বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের নতুন নির্বাচক নাদীফ চৌধুরী। খেলোয়াড়ি জীবনে দেশের হয়ে খেলেছেন মাত্র তিনটি আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টি। আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার ছোট হলেও ঘরোয়া ক্রিকেটে তার অভিজ্ঞতা বেশ সমৃদ্ধ। খেলোয়াড়ি জীবনের পর ক্রিকেটের সঙ্গেই যুক্ত তিনি। নির্বাচক হিসেবে আগে কাজের পরিধি ছিল বয়সভিত্তিক দল পর্যন্ত। গেল ২ বছর বয়সভিত্তিক পর্যায়ে তার কাজের অভিজ্ঞতা অনেক। তবে এখন তার কাঁধে জাতীয় দলের নির্বাচকের বড় দায়িত্ব। মাত্র তিনটি আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলার অভিজ্ঞতায় এই চ্যালেঞ্জটা সম্পূর্ণ ভিন্ন। এখানে পুরো দেশের প্রতিনিধিত্ব করতে হয়। মানুষের প্রত্যাশার চাপ থাকে অনেক বেশি। সঙ্গে থাকে সংবাদমাধ্যমের তীক্ষ্ণ নজর। সবকিছু শক্ত হাতে সামলাতে প্রস্তুত তিনি। এই নতুন পথে তার পাথেয় শতভাগ নিষ্ঠা ও সততা। নির্বাচক প্যানেলে তার সঙ্গী হিসেবে আছেন অভিজ্ঞ হাবিবুল বাশার সুমন, হাসিবুল হোসেন শান্ত ও নাঈম ইসলাম। বয়স ৩৯ ছুঁইছুঁই নাদীফের বিশ্বাস, তাদের এই প্যানেল বাংলাদেশ ক্রিকেটকে দারুণ কিছু উপহার দেবে। খেলোয়াড়দের পারফরম্যান্স, পাইপলাইন, ঘরোয়া ক্রিকেটের ‘লীগ’-এর মান, নিজের ফেলে আসা ক্যারিয়ার এবং আক্ষেপ নিয়ে তিনি খোলামেলা কথা বলেছেন। জানিয়েছেন ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা। বাদ পড়েননি সাকিব আল হাসানও। দৈনিক মানবজমিনের সঙ্গে তার দীর্ঘ এই আলাপচারিতার চুম্বকাংশ পাঠকদের জন্য নিচে তুলে ধরা হলো।
প্রশ্ন: বয়সভিত্তিক দলে কাজের অভিজ্ঞতা জাতীয় দলে কতোটা কাজে আসবে?
নাদীফ: দু’টি কাজের ধরন সম্পূর্ণ আলাদা। আগে পরিধি ছিল অনূর্ধ্ব-১৯ পর্যন্ত। এখন পুরো জাতীয় দল, যারা দেশের প্রতিনিধিত্ব করে। কাজটা চ্যালেঞ্জিং হওয়ায় আমি সেভাবেই প্রস্তুতি নিচ্ছি। এখানে শতভাগ নিষ্ঠা ও সততার পাশাপাশি সবকিছু শক্তভাবে সামলানোর সক্ষমতা থাকতে হবে।
প্রশ্ন: জাতীয় দলের খেলোয়াড় নির্বাচনের মূল চ্যালেঞ্জ কোথায়?
নাদীফ: প্রধান চ্যালেঞ্জ পারফরম্যান্স। দল খারাপ করলে নির্বাচকদের কথা শুনতে হয়, ভালো করলে প্রশংসা জোটে না। কাউকে দলে নিতে কয়েক বছর ভালো খেলে আসতে হবে। হুট করে ভালো খেললেই জাতীয় দলে আসা যায় না।
প্রশ্ন: চোট বা ফর্মহীনতায় ব্যাকআপ খেলোয়াড় পাওয়া তো কঠিন। এর সমাধান কী?
নাদীফ: ব্যাকআপের জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে। ‘এ’ দল ও এইচপি’র খেলা নিয়মিত হতে হবে। আগে আমরা ‘এ’ দলের হয়ে অনেক সিরিজ খেলতাম। দক্ষিণ আফ্রিকা, শ্রীলঙ্কা, পাকিস্তানের সঙ্গে খেলা হতো। নিয়মিত খেলা হলে খেলোয়াড়রা পরবর্তী ধাপের জন্য প্রস্তুত হবে।
প্রশ্ন: বাদ পড়লে খেলোয়াড়দের ফেরার উপায় থাকে না। দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়ার বিষয়টি কীভাবে দেখেন?
নাদীফ: খেলোয়াড়দের লম্বা প্রক্রিয়ার মধ্যে থাকা খুব জরুরি। অনূর্ধ্ব-১৯ দলের পর কয়েকজন নজরে আসে, বাকিরা হারিয়ে যায়। টাইগার্সের মতো দলগুলোর কার্যক্রম দীর্ঘমেয়াদি হওয়া উচিত। জাতীয় দল থেকে বাদ পড়ার পর তারা ‘এ’ দল বা এইচপিতে গিয়ে ভুল শুধরে নেবে।
প্রশ্ন: ঘরোয়া লীগগুলোর মান নিয়ে আপনাদের ভাবনা কী?
নাদীফ: করোনার আগে প্রিমিয়ার লীগসহ অন্যান্য লীগের মান ভালো ছিল। গত কয়েক বছরে মান একটু নিচে নেমেছে। এটিকে আগের জায়গায় আনতে হবে। লীগ নিয়মিত না হলে নতুন খেলোয়াড় ওঠা কঠিন। এনসিএল বা বিসিএলের প্রস্তুতি অপর্যাপ্ত।
প্রশ্ন: নির্বাচক প্যানেলে হাবিবুল বাশার, হাসিবুল হোসেন শান্ত, নাঈম ইসলাম ও আপনি- এই সমন্বয় কেমন হবে?
নাদীফ: সুমন ভাই (হাবিবুল বাশার) দারুণ অভিজ্ঞ। শান্ত ভাইও লম্বা সময় কাজ করেছেন। এটি চমৎকার সমন্বয়। আমাদের প্রথম লক্ষ্য থাকবে আসন্ন বিশ্বকাপে (বা চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে) কোয়ালিফাই করা। আমরা একসঙ্গে মিটিং করবো। আলোচনা করে সবচেয়ে ভালো সিদ্ধান্তটিই নেওয়ার চেষ্টা করবো।
প্রশ্ন: নিজের ক্যারিয়ার নিয়ে কোনো আক্ষেপ আছে?
নাদীফ: আমি আসলে নিজের ক্যারিয়ারের জন্য নিজেকেই দায়ী করি। মানসিকভাবে আরও শক্ত থাকলে চিত্রটা অন্যরকম হতো। বিকেএসপিতে ভর্তির পর থেকেই ধ্যান-জ্ঞানে শুধুই ক্রিকেট ছিল। খুব কাছে গিয়েও অল্প সময়ের জন্য জাতীয় দলে খেলেছি। তবে সেটা নিয়ে আমার কোনো আফসোস নেই।
প্রশ্ন: ক্যারিয়ার নিয়ে অন্য কোনো পরিকল্পনা কি ছিল?
নাদীফ: ক্রিকেটের বাইরে অন্য কিছু কখনো ভাবিনি। নির্বাচক না হলে হয়তো কোচিংয়ে আসতাম। প্রিমিয়ার লীগের সময় তরুণদের পথ আটকে না রেখে খেলা ছাড়ার এবং নির্বাচক হিসেবে কাজ করার সিদ্ধান্ত নিই। আমার স্বভাবের সঙ্গে এই কাজটা বেশ মানানসই।
প্রশ্ন: দল থেকে বাদ পড়া খেলোয়াড়দের ক্ষোভ কীভাবে সামলাবেন?
নাদীফ: উনিশ-বিশ পার্থক্যের কারণে একজন বাদ পড়লে তার খারাপ লাগা স্বাভাবিক। সবাইকে খুশি করা সম্ভব নয়। তবে সিদ্ধান্তগুলো স্বচ্ছ হবে। কেন সুযোগ পেল না, সেটা তাকে সুন্দরভাবে বুঝিয়ে বলতে হবে। তাকে বলতে হবে তোমার এই জায়গায় ঘাটতি আছে, এগুলো উন্নতি করে আসো’।
প্রশ্ন: সাকিব আল হাসানকে নিয়ে ভবিষ্যৎ ভাবনা কী?
নাদীফ: সাকিবকে এখনো অনেক উঁচুতে দেখি। বাংলাদেশ দলে তার জায়গায় বড় একটা শূন্যতা আছে। সে যদি মানসিকভাবে প্রস্তুত হয়ে ফিরে আসে, তবে কেন নয়? সে এখনো দলের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
প্রশ্ন: কাজের ক্ষেত্রে নিজের লক্ষ্য কীভাবে ঠিক করেছেন?
নাদীফ: আমি বিতর্ক থেকে দূরে থাকতে চাই। এক কোণায় বসে মনোযোগ দিয়ে খেলা দেখতে পছন্দ করি। শান্তিতে কাজ করতে চাই। নিজেকে জাহির বা প্রচারে থাকার অভ্যাস আমার একদমই নেই।
