বৈরুতের ডাউনটাউনের সমুদ্রতীরবর্তী এলাকায় আলা নামের এক ব্যক্তি মাথা গোঁজার ঠাঁই খুঁজছেন। সিরিয়ান এই শরণার্থী মূলত দখলকৃত গোলান মালভূমির বাসিন্দা। এখন তিনি পুরোপুরি গৃহহীন। দিনভর তিনি লেবাননের রাজধানীতে ঘুরে বেড়িয়েছেন কোথাও আশ্রয় পাওয়ার আশায়। এর আগে তিনি থাকতেন বৈরুতের দক্ষিণ উপশহর দাহিয়েহ’তে। কিন্তু ইসরাইলি হামলায় ওই এলাকা ব্যাপকভাবে বিধ্বস্ত হয়েছে। পুরো লেবাননে এখন পর্যন্ত এক হাজারেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছে। এখন তার একটাই চিন্তা- কোথায় নিরাপদে থাকতে পারবেন। সে কারণে শুক্রবার শুরু হওয়া মুসলমানদের উৎসব ঈদুল ফিতর তার চিন্তাতেও নেই। এমনই পরিস্থিতি মধ্যপ্রাচ্যের বেশির ভাগ এলাকায়।
ঈদের কোনো পরিকল্পনা আছে কি না জানতে চাইলে আলা না সূচক উত্তর দেন। তার প্রধান লক্ষ্য এখন একটি তাঁবু জোগাড় করা। আলা বলেন, একটি স্কুলে থাকার অনুমতি পাইনি। এরপর কার্নিশে গিয়ে ঘুমিয়েছিলাম। পরে সিটি করপোরেশনের লোকজন আমাকে বলল ডাউনটাউন বৈরুতের সমুদ্রতীরে যেতে।
তিনি এখনও কোনো তাঁবু পাননি এবং আপাতত খোলা আকাশের নিচেই ঘুমাচ্ছেন। আশপাশে অনেকেই তাঁবু পেয়েছেন। ফলে ব্যয়বহুল রেস্টুরেন্ট ও বারের জন্য পরিচিত এই এলাকা এখন বাস্তুচ্যুত মানুষের তাঁবুর শহরে পরিণত হয়েছে। লেবাননজুড়ে এক মিলিয়নের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। লেবাননের মানুষ জানেন না এই যুদ্ধ কবে শেষ হবে। বিশেষ করে ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৪ সালের নভেম্বর পর্যন্ত ইসরাইলের সঙ্গে সংঘাতের ধাক্কা থেকে তারা এখনও পুরোপুরি ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। এই পরিস্থিতি ঈদ উৎসব উদযাপনকে কঠিন করে তুলেছে।
ইরানে অর্থনৈতিক সংকটে ম্লান ঈদ
ইরানে এখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলার তৃতীয় সপ্তাহ চলছে। যুদ্ধের দ্রুত সমাপ্তির কোনো লক্ষণ নেই। যুদ্ধ শুরুর আগেই দেশটি অর্থনৈতিক সংকটে ছিল। ফলে অনেক মানুষের পক্ষে ঈদের সময় সাধারণত যে জিনিসগুলো কেনা হয়, সেগুলো কেনাও কঠিন হয়ে পড়েছে। এমনকি তেহরানের বিখ্যাত গ্র্যান্ড বাজারের মতো জায়গায় কেনাকাটা করাও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কারণ বোমা হামলায় ওই এলাকা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ঈদের ধর্মীয় দিকটিও কিছু ইরানি নাগরিকের জন্য সংবেদনশীল বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। সরকারবিরোধী অনেকেই এখন ধর্মীয় প্রকাশকে ইসলামী প্রজাতন্ত্রের প্রতি সমর্থন হিসেবে দেখেন। এ বছর পারস্য নববর্ষ নওরোজও শুক্রবার পড়েছে।
গাজায় যুদ্ধের মধ্যে ঈদ
গাজার অনেক ফিলিস্তিনি ঈদ উদযাপন করছেন ভয়াবহ অভাব, যুদ্ধের ক্ষতের মধ্যে। ইসরাইলের গণহত্যামূলক যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট অর্থনৈতিক সংকট এই ঈদকে কঠিন করে তুলেছে। ইসরাইল যুদ্ধ শুরুর পর থেকে গাজায় পণ্য প্রবেশে আরও কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করেছে। ফলে শিশুদের খেলনা থেকে শুরু করে অনেক পণ্যের দাম বেড়ে গেছে। গাজা সিটির আংশিক ধ্বংস হওয়া বাড়িতে থাকা ৬২ বছর বয়সী খালেদ দীব ঈদের আগে বাজারে গিয়ে ফল ও সবজির দাম দেখতে গিয়েছিলেন। তিনি বলেন, বাইরে থেকে দেখলে মনে হয় ঈদের পরিবেশ খুব প্রাণবন্ত। কিন্তু আর্থিকভাবে পরিস্থিতি খুব খারাপ। মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে তাঁবুতে বাস করছে। যুদ্ধের মধ্যে সবাই সবকিছু হারিয়েছে। তিনি বলেন, এত দামি ফল ও সবজি কেনার সামর্থ্য তার নেই। এসব এখন শুধু রাজাদের জন্য। আমাদের মতো ক্লান্ত ও দরিদ্র মানুষের জন্য নয়। যুদ্ধের আগে তিনি একটি সুপারমার্কেটের মালিক ছিলেন। সেই স্মৃতি তার কষ্ট আরও বাড়িয়ে দেয়। তিনি বলেন, ঈদের সময় আমি মেয়েদের ও বোনদের দেখতে গেলে ৩ হাজার শেকেলেরও বেশি উপহার দিতাম। বাড়ি সাজাতাম, বাচ্চাদের ঈদের কাপড় কিনতাম, মিষ্টি ও চকলেট আনতাম। কিন্তুগাজায় যুদ্ধবিরতি থাকলেও এ বছর তার কিছুই হচ্ছে না।
তিন সন্তানের মা শিরিন শ্রেইমও একই ধরনের হতাশা প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, আমাদের ঈদের আনন্দ অসম্পূর্ণ। দুই বছরের যুদ্ধের পর আমরা ভয়াবহ কষ্টের মধ্যে আছি। এখন এমন এক বাস্তবতায় বাস করছি যেখানে ন্যূনতম প্রয়োজনীয় জিনিসও পাওয়া যায় না। তিনি জানান, গাজা কবে পুনর্গঠিত হবে তা তিনি কল্পনাও করতে পারছেন না। তিনি বলেন, আমাদের অ্যাপার্টমেন্টের দেয়াল প্রায় পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে। আমরা ত্রিপল ও কাঠ দিয়ে কোনোভাবে বসবাস করছি। তবুও আমরা অনেকের চেয়ে ভালো অবস্থায় আছি। প্রতিবার বাড়ি ফিরলে মন খারাপ হয়ে যায়। কোনো মানবিক আশ্রয় ছাড়াই মানুষ রাস্তায় নাইলন ও কাপড়ের তাঁবুতে বাস করছে। তারা কীভাবে ঈদ উদযাপন করবে?
যুদ্ধের মধ্যেও পরিবারই ভরসা
বৈরুতে রাজনৈতিক গবেষক ও সংগঠক করিম সাফিয়েদ্দিন বলেন, কঠিন পরিস্থিতি সত্ত্বেও তিনি পরিবারের সঙ্গে ঈদ উদযাপন করছেন। তিনি বলেন, যুদ্ধের কারণে আমরা বাস্তুচ্যুত হলেও পারিবারিক বন্ধনকে শক্ত করা এবং সামাজিক সংহতি তৈরি করা- এই যুদ্ধ থেকে টিকে থাকার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তার ভাষায়, সংহতি ছাড়া আমরা সমাজ বা দেশ গড়তে পারব না। বোমার মধ্যে থাকা একটি দেশের জন্য ভবিষ্যতের কোনো স্বপ্ন তৈরি করতে চাইলে এটাই প্রথম ধাপ।
