সেই কবেকার কথা। ছোটবেলার কথা যখন ভাবি চোখের সামনে পুরনো স্মৃতিগুলো জীবন্ত হয়ে ওঠে। মনে হয় এইতো সেদিনের কথা। আমি ঢাকার মেয়ে। জন্ম এবং বেড়ে ওঠা সব কিছু এই ঢাকাতেই। পুরনো ঢাকার আরমানীটোলাতে ধীরে ধীরে বেড়ে উঠেছি। স্কুল, কলেজ, ইউনিভার্সিটি সব কিছু এই ঢাকাতেই। আমাদের পরিবারটা ছিল অনেকটা একান্নবর্তী পরিবারের মতো। সাত বোন তিন ভাইয়ের সংসার। বাবা-মা’র আদর যত্নের কোনো কমতি ছিল না। আব্বা ব্যবসায়ী ছিলেন। প্রেস এবং পাবলিকেশন্স ব্যবসা। সচ্ছল পরিবার। আমাদের বাড়িতে সারা বছর মেহমান লেগেই থাকতো। খালা-মামা, চাচা-ফুপু ছাড়াও নিকট এবং দূরের আত্মীয়-স্বজন সব সময়ই কেউ না কেউ থাকতেনই আমাদের বাসায়। যত মেহমানই আসুক আব্বা-আম্মাকে কখনো এতটুকু বিরক্ত হতে দেখিনি। বিশেষ বিশেষ দিনগুলোতে দূরের এবং কাছের আত্মীয়-স্বজন সবাই এসে একত্রিত হতেন আমাদের বাসায়।
ভিয়েতনামে আমাদের ঈদ
বিশেষ করে ঈদের দিনে কি যে আনন্দ হতো- সেটা বলে বোঝানো যাবে না। রমজান এলেই বাড়িতে শুরু হয়ে যেতো ঈদের আমেজ। প্রায় প্রতিদিনই ইফতারে কোনো না কোনো আত্মীয় বা বন্ধুবান্ধব হাজির থাকতেন। আর পুরনো ঢাকার ঐতিহ্যবাহী ইফতারের কথা কে না জানে। সবাই মিলে একসাথে বসে ইফতার করার মজাই আলাদা। পুরো রোজা জুড়ে চলতো ঈদের কেনাকাটা। সেহ্রি শেষে ভাইবোনরা সবাই মিলে প্রতিদিনই দেখতাম ঈদের জামা-জুতো। তারপর যত্ন করে তুলে রাখতাম আলমারিতে। সাতাশ রোজায় মেহেদী পরার রেওয়াজ ছিল। বাড়ির মেয়েরা সবাই মিলে মেহেদী পরবে- এটাই ছিল নিয়ম। চাঁদরাতে খুশিতে ঘুম হতো না। আম্মা সারারাত রান্না করতেন। আর আমরা ছোটরা ঈদের প্ল্যান- প্রোগ্রাম নিয়ে এতটাই ব্যস্ত থাকতাম রাত পেরিয়ে কখন যে, ভোর হয়ে যেতো টের পেতাম না। আব্বা ছিলেন ভোজনরসিক আর আম্মা ছিলেন অসম্ভব ভালো রাঁধুনী। ঈদের দিনে টেবিল জুড়ে থাকবো বাহারী সব খাবার- দাবার। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত বিরামহীন ভাবে আসতো মেহমান। চলতো খাওয়া-দাওয়া, হাসি-আনন্দ আর জম্পেশ অড্ডা। আমাদের সব ভাই-বোনের বিয়ে হয়ে যাওয়ার পর ঈদের দিনের সেই দায়িত্বটা আমিই কাঁধে তুলে নিয়েছি। প্রতি বছরই আমার বাসায় থাকে বিশাল আয়োজন। আমি প্রাণ ভরে উপভোগ করি প্রতিটা মুহূর্ত।
ডালাসে ঈদের নামাজ শেষে
কখনো ভাবিনি দেশের বাইরে ঈদ করবো। কিন্তু কোনো না কোনোভাবে বেশ কয়েকটি দেশে ঈদ করার অভিজ্ঞতা হয়েছে আমার। আমি প্রথম দেশের বাইরে ঈদ করেছি আমেরিকার ডালাসে। ছোটবোন নাসরীনের বাসায়। ওখানে রোজার দিনগুলো আর দশটা সাধারণ দিনের মতোই। তবে বাঙালি মুসলমানরা মোটামুটি সবাই রোজা রাখেন। বাড়িতে বাংলাদেশের মতোই ইফতার তৈরি করেন। মসজিদে মুসলিম কমিউনিটি প্রতিদিনই ইফতারের আয়োজন করে। কেউ কেউ ব্যক্তিগতভাবে মসজিদে ইফতারের আয়োজন করেন। মসজিদে পুরুষের পাশাপাশি প্রচুর মহিলাও নামাজ পড়েন এবং ইফতারে শরিক হন। এসব মসজিদে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা-মুসলমানরা প্রচুর সাহায্য-সহযোগিতা করেন। রমজানে বিভিন্ন দেশ থেকে আসা মুসলমানরা কমিউনিটি সেন্টার ভাড়া করে ঈদমেলার আয়োজন করে। সেখানে জামা-জুতো থেকে শুরু করে জুয়েলারি, খাবার-দাবার সব কিছুই পাওয়া যায়। ঈদের দিন খুব ভোরে আমরা সবাই মিলে নতুন কাপড় জামা পরে মসজিদে গেলাম নামাজ আদায় করতে। পুরুষ এবং মহিলারা পাশাপাশি কামরায় বসে নামাজ পড়লাম। নামাজ শেষে কেক, মিষ্টি, সিঙাড়া, সমুচা, বিস্কিট এবং নানা ধরনের জুস দিয়ে সবাইকে আপ্যায়ন করা হলো।
লন্ডনে ছোট বোন শিরিনের বাসায় ঈদ
রাতে নাসরীনের বাসায় ছিল বিরাট আয়োজন। পাড়া-প্রতিবেশী আর বন্ধু-বান্ধব মিলে প্রায় সত্তর জন। নাসরীন আর ওর বর হাবিব মধ্যরাত পর্যন্ত ব্যস্ত ছিল মেহমানদারিতে। দুপুরে দাওয়াত ছিল নাসরীনের দেবর কল্লোলের বাসায়। বিদেশের মাটিতে প্রথম ঈদ বেশ ভালোই কেটেছে। তারপরেও বাংলাদেশের ঈদ মিস করেছি প্রতি মুহূর্তে।
ইংল্যান্ডে আমার ছেলে মেহযেব যখন ব্যারিস্টারি পড়তো তখন থেকে ওর পিএইচডি করা পর্যন্ত বেশ কয়েকবার ঈদ করতে হয়েছে। প্রথমবার ঈদ করেছি নিউ ক্যাসেলে। ওখানে প্রচুর বাংলাদেশি এবং পাকিস্তানি মুসলিম থাকলেও রমজান মাস তেমন একটা টের পাওয়া যায় না। খুব সাধারণ ভাবেই আমাদের রোজাগুলো কেটেছে। নিউ ক্যাসেলে মহিলারা রমজানে বা ঈদের দিনে মসজিদে নামাজ পড়তে যায় না। মসজিদে শুধু পুরুষরাই যায়। সেখানে খাওয়া-দাওয়ার কোনো আয়োজন থাকে না। সেই ঈদে বাসায়ই রান্না করে ছেলের এগারোজন বন্ধুকে দাওয়াত করে ছিলাম সঙ্গে মতিউরের এক বন্ধু মাহতাব ভাইকে তার পরিবারসহ বলেছিলাম। রাতে আমরা গিয়েছিলাম মাহতাব ভাইদের বাসায়। বিলাতের প্রথম ঈদ এভাবেই কেটে গেছে। ইংল্যান্ডের কোনো কোনো মসজিদে ঈদের নামাজের পর প্রচুর খাবারের আয়োজন থাকে। আমি তখন ডারহামে থাকি। এ শহরে চেনাজানা কেউ নেই। পথে ঘাটে কোনো বাঙালি চোখে পড়ে না। এরই মধ্যে ঈদ এসে গেল। পুরো ডারহামে কোনো মসজিদ নেই। বুকের ভেতর চাপা কষ্ট। ছেলে আর ছেলের বাবা কি ঈদের নামাজটাও পড়তে পারবে না? ছেলে সারাক্ষণই গুগলে সার্চ দেয়। আশেপাশে কোনো মসজিদ আছে কিনা। অনেক খোঁজাখুঁজির পর জানা গেল পাশের শহর বো বার্নে মুসলিম কমিউনিটি একটা হল ভাড়া করে নামাজের ব্যবস্থা করেছে। সেখানে নারী-পুরুষ সবাই আমন্ত্রিত। আমরা হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম। যাক সবাই মিলে অন্তত ঈদের নামাজটা পড়া যাবে। ঈদের আগের দিন থেকেই রান্নার প্রস্তুতি শুরু হয়ে গেল। ঈদের দিন একটু ভালোমন্দ রান্না না হলে কি চলে? ভোর হবার আগেই পোলাও কোরমা, কালিয়া, সেমাই রান্না শেষ করলাম। গোসল সেরে নতুন কাপড় পরে তৈরি হয়ে নিলাম নামাজের জন্য। সকাল আটটায় নামাজ। ভাড়ার ট্যাক্সিতে বো বার্ন পৌঁছুলাম। ওখানে গিয়ে মনে হলো সত্যি সত্যি আজ ঈদ।
ঢাকায় আমার বাসায় ঈদ
কত দেশের কত বর্ণের মানুষ। কেউ কালো, কেউ সাদা আবার কেউ আমাদের মতো। কথা বলছে কত রকম ভাষায়। আমরা কেউ কাউকে চিনি না। তবুও সবাই সবাইকে হাসি মুখে সম্ভাষণ জানাচ্ছে। পাশে বসে কথা বলছে। মনে হচ্ছে যেন একে-অপরের পরম আত্মীয়। নামাজ শেষে নাস্তার ব্যবস্থা কেক, মিষ্টি, বিস্কিট, চিপ্স, জুস আরো কত কি। নাস্তা শেষ হতেই চেয়ার-টেবিল লাগিয়ে দেয়া হলো দুপুরের খাবার পরিবেশন করা হবে। পোলাও ল্যাম্ব কারি আর সবজি। বারবার মাইকে অনুরোধ করা হচ্ছে- আপনারা লাঞ্চ না করে যাবেন না। কিছুক্ষণের মধ্যেই খাবার পরিবেশন করা হবে। মতিউর বললো চলো বাসায় ফিরে যাই। তোমার হাতের রান্না খাবো। আমার ভীষণ ইচ্ছে ছিল খেয়ে আসার। একটা নতুন অভিজ্ঞতা হতো। কিন্তু মুখ ফুটে কিছুই বলতে পারিনি কেমন যেন লজ্জা লাগছিল।
ইংল্যান্ডে বেশ কয়েকবার ঈদ করা হয়েছে। একবার ছোট বোন শিরীনের বাসায় ঈদ করলাম। ওরা লন্ডনে থাকে। লন্ডনের গ্রীন স্ট্রিটে গেলে কিছুটা ঈদের আমেজ পাওয়া যায়। শপিংমলে প্রচুর বাংলাদেশি, পাকিস্তানি এবং ভারতীয় দোকানপাট রয়েছে। ঈদ উপলক্ষে বিশেষ ছাড়। নতুন ডিজাইনের কাপড়- চোপড়, মহিলাদের মেহেদী পরার ব্যবস্থাÑএসবই রয়েছে সেখানে। শিরীনের বাসায় ছিল প্রচুর খাবার-দাবার আর বাড়তি পাওয়া হিসেবে ছিল বড় ভাবী আর চাচাত বোন শোভা আপার পরিবারের সাথে তুমুল আড্ডা। পরদিন গিয়েছিলাম শোভা আপার দাওয়াতে। খাওয়া-দাওয়া আর গল্প-গুজবে খুব সুন্দর সময় কেটেছে।
মেহযেব তখন ইংল্যান্ডে পড়ছে। আমরা বাংলাদেশে। সামনে ঈদ। পুরোদমে চলছে ঈদ প্রস্তুতি। ছেলে দেশে এসে আমাদের সাথে ঈদ করবে হঠাৎই ফোন পেলাম ইউনিভার্সিটি ঈদের দিনই পরীক্ষা দিয়ে রেখেছে। ওদের দেশে তো আর ঈদ নেই। মাথায় আকাশ ভেঙে পড়লো। মনে মনে ভাবলাম এবার ঈদই করবো না। ঠিক করলাম ঈদের সময়টা আমরা নেপালে থাকবো। তাহলে ঈদের দিনটায় মন খারাপ হবে না। ঈদের দু’দিন আগে নেপাল চলে গেলাম। উঠলাম এভারেস্ট হোটেলে। কাঠমান্ডু খুব একটা উন্নত শহর নয়। কিছুটা নোংরাও বটে। অনেকটা ঢাকা শহরের মতো। তবে নাগর কোট, পোখারা, ধুলিখেল এ জায়গাগুলো বেশ চমৎকার। নাগর কোটের আট হাজার ফুট সুউচ্চ পাহাড়ের ওপর কান্ট্রিভিলা হোটেলের দিনগুলো ছিল উপভোগ্য। সেখান থেকে অবাক দৃষ্টিতে দেখেছি হিমালয় পর্বত। আর মেঘের আনাগোনা। ঈদের আগের দিন কেন যেন মনটা ভীষণ খারাপ লাগছিল। বছরের একটা দিন মতিউর কি ঈদের নামাজটাও পড়তে পারবে না? হোটেলের লবীতে বসে আছি হঠাৎ দেখি এক ভদ্রলোক মোবাইলে বাংলায় কথা বলছে। কথা শেষ হতেই এগিয়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম আপনি কি বাংলাদেশি? ভদ্রলোক বললো, জ্বি আমি বাংলাদেশি ট্রাভেল এজেন্ট। আমার নাম শাহজাহান।
বললাম এখানে কি কোনো মসজিদ আছে? ঈদের নামাজ পড়তে চাই। ভদ্রলোক বললেন অবশ্যই আছে আমি সব ব্যবস্থা করে দেবো। ঈদের দিন খুব ভোরে ঘুম ভাঙলো। গোসল সেরে নতুন কাপড় পরে তৈরি হয়ে নিলাম। হোটেলের রেস্টুরেন্টে নাস্তা সেরে ট্যাক্সিতে উঠে পড়লাম সঙ্গে শাহজাহান ভাই। নেপাল হচ্ছে পৃথিবীতে একমাত্র হিন্দু রাষ্ট্র। যদিও জনসংখ্যার শতকরা দশভাগ মুসলিম। মসজিদের আশ-পাশে প্রচুর পুলিশ রাস্তা বন্ধ করে দাঁড়িয়ে আছে। সমস্ত গাড়ি ঘোড়া বন্ধ। শুধুমাত্র মুসল্লীদের গাড়ি চলাচল করছে। পাশাপাশি দুটো মসজিদ। একটা জামে মসজিদ অন্যটা কাশ্মিরী মসজিদ। দুটো মসজিদ মিলিয়ে একসাথে দশ হাজার মানুষ নামাজ পড়তে পারে। আমরা জামে মসজিদে ঢুকে পড়লাম। বিরাট মাঠ চারপাশে সুউচ্চ ভবন। মসজিদের ভেতর এবং মাঠে প্রচুর মুসল্লীর সমাগম। মহিলাদের জন্য আলাদা ব্যবস্থা থাকলেও তেমন একটা ভিড় নেই। লক্ষ্য করলাম প্রচুর টিভি ক্যামেরা এসেছে মুসল্লীদের অনুভূতি জানতে। নামাজ শেষে বেরিয়ে পড়লাম। আজ সারাদিন ঘুরে বেড়াবো। শপিং করবো। আর বড় কোনো রেস্টুরেন্টে খাবো। ঈদ বলে কথা। যদিও নেপালে আজকের দিনটা আর দশটা সাধারণ দিনের মতোই। সেখানে ঈদের কোনো ছায়াই পড়েনি। যদিও রাতে টিভিতে দেখলাম ঈদের নামাজের খবরগুলো খুব ফলাও করে প্রচার করা হচ্ছে।
একবার ঈদের তিনদিন আগে হঠাৎ করেই অসুস্থ হয়ে পড়লাম। জরুরি ভিত্তিতে ব্যাংকক চলে গেলাম। ব্যাংককের বামরুনগ্রাদ হসপিটালের পুরনো রোগী আমি। আমার পুরো পরিবারই এই হাসপাতালের রোগী। বছরে একবার সবাই মিলে চেকআপ করাই। তাই ব্যাংককের প্রতিটা অলিগলি আমার চেনা। চল্লিশ বছর আগে প্রথম যখন ব্যাংককে গিয়েছিলাম সেই ব্যাংকক আর আজকের ব্যাংককের মধ্যে বিস্তর ফারাক। ব্যাংকক এখন বদলে গেছে। আগের চাইতে অনেক উন্নত। চিকিৎসা সেবায়ও এগিয়ে গেছে অনেক দূর। আগে বামরুনগ্রাদে বিদেশি রোগী ছিল হাতে গোনা। এখন সেখানে স্থানীয়দের চাইতে বিদেশি রোগীর সংখ্যাই বেশি। বাংলাদেশ ছাড়াও মধ্যপ্রাচ্য থেকে প্রচুর রোগী আসছে এখন। রাস্তায় বের হলেই মধ্যপ্রাচ্যের প্রচুর পর্যটক চোখে পড়ে। বেশির ভাগই মুসলমান। থাইরা জানে কীভাবে পর্যটকদের আকৃষ্ট করতে হয়। চল্লিশ বছর আগে হোটেল, রেস্তরাঁ বা শপিংমলে কোথাও ওয়াশরুমের ভেতর পানি দেখিনি। একমাত্র টিস্যুই ছিল সম্বল। এখন প্রায় সব জায়গাতেই ওয়াশরুমগুলোতে লাগানো হয়েছে হ্যান্ড শাওয়ার। বিভিন্ন জায়গায় খোলা হয়েছে হালাল রেস্টুরেন্ট। বামরুনগ্রাদ হসপিটালের ভেতরে রয়েছে নামাজের জন্য নির্দিষ্ট স্থান। পুরো রমজান জুড়ে মুসলিম মালিকানাধীন রেস্টুরেন্টগুলোতে থাকে বিশেষ ইফতারের ব্যবস্থা। রমজানে আরবি হোটেল আল হাসানে প্রতিদিন বিনে পয়সায় ইফতার খাওয়ানো হয় রোজাদারদের। ঈদের দু’দিন আগে ব্যাংকক পৌঁছুলাম। বামরুনগ্রাদের পাশেই হোটেল নিলাম। ডাক্তার দেখালাম। ডাক্তার বললেন ছোট একটা অপারেশন লাগবে। ঈদের পরদিন সকালে অপারেশন। মতিউর বললো চিন্তা করো না ছোট অপারেশন। সব ঠিক হয়ে যাবে ইনশাআল্লাহ্। হাসপাতালের কাছেই বাংলা হোটেল। বাঙালিরা সাধারণত ওখানেই খাওয়া-দাওয়া করে। ঘনঘন যাওয়া হয় বলে মালিকের সাথে সখ্যতা গড়ে উঠেছে মতিউরের। ভদ্রলোকের নাম কামরুল ইসলাম। যদিও আমি অসুস্থ। তারপরও মন খারাপ করছিল মতিউরের জন্য। আহারে বেচারা ঈদের নামাজটাও পড়তে পারবে না। কামরুল ভাইকে জিজ্ঞেস করতেই বললেন আগামীকাল সকাল আটটায় বামরুনগ্রাদের নামাজের স্থানে ঈদের জামাত হবে। মহিলারাও যেতে পারবে সেখানে। এই বয়সে এসেও মনটা শিশুর মতোই রয়ে গেছে। মনে মনে ভাবলাম মরি বাঁচি যাই হোক আগামীকাল আমি নতুন কাপড় পরে ঈদের নামাজ পড়বো। ঈদের দিন খুব ভোরে উঠে গোসল সেরে দু’জনেই নতুন কাপড় পরে নামাজে গেলাম। পুরুষ এবং মহিলাদের জন্য পাশাপাশি ব্যবস্থা। বিভিন্ন দেশের মুসলমানরা একসাথে নামাজ আদায় করলাম। নামাজ শেষে সবাইকে এক বোতল পানি আর বক্সে করে সুজির হালুয়া দেয়া হলো। দিনের বেশির ভাগ সময়ই আমরা হোটেলেই কাটালাম। পরদিন সকালেই আমার অপারেশন।
বহুদিন থেকেই ইচ্ছে ছিল ভিয়েতনামে যাওয়ার কিন্তু সময় এবং সুযোগ হয়ে উঠছিল না। মতিউরের ব্যস্ততাই ছিল এর অন্যতম কারণ। সুযোগ খুঁজছিলাম। একটু ফাঁক-ফোঁকর পেলেই বেরিয়ে পড়বো। সামনে ঈদের ছুটি। ভেবেছিলাম ইংল্যান্ড থেকে মেহযেব এলে ওকে নিয়েই বেরিয়ে পড়বো। শেষ মুহূর্তে ছেলের ছুটি ক্যান্সেল হয়ে গেল। অগত্যা আমাদের দু’জনকেই যেতে হলো। থাই এয়ারওয়েজে টিকিট করলাম ঢাকা থেকে থাইল্যান্ড। এয়ারপোর্টে এক ঘণ্টা যাত্রা বিরতি। তারপর তিন ঘণ্টায় ভিয়েতনাম। সব মিলিয়ে সাত ঘণ্টায় আমরা ভিয়েতনামের রাজধানী হ্যানয় পৌঁছুলাম। এয়ারপোর্টে হোটেলের গাড়ি অপেক্ষা করছিল। গাড়ি ছুটে চলেছে হ্যানয় শহরটা খুব একটা সাজানো গোছানো নয়। অনেকটা ঢাকার মতোই। তবে ঢাকার মতো এত অসহ্য যানজট আর জনবহুল নয়। আমরা উঠেছি মে ডে ভিল হোটেলে। প্রথমেই ঠিক করলাম হা লং বেতে আমরা ক্রুজে যাব দু’দিনের জন্য। তারপর সিটি ট্যুর।
ক্রুজের দুটো দিন স্বপ্নের মতো কেটে গেল। পাহাড় পর্বত আর সাগরের নৈসর্গিক সৌন্দর্যে একেবারে মুগ্ধ হয়ে গেলাম। জাহাজের আতিথেয়তা ছিল মনে রাখার মতো। পরদিন বের হলাম সিটি ট্যুরে। হোচিমিনের সমাধি, পার্লামেন্ট ভবন, যাদুঘর আর প্রচুর মন্দির দেখে ফিরে এলাম হোটেলে। ভিয়েতনামে আসার পর একটা জিনিস লক্ষ্য করলাম এখানকার মানুষগুলো অসম্ভব ভালো। যেমনি ভদ্র ব্যবহার তেমনি পরোপকারী। পরদিন ঈদ। ঢাকার কথা ভেবে মনটা খারাপ হয়ে গেল। আহারে ঢাকায় থাকলে কত মজাই না হতো। ঢাকা শহর এখন রঙিন সাজে সেজেছে। ঈদের দিন আমার বাসায় কি বিশাল আয়োজন আর কত লোকের আনাগোনা। আর আমি? এই প্রবাসে কোথায় নামাজ পড়বো তারও কোনো ঠিক ঠিকানা নেই। ভিয়েতনামে আসার পর কোনো মসজিদ চোখে পড়েনি। গুগলে সার্চ দিয়ে জানা গেল হোটেলের মোটামুটি কাছে একটা মসজিদ রয়েছে। মসজিদ আল নূর। বহু বছরের পুরনো।
সকাল সাতটায় নামাজ। রিসিপশনে বললাম ভোর পাঁচটায় উঠিয়ে দিতে। তাড়াতাড়ি গোসল সেরে নতুন কাপড় পরে তৈরি হয়ে নিলাম। একটা ট্যাক্সি ডেকে মসজিদে চলে গেলাম। নামাজে বসলাম আশেপাশে প্রচুর মহিলা কিছু ভিয়েতনামি আর বেশির ভাগই ইন্দোনেশিয়ান এবং মালয়েশিয়ান। অনেকের সাথেই আলাপ হলো মনে হলো ওরা আমার কতকালের বন্ধু। নামাজ শেষে ছোট বাচ্চাদের হাতে খামে করে ঠাকা দেয়া হলো। বড়দের জন্য খেজুর আর তরমুজের শরবত। মসজিদ থেকে বের হওয়ার সময় সবার হাতে তুলে দেয়া হলো এক কেজি’র পিংক সল্টের প্যাকেট। হোটেলে ফিরে নাস্তা সেরে বেরিয়ে পড়লাম শপিংমলে। আজ প্রচুর কেনাকাটা করবো। আজ যে ঈদ। আজ কোনো হিসাব নয়।
