ঈদের ছুটিতে শুধুমাত্র জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠানেই (নিটোর) চিকিৎসা নিয়েছেন অন্তত ১৬১০ জন। যাদের বেশির ভাগই সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হয়েছেন। প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়ে কেউ কেউ বাসায় ফিরে গেলেও এখনো হাসপাতালের বেডে কাতারাচ্ছেন অনেকে।
সরজমিন দেখা যায়, পঙ্গু হাসপাতালের ব্লু-২৬ নম্বর বেডে চিকিৎসা নিচ্ছেন ময়মনসিংহের ভালুকার শিকদার ইউসুফ (২০)। মোটরসাইকেল ও অটোরিকশার মুখোমুখি সংঘর্ষে তার ডান পায়ের একটি আঙ্গুল কেটে পড়ে গেছে। ইউসুফ বলেন, ঈদের দিন বাড়ি থেকে বের হয়ে বন্ধুর বাসায় যাচ্ছিলাম। পথিমধ্যে হঠাৎ সামনে থেকে এসে বিকট শব্দে একটা অটোরিকশা সজোরে আমার মোটরসাইকেলে ধাক্কা দেয়। কিছু বুঝে ওঠার আগেই রাস্তায় লুটিয়ে পড়ে সংজ্ঞা হারিয়ে ফেলি। পরে আশপাশের লোকজন আমাকে উদ্ধার করে হাসপতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসক জানায়, আমার একটা আঙ্গুল বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। ঢাকা নিতে হবে। এরপর এখানে নিয়ে আসা হয়। তিনি বলেন, একটা অটোরিকশার জন্য আমার এই অবস্থা। ইউসুফের পাশেই ২১ নম্বর বেডে শুয়ে কাতারাচ্ছেন নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের বিজয় ইসলাম (২১)। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে অতিরিক্ত গতিতে মোটরসাইকেল চালাতে গিয়ে তারও অটোরিকশার সঙ্গে সংঘর্ষ হয়েছে। ডান পায়ের হাড় ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেছে। ঈদের দিন অস্ত্রোপচারের পর তার পায়ে স্টিল রডের বেড় দেয়া রয়েছে। যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছেন তিনি। বিজয় বলেন, ঈদের দিন মোটরসাইকেল নিয়ে ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক দিয়ে যাচ্ছিলাম। রাস্তা ফাঁকা থাকায় মোটরসাইকেলের গতি ছিল একটু বেশি। এমন সময় হঠাৎ দেখি একটা অটোরিকশা মেইন রোডের ওপর ডাইনে টার্নিং নিচ্ছে। কিন্তু মোটরসাইকেলের গতি বেশি থাকায় আর নিয়ন্ত্রণ করতে পারিনি। সড়কের আইল্যান্ডের সঙ্গে ধাক্কা লাগে। একই ওয়ার্ডে ভর্তি রয়েছেন লক্ষ্মীপুরের সাইফুল ইসলাম। ঈদের দিন মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় তারও ডান পা ভেঙেছে। অস্ত্রোপচার করা হয়েছে। ২১ বছর বয়সী ওই যুবক বলেন, ঈদ উপলক্ষে নতুন মোটরসাইকেল কিনেছি। ঈদের দিন সেই নতুন মোটরসাইকেলে বান্ধবীকে নিয়ে ঘুরতে বের হয়েছিলাম। হঠাৎ সামনে অটোরিকশা দেখে আমিও নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলি। মোটরসাইকেলের গতি বেশি হওয়ায় পেছন থেকে বান্ধবী ছিটকে রাস্তায় পড়ে যায়। আর আমি গিয়ে অটোরিকশায় মেরে দিই। হাত-পা ভাঙার পাশাপাশি ডান পায়ের বৃদ্ধাঙ্গুল কেটে ঝুলে যায়। ছিটকে পরে যাওয়ায় বান্ধবীরও ডান পায়ের হাড় ভেঙে গেছে।
এদিকে ঈদুল ফিতরের নামাজ শেষে মোটরসাইকেল নিয়ে ঘুরতে বের হয়ে সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হয়ে পঙ্গু হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন মেহেরপুরের গাংনীর দুই বন্ধু সুমন ও আতিক। সুমন বলেন, ঈদের নামাজ শেষে আমি ও আতিক দু’জনে মোটরসাইকেলে গাংনী থেকে মেহেরপুরে যাচ্ছিলাম। কিন্তু কী থেকে কী হয়ে গেল কিছু্ই বুঝতে পারিনি। হঠাৎ পড়ে গেলাম। আমার বাম পায়ের হাড় ভেঙে গেছে। আতিকের অবস্থাও গুরুতর। পঙ্গু হাসপাতালের ৪৮ নম্বর বেডে চিকিৎসা নিচ্ছেন লক্ষ্মীপুরের রামগঞ্জের মোহন আলম (২৫)। সড়ক দুর্ঘটনায় তারও ডান হাতের কনুইয়ের হাড় বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। এইচএসসি পরীক্ষার্থী নরসিংদীর জুবায়েরও (১৮) ঈদের দিন বড় ভাইয়ের মোটরসাইকেল নিয়ে ঘুরতে বেরিয়ে ডান পা ভেঙে পঙ্গু হাসপাতালের বেডে শুয়ে কাতরাচ্ছেন। আর মোটরসাইকেল চালানোর সময় উল্টো দিক থেকে আসা সিএনজি অটোরিকশার ধাক্কায় পড়ে গিয়ে হাত ভেঙেছেন রাকিব হোসেন (২৫)। আবার অটোরিকশার নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে নিজেই পড়ে গিয়ে ডান পায়ের গোড়ালির হাড় ভেঙেছে সিরাজগঞ্জের সুলেমান প্রামাণিকের।
এসব বিষয়ে জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠান-নিটোরের জরুরি বিভাগের চিকিৎসক অপু মজুমদার বলেন, বেশির ভাগ দুর্ঘটনা ঘটছে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা, মোটরসাইকেল, সিএনজি’র নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে। অতিরিক্ত গতি ও বেপরোয়া চালানোর কারণেই এসব দুর্ঘটনাগুলো ঘটছে।
হাসপাতালটির যুগ্ম পরিচালক মো. মোজাফফর হোসেন বলেছেন, ঈদের আগে-পরে শত শত তরুণ দুর্ঘটনার শিকার হয়ে আমাদের হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। যাদের ভর্তি দেয়া হয়েছে তাদের সবার অবস্থাই গুরুতর। অনেকের পা কেটে ফেলতে হয়েছে। এমন অনেক তরুণ আছেন, যারা পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। আমি বলবো, ফাঁকা সড়ক পেলেই গতি বাড়িয়ে মোটরসাইকেল চালাবেন না। সচেতন হোন।
এ বিষয়ে জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠানের (নিটোর) পরিচালক অধ্যাপক ড. মো. আবুল কেনান মানবজমিনকে বলেন, ঈদের ছুটির সময় সাধারণত সড়ক দুর্ঘটনায় আহত রোগীর সংখ্যা বেড়ে যায়। দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে রোগীরা এখানে আসেন। সাধারণত অন্যান্য বছরের ঈদের ছুটিতে আমরা বেশির ভাগই তিন চাকার যানে দুর্ঘটনায় আহত রোগী পেয়েছিলাম। কিন্তু এবার মোটরসাইকেল চালক বা মোটরসাইকেলে দুর্ঘটনায় আহতর সংখ্যা বেশি। তিনি বলেন, এই ছুটির সময়েও আমাদের হাসপাতালে প্রতি শিফটে ১৮ জন করে মোট ৩৬ জন চিকিৎসক দায়িত্ব পালন করছেন। এরপরও রোগীর চাপ এতো বেশি ছিল যে আমাদের চিকিৎসক-নার্সদের হিমশিম খেতে হয়েছে। নিটোরের এই পরিচালক বলেন, ঈদের ছুটিতে (মঙ্গলবার সকাল ৮টা পর্যন্ত) আমাদের জরুরি বিভাগে মোট চিকিৎসা নিয়েছেন ১ হাজার ৬১০ জন। এদের মধ্যে গুরুতর আহত হওয়ায় ৪১৩ জনকে ভর্তি দেয়া হয়েছে। ৩৭৩ জনের অস্ত্রোপচার করা হয়েছে। মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় আহত হয়েছেন ১৭৪ জন। ৩ শতাধিক মানুষ আহত হয়েছেন অটোরিকশা দুর্ঘটনায়। বাকিরা বাস-ট্রাকসহ অন্যান্য দুর্ঘটনায় আহত হয়ে আমাদের হাসপাতালে আসেন। তিনি বলেন, শুধু ঢাকা নয় সারা দেশ থেকেই রোগীরা আসেন।
