ইরানের গোয়েন্দা মন্ত্রী নিহত, হামলা আরও বিস্তৃত

ফন্ট সাইজ:

যুদ্ধ আরও বিস্তৃত হচ্ছে। ইরান ও লেবাননের রাজধানী বৈরুতে হামলা বাড়িয়েছে ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্র। ইরানও উপসাগরীয় দেশগুলোতে হামলা জোরদার করেছে। বুধবার ভোরে বৈরুতে ভয়াবহ বিমান হামলা চালায় ইসরাইল। আন্তর্জাতিক মিডিয়ার খবর, তেল আবিবের হামলায় কয়েকটি বেসামরিক ভবন মাটির সঙ্গে ধসে গিয়েছে। বলা হচ্ছে, বৈরুতে ইসরাইলের এই হামলাটি স্মরণকালের সবচেয়ে ভয়াবহ হামলাগুলোর একটি। বিশ্লেষকরা বলছেন, বৈরুতে হামলা জোরদার যুদ্ধ আরও বিস্তৃত হওয়ার ইঙ্গিত। এদিকে ইরানের শীর্ষ নিরাপত্তা কর্মকর্তা আলি লারিজানিকে হত্যার পর দেশটির গোয়েন্দা মন্ত্রী ইসমাইল খতিবকেও হত্যার দাবি করেছে দখলদাররা। গতকাল তেহরানে আলি লারিজানি এবং গোলামরেজা সোলাইমানির জানাজা অনুষ্ঠিত হয়েছে। তাদের জানাজায় রাজধানীতে জনতার ঢল নামে। তবে এভাবে ইরানি কর্মকর্তাদের হত্যা করে লক্ষ্য অর্জন করা যাবে না বলে মন্তব্য করেছেন দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি। তিনি বলেছেন, শীর্ষ কর্মকর্তাদের হত্যায় দেশটির কার্যক্রম থেমে যাবে না। তার মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল বুঝতে ব্যর্থ হয়েছে যে, ইসলামী প্রজাতন্ত্র কোনো একক ব্যক্তির ওপর নির্ভরশীল নয়।
প্রায় তিন সপ্তাহ ধরে চলা এই সংঘাতে উত্তেজনা কমার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে নজিরবিহীন বিঘ্ন তৈরি হওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের ওপর রাজনৈতিক চাপ বেড়েছে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে ডিজেলের দাম ২০২২ সালের পর প্রথমবারের মতো গ্যালনপ্রতি ৫ ডলার ছাড়িয়েছে।
ইসরাইল লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে স্থল অভিযান জোরদার করেছে এবং ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহকে লক্ষ্য করে হামলা চালাচ্ছে। এই গোষ্ঠীটি ইসরাইল সীমান্তে হামলা চালিয়ে ইরানের প্রতি সংহতি জানাচ্ছে।
এদিকে ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি মধ্যস্থতাকারী দেশগুলোর মাধ্যমে পাঠানো উত্তেজনা প্রশমনের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন। তিনি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলকে আগে নতি স্বীকার করতে বাধ্য করতে হবে।
ইরানের গোয়েন্দা মন্ত্রী নিহত: ইসরাইল দাবি করেছে, তারা ইরানের গোয়েন্দা মন্ত্রী ইসমাইল খতিবকে হত্যা করেছে। ইসরাইলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরাইল কাটজ এক বিবৃতিতে বলেন, গত রাতে ইরানের গোয়েন্দা মন্ত্রী খতিবকেও নির্মূল করা হয়েছে। তবে এ বিষয়ে এখনো কোনো মন্তব্য করেনি ইরান।
ইসমাইল খতিব ২০২১ সালে ইরানের সাবেক প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম রাইসির মাধ্যমে দেশটির গোয়েন্দা মন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ পান। তিনি ইসলামী আইনশাস্ত্র বিষয়ে পড়াশোনা করেছেন এবং ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিসহ একাধিক শীর্ষ ধর্মীয় নেতার অধীনে শিক্ষা গ্রহণ করেন।

খতিব ইরানের গোয়েন্দা মন্ত্রণালয় এবং সর্বোচ্চ নেতার কার্যালয়ে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেছেন। ২০২২ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি বিভাগ তাকে নিষেধাজ্ঞার আওতায় আনে। অভিযোগ ছিল, তিনি যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের বিরুদ্ধে সাইবার কার্যক্রম পরিচালনায় জড়িত ছিলেন। এ ছাড়া ধারণা করা হয়, ১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের পরপরই ১৯৮০ সালে তিনি ইসলামিক রেভ্যুলুশনারি গার্ড কর্পসে (আইআরজিসি) যোগ দেন।

বৈরুতের কেন্দ্রস্থলে ভয়াবহ হামলা: বৈরুতের বাচোরা এলাকায় ইসরাইল একটি ভবন খালি করার সতর্কতা দেয়, যা তাদের দাবি অনুযায়ী হিজবুল্লাহ ব্যবহার করতো। পরে ভবনটি সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দেয়া হয়। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ভোরে হামলার সময় ভবনটি ধুলোয় পরিণত হয়। স্থানীয় বাসিন্দা আবু খলিল জানান, সতর্কতার পর তিনি আশপাশের মানুষকে নিরাপদে সরিয়ে নিতে সহায়তা করেন। তিনি বলেন, এটি মানুষকে ভয় দেখানোর জন্যই করা হচ্ছে- বিশেষ করে শিশুদের। তবে শহরের আরও দু’টি এলাকায় কোনো সতর্কতা ছাড়াই হামলা চালানো হয়, যাতে অন্তত ১০ জন নিহত হয়েছেন বলে লেবাননের কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।

পাল্টাপাল্টি হামলা: ইসরাইলের অভ্যন্তরে ইরানের একটি ক্ষেপণাস্ত্র হোলন শহরের একটি আবাসিক এলাকায় আঘাত হানে, এতে সড়কে বড় গর্ত তৈরি হয় এবং গাড়িতে আগুন ধরে যায়। ইসরাইল দক্ষিণ লেবাননে স্থল অভিযান চালাচ্ছে। একইসঙ্গে তারা স্বীকার করেছে, যুদ্ধের এক সপ্তাহ পর ভুলবশত একটি জাতিসংঘ ঘাঁটিতে ট্যাংক থেকে গুলি চালানো হয়েছিল, যাতে তিনজন ঘানার শান্তিরক্ষী আহত হন।
বাড়ছে হতাহতের সংখ্যা: লেবাননের কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, দেশটিতে এখন পর্যন্ত প্রায় ৯০০ জন নিহত এবং ৮ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা এইচআরএএনএ-এর তথ্য অনুযায়ী, ফেব্রুয়ারির শেষ থেকে শুরু হওয়া হামলায় ইরানে ৩ হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছে। এ ছাড়া ইরানের হামলায় ইরাক ও উপসাগরীয় বিভিন্ন দেশেও হতাহতের ঘটনা ঘটেছে। ইসরাইলে নিহত হয়েছে অন্তত ১৪ জন।

যুদ্ধের লক্ষ্য ও বৈশ্বিক প্রভাব: ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছে, তাদের লক্ষ্য ইরানকে সীমান্তের বাইরে শক্তি প্রক্ষেপণ থেকে বিরত রাখা এবং তার পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি ধ্বংস করা। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, তারা হরমুজ প্রণালির কাছাকাছি ইরানের উপকূলীয় এলাকায় শক্তিশালী বাঙ্কার বাস্টার বোমা ব্যবহার করে হামলা চালিয়েছে, কারণ সেখানে ইরানের অ্যান্টি-শিপ ক্ষেপণাস্ত্র আন্তর্জাতিক নৌপরিবহনের জন্য হুমকি সৃষ্টি করছিল। হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিশ্বে প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল ও এলএনজি পরিবাহিত হয়। ইরান যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল-সম্পর্কিত ট্যাংকারে হামলার হুমকি দিয়ে যাচ্ছে, ফলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম বেড়ে গেছে।

তেহরানে লারিজানির জানাজায় জনতার ঢল: ইরানের রাজধানী তেহরানে দেশটির সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সচিব আলি লারিজানি, বাসিজ বাহিনীর কমান্ডার মেজর জেনারেল গোলামরেজা সোলাইমানির জানাজা অনুষ্ঠিত হয়েছে। বুধবার স্থানীয় সময় দুপুরে এই জানাজা অনুষ্ঠিত হয়েছে বলে জানিয়েছে রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম তাসনিম নিউজ। খবরে বলা হয়েছে, লারিজানির সঙ্গে নৌবাহিনীর ডজনখানেক সদস্যেরও জানাজা অনুষ্ঠিত হয়েছে। শীর্ষ এই কর্মকর্তাদের শেষ বিদায় জানাতে তেহরানে লাখ লাখ মানুষ উপস্থিত হয়। জানাজায় অংশ নেন বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সচিব আলি লারিজানি গত ১৭ই মার্চ তেহরানে ইসরাইলের বিমান হামলায় তার ছেলের সঙ্গে নিহত হয়েছেন। একইভাবে, বাসিজ বাহিনীর কমান্ডার মেজর জেনারেল গোলামরেজা সোলেইমানিও তেহরানে ইসরাইলি যুদ্ধবিমানের হামলায় প্রাণ হারিয়েছেন। এদিনের অনুষ্ঠানে ইরানি নৌবাহিনীর নিহত নাবিকদেরও জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। শ্রীলঙ্কার উপকূলের কাছে ৪ঠা মার্চ যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর টর্পেডো হামলায় জাহাজটি ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং এতে বহু নৌসেনা নিহত হন।

ইসরাইলের শতাধিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা: ইরান দাবি করেছে, তাদের সামরিক বাহিনী নতুন দফা প্রতিশোধমূলক হামলায় ইসরাইলের ১০০টির বেশি লক্ষ্যবস্তুতে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে। ইরানি বার্তা সংস্থা তাসনিমের খবরে বলা হয়, অপারেশন ট্রু প্রমিস ৪-এর অংশ হিসেবে এটি ছিল ৬১তম দফা হামলা। যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের সামরিক অভিযানের জবাবে এই হামলা চালানো হয়েছে। ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সচিব আলি লারিজানি নিহত হওয়ার প্রতিশোধ হিসেবে তেল আবিবে খোররামশাহর-৪, কাদর, এমাদ ও খাইবার-শেকান ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হয় বলে জানানো হয়েছে।

বিশ্বের বৃহত্তম গ্যাসক্ষেত্রে হামলা: ইরানের গণমাধ্যম জানিয়েছে, বিশ্বের বৃহত্তম প্রাকৃতিক গ্যাসক্ষেত্র দক্ষিণ পার্স গ্যাসক্ষেত্রে অবস্থিত একটি পেট্রো কেমিক্যাল কমপ্লেক্সে বিমান হামলা হয়েছে। হামলার জন্য ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রকে দায়ী করেছে দেশটি। তাসনিমের খবরে বলা হয়, হামলার পর স্থাপনাটিতে আগুন ধরে যায়। উদ্ধারকারী দল ও ফায়ার সার্ভিসের চেষ্টায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে। এ ঘটনায় কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি। প্রতিবেদন অনুযায়ী, বুধবার ভোরে ওই হামলা চালানো হয়। উল্লেখ্য, সাউথ পার্স গ্যাসক্ষেত্রটি ইরান ও কাতার যৌথভাবে পরিচালনা করে এবং এটি বিশ্বের সবচেয়ে বড় গ্যাসক্ষেত্র।

তেলের বাজারে তাৎক্ষণিক প্রভাব: এই হামলার খবর প্রকাশের পর বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ব্রেন্ট ক্রুড অয়েল-এর দাম বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ১০৮.৬০ ডলারে পৌঁছায়, যা আগের দিনের তুলনায় প্রায় ৫ শতাংশ বেশি। এ ছাড়া যুক্তরাজ্যের গ্যাসের মানদণ্ড মূল্যও প্রায় ৬ শতাংশ বেড়ে ১৩৯ পেন্স প্রতি থার্মে দাঁড়িয়েছে। তবে চলমান সংঘাতের শুরুর দিকে যে সর্বোচ্চ দামে পৌঁছেছিল, বর্তমান মূল্যস্ফীতি তার নিচেই রয়েছে বলে জানা গেছে। বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্বের বৃহত্তম গ্যাসক্ষেত্রে হামলার খবর জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে, যা সরাসরি তেল ও গ্যাসের দামে প্রভাব ফেলছে।


কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন