জয়পুরহাটের কালাই উপজেলার প্রায় পাঁচ হাজার কৃষক এবার আনন্দের বদলে গভীর হতাশা, দুশ্চিন্তা ও অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছেন। টানা বৃষ্টি ও ঝড়ো হাওয়ার কারণে মাঠে থাকা আলুর বড় অংশ নষ্ট হয়ে গেছে। চাষিরা জানান, ঋণের বোঝা, নষ্ট ফসল এবং অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ তাদের জীবন কঠিন করে তুলেছে। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকরা বলছেন, এই সহায়তা কখন এবং কতোটুকু মিলবে তা নিয়ে তারা এখনো অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছেন। উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ও স্থানীয় সূত্র জানায়, চলতি মৌসুমে উপজেলায় প্রায় ১০,৬৯০ হেক্টর (স্থানীয় হিসাব অনুযায়ী প্রায় ৭৯,৭৯৬ বিঘা) জমিতে আলু আবাদ হয়েছিল। মৌসুমের শুরুতে আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় কৃষকরা ভালো ফলনের আশা নিয়ে বেশি বিনিয়োগ করেছিলেন। অনেকেই ঋণ নিয়ে, আবার কেউ কেউ জমি পত্তন নিয়ে আলু চাষে নেমেছিলেন। শুরুতে প্রায় এক-তৃতীয়াংশ জমি থেকে আলু উত্তোলন সম্ভব হলেও শেষ পর্যায়ে হঠাৎ টানা বৃষ্টি ও ঝড়ো হাওয়ায় সব হিসাবপত্রই বিপর্যস্ত হয়ে যায়। এতে প্রায় ২,৬৭২ হেক্টর জমির আলু মাঠেই পানিতে তলিয়ে পচে নষ্ট হয়েছে, যার কারণে প্রায় পাঁচ হাজার কৃষক ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। কৃষক একাব্বর আলী বলেন-আমি ঋণ নিয়ে সাত বিঘা জমিতে আলু চাষ করেছি। ফসল ভালো হলে ঈদের আগে ঋণ শোধ করার আশা ছিল। কিন্তু হঠাৎ বৃষ্টিতে সব আলু নষ্ট হয়ে গেছে। যদি ধানও না লাগাই, পুরো বছর হাতছাড়া হবে তাই ঝুঁকি জেনে পচা আলুর মধ্যেই বোরো ধানের চারা রোপণ করছি। রফিকুল ইসলাম উচ্চশিক্ষা শেষ করে কৃষিকেই পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছেন। তিনি জানান, সাত বিঘা জমির মধ্যে অল্প কিছু আলু তুলতে পেরেছি, বাকিটা পানিতে নষ্ট হয়েছে। এনজিও থেকে নেয়া ঋণের চাপ এখন সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তা। ক্ষতির পরও সামনে কোনো বিকল্প নেই। ঝুঁকি জেনে জমিতে বোরো ধান চাষ শুরু করেছি। বানিহারা গ্রামের ভূমিহীন কৃষক সন্তোষ রবিদাস বলেন, প্রায় সাড়ে চার লাখ টাকা খরচ করে আলু চাষ করেছি। বৃষ্টিতে সব নষ্ট হয়ে যাওয়ায় এখন পুরোপুরি নিঃস্ব। খেতের আলু পচে গেছে, তবুও যদি ধান না লাগাই, পুরো বছর ক্ষতিগ্রস্ত হবো। তাই ঝুঁকি জেনে বোরো ধান রোপণ করছি। আরেকজন কৃষক আবদুল আলিম জানান, দেড় লাখ টাকা ঋণ নিয়ে তিন বিঘা জমিতে আলু চাষ করেছি। শেষ মুহূর্তে সব নষ্ট হয়ে যাওয়ায় ঋণের বোঝা নিয়ে দিশাহারা। জমিতে এখনো পচা আলু থাকলেও ধান না লাগালে পুরো বছর হারাবো। তাই বাধ্য হয়ে চারা রোপণ করেছি। আলমগীর হোসেন বলেন, এক লাখ টাকা ঋণ করে দুই বিঘা জমিতে আলু চাষ করেছি কিন্তু এখন ঋণ শোধ করার কোনো উপায় নেই। ফসলই যখন নেই, তখন টাকা কোথা থেকে আসবে। মোজাফ্ফর হোসেন যোগ করেন- তিন বিঘা জমির আলু তোলার আগেই বৃষ্টিতে তলিয়ে গেছে। এখনো খেত থেকে পানি সরানোর চেষ্টা করছি কিন্তু ইতিমধ্যে আলু পচে গেছে। মাঠে গিয়ে দেখা গেছে, অনেক কৃষক বাধ্য হয়ে পচা আলুর মধ্যেই ধানের চারা রোপণ করছেন। তবে সেই চারাও অনেক জায়গায় লাল হয়ে যাচ্ছে, কোথাও আবার পচে যাচ্ছে। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা হারুনুর রশিদ জানিয়েছেন, পচা আলু থেকে নির্গত গ্যাস ও অ্যাসিডিক পরিবেশ ধানের চারা নষ্ট করতে পারে। আলু সরিয়ে কিছুদিন অপেক্ষা করে চারা রোপণ করলে ক্ষতি কমানো সম্ভব, তবে সময় নেই। প্রায় পাঁচ হাজার ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা তৈরি করা হয়েছে। তাদের সহায়তার বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা হয়েছে।
কালাইয়ে জমিতে আলু রেখেই বোরো ধান চাষ
কালাই (জয়পুরহাট) প্রতিনিধি
২৭ মার্চ (শুক্রবার), ২০২৬
লিংক কপি হয়েছে!
ফন্ট সাইজ:
100%
