রাজধানীতে কমদামে পাঞ্জাবি বিক্রি করাকে কেন্দ্র করে নবীন ফ্যাশনের শো-রুম বন্ধ করে দেয়ার অভিযোগ উঠেছে অন্য ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে। মগবাজারের বিশাল সেন্টার শপিংমলে নবীনের আউটলেটে পুলিশের উপস্থিতিতে মব সৃষ্টি করে দোকান বন্ধ করে দিয়েছে বলে অভিযোগ জানিয়েছেন নবীন ফ্যাশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এনামুল হাসান নবীন। গত ২০শে মার্চ ঘটে যাওয়া এই ঘটনার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। যেখানে দেখা যায়, একই মার্কেটের প্রিন্স ডিপার্টমেন্ট স্টোরের কর্ণধার মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর হোসেন মাইকেলসহ কয়েকজনও রয়েছেন। এই ঘটনার পর ব্যবসা বন্ধ করে মঙ্গলবার রাতে দেশ ছেড়ে চলে যান নবীনের কর্ণধার। পরে অবশ্য মগবাজার ব্যতীত অন্যান্য আউটলেটে বাড়তি সুবিধাসহ পণ্য বিক্রির ঘোষণা দেয় প্রতিষ্ঠানটি। এছাড়া এ ঘটনায় হাতিরঝিল থানার ওসিকে তলবসহ আউটলেট খুলে দেয়ার নির্দেশ দিয়েছে আদালত।
মঙ্গলবার এক সংবাদ সম্মেলনে নবীন ফ্যাশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এনামুল হাসান নবীন বলেন, পাশের দোকান ‘প্রিন্স’-এর মালিক মাইকেলসহ অন্যান্য ব্যবসায়ীরা সিন্ডিকেট করে পুলিশসহ তার দোকান বন্ধ করে দেয় এবং ক্রেতাদেরও হেনস্তা করা হয়। তাদের দাবি ছিল, ওই মার্কেটে চার হাজার ৫০০ টাকার কমে পাঞ্জাবি এবং এক হাজার ৫০০ টাকার কমে পাজামা বিক্রি করা যাবে না। তিনি বলেন, আমাদের ফোন দিয়ে ভয় দেখানো হচ্ছে যে, সব শো-রুম বন্ধ করে দিতে এবং ভিডিও ডিলিট করতে। আমরা তো ভিডিও করিনি, আমাদের এক গ্রাহক ভিডিও করে ফেসবুকে দিয়েছে সেখান থেকে সংবাদকর্মীরা ভিডিওগুলো নিয়েছে। তিনি আরও বলেন, আমরা অনেক বাধা উপেক্ষা করে ব্যবসা পরিচালনা করে আসছি। আমাদের সরকার সহযোগিতা করবে এই প্রত্যাশা করি। কিন্তু আমাদের মতো ব্যবসায়ীরা কখনই সরকারের কাছ থেকে কোনো সহযোগিতা পাইনি। সহযোগিতা পায় সিন্ডিকেটরা, বড় বড় ব্যবসায়ীরা; যারা বড় অঙ্কের লোন নেয় ব্যাংক থেকে নিয়ে ঋণখেলাপি হয়। আমরা জনগণের জন্য যদি কিছু করতে চাই সেক্ষেত্রে আমাদেরকে ভয়ভীতি দেখানো হয়। প্রিন্সসহ মার্কেটের অন্যান্য দোকানে পণ্যের মাত্রারিক্ত দাম বসানো হয় বলেও অভিযোগ জানানো হয় নবীন ফ্যাশনের পক্ষ থেকে।
সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, নবীন ফ্যাশনের কর্মকর্তাদের উদ্দেশ্য করে প্রিন্সের কর্ণধার মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর হোসেন মাইকেলকে বলতে দেখা যায়, ‘ওসি সাহেবকে ডাক দেন তো। ফাইজলামি পাইছেন? ব্যবসায় করতে বসছেন, না দুষ্টামি করতে বসছেন এখানে? দোকান মালিক সমিতি আছে। কোনো আইনকানুন মানেন না, কারও সঙ্গে আলাপ করেন না। তালা খুলবে না কেউ। যেই দামে আপনারা বিক্রি করেন, ব্যবসায় না করে রাস্তায় দাঁড়িয়ে মানুষকে রিলিফ দিয়ে দেন।
বুধবার দুপুরে দিকে বিশাল সেন্টারে গিয়ে দেখা যায়, অভিযুক্ত মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর হোসেন মাইকেলসহ দোকানগুলোর মালিকপক্ষের কেউই ছিলেন না। নবীনের আউটলেটের সামনে তালা ঝুলছিল। মার্কেটের অধিকাংশ দোকান ঈদের ছুটির পর খুলেনি। প্রিন্স ডিপার্টমেন্টাল স্টোরসহ প্রিয়া ডিপার্টমেন্টাল স্টোর ও ইলেকট্রনিক্সের দোকান খোলা ছিল। তবে, মার্কেটের বিভিন্ন দোকানের কর্মচারীদের সঙ্গে এই ঘটনার বিষয়ে কথা বলতে চাইলে মুখ খুলেন না কেউই। মার্কেটের নিরাপত্তাকর্মী থেকে শুরু করে দোকানের কর্মচারী; সকলেই একই স্বরে বলেন, ‘আমি কিছু জানি না’। মার্কেটের প্রিন্স ডিপার্টমেন্টের দুইটা আউটলেট রয়েছে। সেখানে কর্মচারীদের সঙ্গে কথা বলতে চাইলে তাদের কেউ কেউ ওই দোকানের কর্মচারী নয় বলে দাবি করেন। এমনকি দোকানের মালিকরা মার্কেটের ব্যবসায়ী সমিতির কোন পদে রয়েছেন সেটা জানতে চাইলেও তারা জানেন না বলে জানান। তবে, প্রিন্স ডিপার্টমেন্টের পণ্যগুলো ঘেটে দেখা যায়, সেখানে পণ্যগুলোতে ১০ থেকে ৫০ হাজার টাকার মধ্যে দাম দেখা গেছে। যদিও দোকানের কর্মচারীরা সেসব পণ্যের দাম নয়; কোড বলে দাবি করেছেন। রমজান মাসে দোকানটিতে থ্রি-পিস ৭২ হাজার, শার্টের দাম ৪৩ হাজার টাকাও দাম দেয়া হয়েছে।
ওদিকে, বুধবার বিকালে নবীন ফ্যাশনের অফিসিয়াল ফেসবুক পেজের এক পোস্টে ঘোষণা দেয়া হয়, মগবাজার শাখা বন্ধ থাকলেও দেশের অন্যান্য শাখাগুলো পুনরায় চালু রেখে ঈদ-পরবর্তী বিশেষ আয়োজন শুরু করা হচ্ছে। ঈদের আগের দিন মগবাজার শাখা জোরপূর্বক বন্ধ করে দেয়ায় এবারের ঈদ আয়োজন ১৫ দিনব্যাপী চলবে। পোস্টে আরও উল্লেখ করা হয়, সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ’র হস্তক্ষেপে মগবাজার ছাড়া বাকি শাখাগুলো চালু রাখা সম্ভব হয়েছে। পাশাপাশি আকর্ষণীয় অফারসহ প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক চীন থেকে ফেসবুক লাইভে যুক্ত হয়ে ঈদ উপলক্ষে বিশেষ বার্তা দেবেন বলেও জানানো হয়।
নবীন ফ্যাশন বন্ধে ওসিকে তলব, ২৪ ঘণ্টার মধ্যে খুলে দেয়ার নির্দেশ: এদিকে ‘নবীন ফ্যাশনের’ একটি পাঞ্জাবির দোকান বন্ধ করে দেয়ার ঘটনায় পুলিশের ভূমিকা নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে হাতিরঝিল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে (ওসি) তলব করেছেন আদালত। একইসঙ্গে দোকানটি আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ঘটনাস্থলে উপস্থিত থেকে খুলে দেয়ার জন্যও ওসিকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। বুধবার ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ মোস্তাফিজুর রহমান ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৪ ধারা মোতাবেক জাস্টিস অব পিস হিসেবে স্বপ্রণোদিত হয়ে এ আদেশ দেন।
আদেশে বলা হয়, একটি জাতীয় দৈনিকের অনলাইন সংস্করণে প্রকাশিত খবরে দেখা যায়, মগবাজারের বিশাল সেন্টার মার্কেটের ‘নবীন’ ব্র্যান্ডের একটি পাঞ্জাবির দোকানে একদল লোক পুলিশসহ উপস্থিত হয়ে দোকান বন্ধ করে দেয়ার নির্দেশ দেয়। ঘটনাস্থলে কিছু ব্যক্তিকে উচ্ছৃঙ্খল আচরণ করতে দেখা গেলেও পাশে থাকা পুলিশ সদস্যদের নির্লিপ্ত অবস্থায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়।
এ ঘটনায় আদালত মন্তব্য করেন, পুলিশের এমন নির্লিপ্ততা জনমনে ভীতি সৃষ্টি করতে পারে। কেন এ ধরনের আচরণ আইনবহির্ভূত ও পেশাদারিত্ববিরোধী হিসেবে ঘোষণা করা হবে না- তা জানতে চেয়ে হাতিরঝিল থানার ওসিকে আগামী তিনদিনের মধ্যে আদালতে হাজির হয়ে লিখিত ব্যাখ্যা দিতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এছাড়া ‘নবীন’ ব্র্যান্ডের পাঞ্জাবির দোকানটি আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ঘটনাস্থলে উপস্থিত থেকে খুলে দেয়ার জন্যও ওসিকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। একইসঙ্গে ঘটনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিস্তারিত নাম-পরিচয় আদালতে জমা দেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়।
