তাকে বসতে দেয়ার জন্য উঠে দাঁড়ান। ঠিক তখনই তাদের বাসটি ফেরিতে ওঠার চেষ্টা করছিল। হঠাৎ ঝাঁকুনি লাগলে তিনি বাসের দরজা দিয়ে ছিটকে নদীতে পড়ে যান। তার দেখা বাসটিতে থাকা হাতেগোনা কয়েকজন যাত্রী নদী সাঁতরে ফেরি ও পন্টুনে উঠে জীবন বাঁচাতে পেরেছেন। খাইরুল জানায়, দুর্ঘটনার পর তার পাশের আসনের যুবকটির সঙ্গে আর দেখা হয়নি। তিনি জানান, বাসের প্রতিটি সিট যাত্রীতে ঠাঁসা ছিল। প্রত্যেক নারী যাত্রীর সঙ্গে শিশু ছিল। সিটে বসে থাকা কমপক্ষে ৪০ জন নারী ও শিশু যাত্রী ডুবে যাওয়া বাসের মধ্যে আটকা পড়েছিল। বাসটি চালক নিজেই চালাচ্ছিলেন।
ডুবে যাওয়া বাস থেকে অলৌকিকভাবে বেরিয়ে আসে আট বছর বয়সী আলিফ। সাঁতরে পন্টুনের কাছে আসলে তীরে থাকা মানুষজন গামছা ফেলে তাকে টেনে তুলে। তীরে ওঠার পরপরই মায়ের জন্য হাউমাউ করে কান্নায় ভেঙে পড়ে আলিফ। সে জানায়, বাসটি যখন পন্টুন থেকে পদ্মায় পড়ে যাচ্ছিল তখন মায়ের কোলে বসেছিল। বাসটি ডুবে যাওয়ার মুহূর্তে মা তাকে জানালা দিয়ে বের করে দেয়। উপরে ভেসে উঠলে সাঁতরে পন্টুনের কাছে আসে। আলিফ আরও জানায়, আমাকে জানালা দিয়ে বের করে দিতে পারলেও মা বের হতে পারেননি।
ডুবে যাওয়া বাস থেকে এক হাতে মেয়েকে নিয়ে বেরিয়ে আসেন শাকিলা। অন্য হাতে সাঁতরে পন্টুনের কাছে আসেন তিনি। তখন পন্টুনে দাঁড়িয়ে থাকা লোকজনকে শাকিলা বলেন, আমার মেয়েকে ধরেন। আমি ছেলেকে নিয়ে আসি। তখন পন্টুনে দাঁড়িয়ে থাকা লোকজন মেয়ের সঙ্গে মাকেও টেনে উপরে নিয়ে আসেন। কারণ তারা বুঝেছিলেন শাকিলা ছেলেকে উদ্ধারে গেলে আর ফিরে আসতে পারবেন না। পন্টুনে তোলার পরপরই অজ্ঞান হয়ে যান শাকিলা। এই দুর্ঘটনায় শাকিলার ছেলে সাবিতের (৮) ও ননদের মেয়ে সোহানা (১০) প্রাণ হারিয়েছে। বেঁচে ফিরেছেন শাকিলার মেয়ে সাবিহা ও ননদ নিশি।
বাস ডুবিতে স্ত্রী ও পুত্র সন্তানকে হারিয়েছেন নুরুজ্জামান। তলিয়ে যাওয়া সৌহার্দ্য পরিবহনের বাসটিতে ছিলেন তারা। মেয়েকে নিয়ে নুরুজ্জামান গিয়েছিলেন চিপস কিনতে। ঘাটে ফিরে দেখেন তার স্ত্রী-সন্তানসহ অন্য যাত্রীদের নিয়ে বাসটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পানিতে পড়ে তলিয়ে গেছে। ঈদ উদ্যাপন শেষে ঝিনাইদহের শৈলকুপা থেকে ঢাকায় ফিরতে চাওয়া নুরুজ্জামানের মাথায় যেন ওই মুহূর্তে আকাশ ভেঙে পড়ে। শৈলকুপায় নুরুজ্জামানদের বাড়ি কাঁচেরকোল ইউনিয়নের খন্দকবাড়িয়া গ্রামে।
এদিকে ডুবে যাওয়া বাসের জানালা দিয়ে নুসরাত বের হতে পারলেও তার মা রেহানার (৬০) বের হতে পারেননি। নুসরাত ডুবন্ত বাসের জানালা দিয়ে বের হয়ে আসেন। পরে সাঁতরে পন্টুনে কাছে আসলে তাকে টেনে উপরে তোলা হয়।
