মানুষের মন মহারহস্যের অজানা খনি। একেকজনের মন-মানসিকতা একেক রকম। কারও মন সহজ-সরল, কারও মনে থাকে ভীষণ জটিলতা। মানুষের মনোজগতে কী চিন্তা চলে, কোন আচরণটা মানুষ কখন করে, কেন করে, বুঝে করে, না অবচেতনভাবে করে- এ রকম বিচিত্র অনুভূতি, প্রতিক্রিয়া ইত্যাদি হাজারো প্রশ্ন ও কথা নিয়ে আলোচনা করে মনোবিজ্ঞান বা সাইকোলজি। মানুষের মনের জট খুলে দেওয়াই একজন মনোরোগ বিশেষজ্ঞের কাজ। আমাদের নানাবিধ মানসিক সমস্যা নিয়ে তারা নিরন্তর গবেষণা করে থাকেন। মানুষের ভেতরের মানুষটিকে খুঁজে বের করেন তারা। মানুষের অচেনা মনের অলিগলি নিয়ে জানার প্রবল আগ্রহ আমার মতো অনেকেরই। মন নিয়ে লিখতে বসতেই ‘শহরের ইতিকথা’ সিনেমায় সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের কণ্ঠে ‘ক্ষণে ক্ষণে এই মনে কার ছোয়া লাগে যেন’ গানটির বাণী-সুর-আবেগ স্মরণে আসে। মানব-মন বড়ই রহস্যময়, আবেগের আখড়া। সেই মনের রাগ-অনুরাগে বনবীথি জাগে। আর এভাবেই শুরু হয় মনের অনুসন্ধানে পথে নামা।
মানুষকে পরিচালিত করে মন। মনের গতিপ্রকৃতি বিচিত্র, যা উপলব্ধি করাও বেশ বিচক্ষণতার কাজ। মানুষের মধ্যকার পারস্পরিক দ্বন্দ্ব বা মানসিক টানাপড়েন অথবা মনের বিচিত্র রূপের প্রকাশভঙ্গি মনোবিদ্যায় আধুনিক মনস্তত্ত্বকে গভীরভাবে অনুধাবনে সচেষ্ট। অন্যের মন পড়তে পারা, মন পড়ে আত্মীয়তা অনুভব করার দিকেও নজর দিয়েছেন মনোবিদগণ। মনকে ভীষণ গুরুত্ব দিয়ে অনেকেই বলেছেন, মনই মানুষের সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করে। তখন স্বাভাবিক কারণেই জানতে মন চায়- মন আসলে কী? মনের অবস্থান কোথায়? প্রশ্নের জবাবে মনোরোগ বিশেষজ্ঞগণ বলেছেন, মন বলতে আমরা ব্রেইনকেই বুঝি। মন মানে হৃৎপিণ্ড নয়। আবার মন বলতে আত্মা বা ঝড়ঁষ কেও বুঝায় না। মন থাকে মস্তিষ্কে। মনের সাধারণত ৩টি অংশ। ক. সচেতন মন, খ. অচেতন মন, গ. অবচেতন মন। সচেতন মন, মনের মাত্র ১০ ভাগ। মনের ৯০ ভাগজুড়ে রয়েছে অচেতন বা অবচেতন মন।
মনোবিদগণ বলছেন, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে প্রতিদিনই চারপাশের মানুষের আবেগ ও আচরণগত সমস্যাগুলো বাড়ছে যা সামাজিক নানা সমস্যা সৃষ্টিরও কারণ। যেমন মন, তেমনি জীবন। যা মনে আছে তাই বাইরে নির্গত হয়, সেটা ছাড়া কিছুই হয় না। মনই হলো সেই মালিক, যে ভাঙা-গড়ার খেলা খেলে, মানুষই মন, আর যত বেশি বিচাররূপী উপকরণ, তত বেশি সে যা চায় তাই গড়ে, অসংখ্য খুশি এবং অগুণতি বাধা নিয়ে আসে। গোপনে সে যা ভাবে, তাই বাস্তবায়িত হয়ে ওঠে, বাতাবরণ আর কিছুই নয়, তারই দর্পণ। শোভন সমাজ ও জীবন ব্যবস্থার জন্য চাই সুরুচির মানুষ, শুভ বোধসম্পন্ন মানুষ। ভালো মানুষ হতে হলে প্রথমে নিজেকে জানতে হবে। দার্শনিক এরিস্টটল বলেছেন, ভালো অভ্যাস, যা তারুণ্যে সৃষ্টি হয় তা-ই কেবল পার্থক্য আনতে পারে।
শিক্ষক হিসেবে প্রবলভাবে প্রেরণা অনুভব করছি- সন্তানের ও পরিবারের মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে সচেতন হওয়া জরুরি। দৈনন্দিন কাজকর্ম স্বাভাবিক জীবনাচরণের প্রয়োজনে শৈশব থেকেই ইতিবাচক জীবনচর্চা জরুরি। সেই বিবেচনায় অস্বস্তি, কুসংস্কার ঝেড়ে ফেলে প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেই শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যসেবা প্রদানের উদ্যোগ গ্রহণ করা জরুরি। প্রবল সচেতনতা সৃষ্টি করতে শিশু-কিশোর-তরুণদের প্রয়োজন মানসিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থার আওতায় নিয়ে আসা। মানসিক সমস্যা যে কোনো বয়সে যে কারও হতে পারে। অবহেলা না করে মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিতে হবে। সুচিকিৎসায় স্বাভাবিক সুন্দর জীবনযাপন করার স্বার্থেই আমাদের সকলকেই অবস্থান অনুযায়ী সক্রিয় ও আন্তরিক ভূমিকা রাখতে হবে। ‘মন তোর এত ভাবনা কেনে’র আত্মজিজ্ঞাসাকালে সাধক-কবি রামপ্রসাদ নিজেই সঠিক জবাবটিও জানান দেন কালজয়ী আরেক গানে- ‘মন রে কৃষি কাজ জানো না।/এমন মানবজমিন রইলো পতিত,/আবাদ করলে ফলতো সোনা।।’ জীবনপুরের মাঠে এই সোনা ফলানোর জন্য মানবমনের প্রতিই সবচেয়ে বেশি সুনজর দিতে হবে।
মানবজীবনের সফল ফসল ফলানোর সাধনা চলে আজন্ম। সদ্যোজাত শিশুর শৈশব দিয়েই শুরু হয় মানুষের জীবন চক্রের। যদিও জাতিসংঘ সনদে আঠারো বছর বয়স অব্দি মানুষদের শিশু বলা হয়, তবুও এই শৈশবের দশ থেকে বারো বছরের মাথায় শুরু হয় কৈশোর যা নবযৌবন অব্দি বিস্তৃত হয়। কৈশোর শেষ হওয়ার আগে আগেই শুরু হয় বয়ঃসন্ধি। অর্থাৎ কৈশোরই মানুষের বয়ঃসন্ধিÑ একথা বলা যায়। কৈশোর পার হতে থাকা বয়ঃসন্ধির এইসব মানুষের জীবন নানা পরিবর্তনের মধ্যদিয়েই পরিণত হয়। তাই এই সময়কালটা জটিল অনেকাংশেই। বিশ্ব জুড়ে কৈশোর ও বয়ঃসন্ধির মনস্তত্ত্ব নিয়ে চলছে প্রচুর গবেষণা এবং চর্চা। বয়ঃসন্ধি মানুষের জীবনের এক অতি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। বয়ঃসন্ধি না এলে দেহে যৌবন আসে না আর তার অভাবে জীবন অবিকশিত থাকে। কাজেই জীবনকে পূর্ণতা দিতে হলে বয়ঃসন্ধির সংকটকালকে ভালোভাবে উত্তরণ করতে হবে। বয়ঃসন্ধিকালীন সময় থেকে ছেলেমেয়েদের আত্মপরিচয় গড়ে উঠতে শুরু করে। আত্মপরিচয় বলতে এখানে বোঝানো হয়েছে, তার নিজস্ব সিদ্ধান্ত গ্রহণের জায়গা তৈরি হয়। তার কী পছন্দ-অপছন্দ, সে কী চায়। এছাড়া নিজের জীবন, সমাজ, সংস্কৃতি, ধর্ম সম্পর্কে তার নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে ওঠে। এবং তারা পূর্ণাঙ্গ স্বাধীন মানুষ হিসেবে জীবনের এই পর্যায়ে আত্মপ্রকাশ করে। দেশের জনসংখ্যার ৪৫ ভাগের বেশি জনগোষ্ঠী ১০ থেকে ৩৫ বছর বয়সী। যারা কিশোর-কিশোরী এবং যুবসমাজের অন্তর্ভুক্ত। দেশের এই বৃহৎ জনগোষ্ঠীর বড় অংশই তাদের যৌন মানসিক ও প্রজনন স্বাস্থ্য অধিকার সম্পর্কে একেবারেই অজ্ঞ বলে মন্তব্য করেছেন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা। ইউনিসেফের তথ্যমতে, বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার ২২ শতাংশ ১০ থেকে ১৯ বছর বয়সী কিশোর-কিশোরী। অথচ তাদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য রক্ষার দিকটি বাংলাদেশে এখনো উপেক্ষিত থেকে গেছে। এ অবস্থায় পরিবারের পাশাপাশি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ অন্যান্য সামাজিক প্রতিষ্ঠানের কৌশলী ভূমিকা পালন করতে হবে বলে মত বিশেষজ্ঞদের।
সৃজন মানে সৃষ্টি। সৃষ্টি মানে নতুন কিছু তৈরি করা, পথ নির্দেশ করা, লক্ষ্য ঠিক করা। ইতিবাচক চিন্তার মাধ্যমে প্রত্যাশিত গন্তব্যে পৌঁছানো। একটা চিন্তার ওপর ভর করে অপেক্ষাকৃত ভালো কিছু করা। কিন্তু কীভাবে করবে? মাথা খাটিয়ে। মাথায় কোথা থেকে চিন্তার জোগান আসবে? বই পড়া থেকে। বই হলো মই, অর্থাৎ ওপরে ওঠার সিঁড়ি। বইয়ের কালো হরফে আছে হাজার বছরের ইতিহাস, ঐতিহ্য, সভ্যতা, সংস্কৃতি, সমাজ, নৃতত্ত্ব, প্রকৃতির নানা উপাদানের কথা যা সমৃদ্ধ করে মানুষকে। আর এই বিবেচনায় উচ্চ মাধ্যমিকের মানবিক শাখায় মনোবিজ্ঞানকে আবশ্যিক ও ঐচ্ছিক বিষয় হিসেবে এবং বিজ্ঞান ও বাণিজ্য শাখায় ঐচ্ছিক বিষয় হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার আহ্বান জানাই। সেইসঙ্গে আমাদের একান্ত প্রত্যাশা সকল স্তরের (স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়) প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ‘সাইকোলজি রিডিং ক্লাব’ (পিআরসি) গঠন করে নিয়মিতভাবে পাঠ চক্র পরিচালিত হতে পারে। যেখানে অভিজ্ঞ ও দক্ষ শিক্ষকগণ পরামর্শ ও সহযোগিতা তথা কাউন্সেলিং সেবা প্রদান করে শিক্ষার্থীর মানসিক স্বাস্থ্য উন্নয়নে ভূমিকা রাখবেন। ফলে সচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যা, বিষণ্নতাসহ নানাবিধ মানসিক সমস্যার প্রবণতা হ্রাস পাবে, মানসিক অসুখের হার কমে যাবে। এই ক্লাবের মাধ্যমে প্রকৃতপক্ষে জ্ঞানপিপাসু, কুসংস্কারমুক্ত ও মুক্তচিন্তার অধিকারীদের পদচারণায় মানবিক ও যুক্তিবাদী সমাজ গড়ে ওঠবে। শিক্ষার্থীরা যেকোনো ধরনের নেতিবাচক প্রভাব এড়িয়ে ‘হোয়েন ইউ নো বেটার, ইউ ডু বেটার’-এই জাতীয় সেøাগান সামনে রেখে সুস্থ ও সুন্দর জীবনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার স্বপ্ন দেখবে। এক্ষেত্রে আমরা সবাই যেন অবশ্যই চেতনায় রাখি ‘দেশ আমার দায়িত্বও আমার।’
বলা হয়ে থাকে সভ্যতা হচ্ছে শক্তিমান মানুষের চিন্তা। আর তাই ইতিবাচক চিন্তাই ঈর্ষণীয় ব্যক্তিত্বে পরিণত করে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। জীবনমানেই সংগ্রাম। সেই যুদ্ধে বিজয়ী হতে চাইলে নিজের সংকীর্ণতা আবিষ্কার জরুরি। অর্থাৎ নিজেকে জানার চেষ্টা না থাকলে স্বকীয় গুণের ব্যক্তিত্বে পরিণত হওয়াটা প্রায় অসম্ভব ব্যাপার হয়ে ওঠে। লালন লোলিত যত্ন নিয়েই জীবনকে গড়ে তুলতে হয়। অমর কথাশিল্পী লিও টলস্টয় যেমনটি বলেছিলেন, মানুষের জীবন কতেকগুলো আকস্মিকের খেলামাত্র। সেই খেলাঘর বাধতে বসার ভাবনায় অনুভব করি জীবনলিপির কুশলতা তৈরিতে আপন কথা অনুসন্ধানের কোনো বিকল্প নাই। নাই বলেই ‘আমার চলা যায় না বলা’র ছলে আমরা গভীরভাবে অনুধাবন করি গতিই জীবন, থেমে যাওয়া মৃত্যু। সেই চলতে থাকা জীবন নদীকে নিয়ে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রচনা করেছেন চলমান মনকে নিয়ে সুর-সংগীতÑ ‘আমার চলা নবীন পাতায়, আমার চলা ফুলের ধারা.../আমার চলা যায় না বলা/আলোর পানে প্রাণের চলা/আকাশ বোঝে আনন্দ তার, বোঝে নিশার নীরব তারা।’
শিক্ষক হিসেবে প্রতিনিয়ত আমাদের শিক্ষার্থীদের মাঝে তীব্র হতাশা, বিষণ্নতা দেখতে পাই। মানসিক সংকটগুলো দূর করার নিরলস চেষ্টা থাকে আমাদের। এই চেষ্টাকেই আরেকটু সংঘবদ্ধভাবে শিক্ষার্থীদের আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধিতে, স্বপ্নকে বড় করে তুলতে, বাস্তবায়ন করতে প্রয়োজন প্রাতিষ্ঠানিক আয়োজন। মহৎ জীবন, উন্নত জীবন ও জীবনী থেকে আত্মশক্তি জাগরণের, জীবনশক্তি আহরণের, নিজের মতোন করে একজন হয়ে ওঠার আন্তরিক প্রচেষ্টা জরুরি বিবেচনা করি। তাই চাই প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মানসিক স্বাস্থ্যসেবার উদ্যোগ। শিক্ষার্থীদের মাঝে প্রবল ইচ্ছাশক্তি গড়ে তুলে শুদ্ধ অন্তঃকরণের মাধ্যমে নিজেকে তৈরি ও বিকশিত করার প্রয়াস দৃশ্যমান হয়। আর তখনই আমাদের ভাবনায় পেয়ে বসে মানুষের মন ও মানসিকতা সর্বোপরি মনোজগৎ নিয়ে আরেকটু গভীরভাবে চিন্তাচর্চা করা। শিক্ষক হিসেবে আমরা কখনো ভুলি না- প্রতিটি শিক্ষার্থী এক অসীম প্রতিভাবান সজীব, প্রাণবন্ত, উদ্ভাবনীশক্তির উন্মুখ সত্তা। সেই সৃজনী সত্তার প্রকাশে-বিকাশে-বৃদ্ধিতে, আত্ম-সন্দেহ থেকে মুক্ত থাকতে ও আত্মবিশ্বাসকে আরও জাগ্রত করতে প্রাতিষ্ঠানিক প্রয়াস সদর্থক হবে বলেই বিশ্বাস।
লেখক: সহযোগী অধ্যাপক, মনোবিজ্ঞান বিভাগ
গভর্নমেন্ট কলেজ অব অ্যাপ্লাইড হিউম্যান সাইন্স, আজিমপুর, ঢাকা
মন নিয়ে যত কথা
রাশনা রশীদ
২১ মার্চ (শনিবার), ২০২৬
লিংক কপি হয়েছে!
ফন্ট সাইজ:
100%

Sahil
২ মাস আগেখুব সুন্দর একটা লেখা আমাদের দেশের রাজনীতিবিদদের বিশেষ করে এই লেখাটি পড়ে কিছু শিক্ষা নেওয়া প্রয়োজন আছে বলে মনে করি।