শায়েস্তাগঞ্জে জিয়া খালের অস্তিত্ব সংকট, পুনঃখননের দাবি

শায়েস্তাগঞ্জে জিয়া খালের অস্তিত্ব সংকট, পুনঃখননের দাবি

ফন্ট সাইজ:

হবিগঞ্জের শায়েস্তাগঞ্জ উপজেলার প্রাকৃতিক জলপ্রবাহ ও কৃষি সেচের প্রধান উৎস হিসেবে পরিচিত জিয়া খাল বর্তমানে অস্তিত্ব সংকটের মুখে। অবৈধ দখল, ময়লা-আবর্জনা ফেলা এবং দীর্ঘদিনের অবহেলায় খালের স্বাভাবিক প্রবাহ প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে বর্ষা মৌসুমে জলাবদ্ধতা বৃদ্ধি এবং শুষ্ক মৌসুমে পানির সংকট দেখা দিচ্ছে। স্থানীয়রা জানান, খালের দুই তীর ধীরে ধীরে ভরাট হচ্ছে, অনেক স্থানে খাল সরু নালার মতো পরিণত হয়েছে। পাশাপাশি বর্জ্য ফেলার কারণে পানিদূষণ বেড়ে পরিবেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, দ্রুত দখলমুক্তকরণ, নিয়মিত খনন এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সঠিক উদ্যোগ না নিলে জিয়া খাল পুরোপুরি বিলীন হয়ে যেতে পারে। এতে স্থানীয় জীববৈচিত্র্য ও কৃষি উৎপাদন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। শায়েস্তাগঞ্জ বিএনপি’র প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি মো. করম আলী জানান, এক সময় মাঘ-ফাল্গুন মাসে এ অঞ্চলের পুকুর, ডোবা ও খাল-বিলের পানি শুকিয়ে যেত। নলকূপের ব্যবস্থা না থাকায় স্থানীয় কৃষকরা ইরি বোরো ও মৌসুমি ফসলের সেচ থেকে বঞ্চিত হতেন। শায়েস্তাগঞ্জের জিয়া খালও একসময় এলাকার মানুষের জন্য গুরুত্বপূর্ণ জলপথ ছিল। কিন্তু দুঃখজনকভাবে আজ এই খালটি অস্তিত্ব সংকটের মুখে পড়েছে। দখল, ভরাট ও অব্যবস্থাপনার কারণে খালটি তার স্বাভাবিক রূপ হারাচ্ছে; যা স্থানীয় মানুষের জন্য নানা সমস্যার সৃষ্টি করছে। প্রথমত, জিয়া খাল ভরাট হয়ে যাওয়ায় পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। বর্ষাকালে বৃষ্টির পানি সহজে বের হতে পারে না, ফলে এলাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। এতে রাস্তা-ঘাট পানিতে ডুবে যায় এবং মানুষের স্বাভাবিক চলাচল ব্যাহত হয়। অনেক সময় বসতবাড়িতেও পানি ঢুকে পড়ে, যা মানুষের দুর্ভোগ বাড়িয়ে দেয়। দ্বিতীয়ত, খালটির সংকোচন পরিবেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। খালে আবর্জনা ফেলার কারণে পানি দূষিত হচ্ছে এবং দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। এর ফলে বিভিন্ন রোগব্যাধির ঝুঁকি বাড়ছে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকি। একইসঙ্গে খালের জলজ প্রাণী ও মাছ বিলুপ্তির পথে যাচ্ছে, ফলে জীববৈচিত্র্য ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তৃতীয়ত, কৃষি ক্ষেত্রেও এর প্রভাব সুস্পষ্ট। আগে এই খালের পানি কৃষিকাজে ব্যবহার করা হতো। কিন্তু বর্তমানে খালটি নষ্ট হয়ে যাওয়ায় সেচব্যবস্থা ব্যাহত হচ্ছে। ফলে কৃষকরা ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন এবং কৃষি উৎপাদন কমে যাচ্ছে। এ ছাড়া, খালটি একসময় স্থানীয় মানুষের জীবিকার উৎস ছিল। অনেকেই মাছ ধরা বা নৌযান চালনার মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করতেন। কিন্তু খালটি নষ্ট হয়ে যাওয়ায় এসব পেশাও ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে, যা অর্থনৈতিক সমস্যার সৃষ্টি করছে। এই পরিস্থিতিতে জিয়া খাল পুনঃনির্মাণ বা পুনঃখনন করা অত্যন্ত জরুরি। খালটি পুনরুদ্ধার করা হলে পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা স্বাভাবিক হবে এবং জলাবদ্ধতা কমে যাবে। একইসঙ্গে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে এবং পরিবেশের ভারসাম্য ফিরে আসবে। খালটি পরিষ্কার ও সংরক্ষণ করলে জীববৈচিত্র্য রক্ষা পাবে এবং স্থানীয় অর্থনীতিও উন্নত হবে। পরিশেষে বলা যায়, শায়েস্তাগঞ্জের জিয়া খাল শুধু একটি খাল নয়, এটি এলাকার মানুষের জীবন ও জীবিকার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তাই এই খাল রক্ষায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও স্থানীয় জনগণকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। সময়মতো কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করলে এই খাল আবার তার পুরনো রূপ ফিরে পাবে এবং এলাকার মানুষের উপকারে আসবে। ১৯৮০ সালে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান শায়েস্তাগঞ্জে সরকারি সফরে আসার সময় খালের খনন কার্যক্রমের উদ্বোধন করেছিলেন। স্থানীয় কৃষক ও মেহনতি মানুষের জন্য এটি আনন্দের এক মুহূর্ত ছিল। উপজেলার বিভিন্ন গ্রাম হয়ে খালটি সুতাং নদীতে সংযুক্ত হয়। দীর্ঘ দুই যুগ ধরে এটি অঞ্চলের জলাবদ্ধতা নিরসন ও কৃষিজমিতে পানি সরবরাহের প্রধান উৎস হিসেবে কাজ করে। বর্তমানে খালের খনন না হওয়ায় বর্ষা মৌসুমে পানি জমি প্লাবিত করছে, যা কৃষকের ফসল ক্ষতিগ্রস্ত করছে। স্থানীয়রা মনে করছেন, খাল পুনঃখনন করলে হাজার হাজার একর জমি সোনার ফসলে ভরে উঠবে, দূর হবে জলাবদ্ধতা এবং ফিরবে জীববৈচিত্র্য। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. নাহিদ হোসাইন বলেন, বরাদ্দসাপেক্ষে খালটি দ্রুত খননের ব্যবস্থা নেয়া হবে।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন