ইসরাইল-ইরানের যুদ্ধ চলমান। একের পর এক হামলা। প্রতিনিয়ত আতঙ্ক বিরাজ করছে গোটা মধ্যপ্রাচ্যে। যেখানে জীবিকার তাগিদে অবস্থান করছেন অসংখ্য বাংলাদেশি। চলমান যুদ্ধের থমথমে পরিস্থিতির মধ্যেই আগামীকাল ঈদ। ভয় আতঙ্ক যেখানে বাস করছে, সেখানে ঈদের আনন্দ প্রায় মøান প্রবাসীদের কাছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে নিয়মিত কার্যক্রম চালিয়ে গেলেও নানা শঙ্কা থাকছে কাতার প্রবাসীদের মধ্যে। দূতাবাস থেকে ইতিমধ্যেই জানানো হয়েছে, সবাইকে নিকটস্থ মসজিদে ঈদের নামাজ আদায় করতে।
কাতারের দোহায় বাস করা বাংলাদেশি কর্মী মাহফুজ বলেন, এবার ঈদের কোনো আনন্দ নাই। এত টেনশন নিয়ে ঈদ হয় কীভাবে? বাড়িতে পরিবারের সদস্য স্ত্রী সন্তান সারাক্ষণ কান্না করছে। ছুটি পাইনি তাই দেশেও আসতে পারলাম না। আল্লাহ্ যা কপালে রেখেছেন, তাই হবে।
কাতার ইরানের খুব কাছেই। সঙ্গে আছে বাহরাইনও। এই দুই দেশে অবস্থানরত আরও অনেক প্রবাসী জানিয়েছেন ভয়ের অভিজ্ঞতার কথা। বাহরাইনের মানামা থেকে বাংলাদেশি অভিবাসী শাহীনুর আলম বলেন, আমরা সমুদ্রের পারে কাজ করি, ওপারেই ইরান। হামলার সময় সমুদ্রের দিক থেকে অদ্ভুত সব শব্দ আসছিল। আমরা ভয়ে নৌকায় যাওয়া বন্ধ করে দিই। কাতারের আরেক প্রবাসী আরিফ হোসেন বলেন, একটু পর পর বিকট শব্দে ভয়ে ঘুমাতে পারিনি। মনে হচ্ছে, এই বুঝি মাথার ওপর ক্ষেপণাস্ত্র এসে পড়লো!
কুয়েতও সীমান্তবর্তী দেশ হওয়ায় প্রবাসীরা যুদ্ধের পুরনো স্মৃতি নিয়ে আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। নোয়াখালীর সেনবাগের তরুণ প্রবাসী ইমরান হোসেন বলেন, আমরা খুব আতঙ্কে আছি। কাজ শেষে সবাই রুমে ঢুকে আল্লাহ্র নাম নেয়া ছাড়া আর কোনো কাজ নেই। নাজমুল হুদা, ফজলুল করিম, জানে আলমসহ বেশ কয়েকজন প্রবাসীর ভাষ্য, শনিবার রাত থেকে বাংলাদেশে তাদের স্বজনরা ভীষণ চিন্তিত। বিভিন্ন পর্যায়ের আত্মীয়স্বজন তাদের ফোনে খোঁজখবর রাখছেন। অভয় ও সাহসের পাশাপাশি সতর্ক থাকার পরামর্শ দিচ্ছেন। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে অনেকে সম্ভাব্য অর্থনৈতিক টানাপড়েনের কারণে চাকরি হারানোর ভয়েও আছেন। আর এর মধ্যে ঈদের মতো বড় উৎসবেও কোনো আমেজ পাচ্ছেন না বলেও জানান তারা।
কুয়েতের কর্মী ভিসায় যাওয়া মেহেদী হাসান বলেন, আমি গত ছয় মাস আগে অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রীকে রেখে এসেছি। আমার আসার এক মাসের মধ্যে কন্যাসন্তান আসে দুনিয়াতে। এখনো কোলে নিতে পারিনি। ভেবেছিলাম ঈদে যেভাবেই হোক আসবো। কিন্তু সেটা আর হলো না। চলমান যুদ্ধের কারণে খুবই দুশ্চিন্তায় আছি। আমার কিছু হয়ে গেলে স্ত্রী সন্তানরা কোথায় গিয়ে থাকবে। তাদের সবকিছু আমার আয়ের ওপর। এর মধ্যে ঈদের মতো একটি খুশির দিনে প্রবাসে কাটছে আমার ভয়ের মধ্যে।
নিকটস্থ মসজিদে ঈদের নামাজ আদায়
মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতের প্রেক্ষাপটে কাতারে বসবাসরত প্রবাসী বাংলাদেশিদের ঈদুল ফিতরের নামাজ নিকটস্থ মসজিদে আদায় করার আহ্বান জানিয়েছে দোহার বাংলাদেশ দূতাবাস। মঙ্গলবার এক জরুরি বিজ্ঞপ্তিতে এই নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। এতে বলা হয়, উপসাগরীয় অঞ্চলে সাম্প্রতিক বিরাজমান যুদ্ধাবস্থার প্রেক্ষিতে কাতারের আওকাফ ও ইসলামিক-বিষয়ক মন্ত্রণালয় এ বছরের ঈদুল ফিতরের নামাজ সবাইকে মসজিদে আদায় করার জন্য অনুরোধ জানিয়েছে। কাতার সরকারের এই সিদ্ধান্ত এবং নির্দেশনার প্রতি সম্মান জানিয়ে প্রতি বছরের মতো এবার বাংলাদেশ এম এইচ এম স্কুল ও কলেজ প্রাঙ্গণে ঈদুল ফিতরের জামায়াত আয়োজন করা সম্ভব হচ্ছে না। এই অবস্থায় কাতারে অবস্থানরত সব বাংলাদেশি নাগরিককে কাতার সরকারের নির্দেশনার প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকে এবং যথাযথ সতর্কতা অবলম্বন করে নিজ নিজ এলাকার নিকটস্থ মসজিদে ঈদুল ফিতরের নামাজ আদায় করার জন্য বিশেষভাবে অনুরোধ করা হচ্ছে।
দেশে ফিরলেন ৪৩০ বাংলাদেশি
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতিতে কাতারে আটকে পড়া ৪৩০ জন বাংলাদেশি দেশে ফিরেছেন। গত শুক্রবার রাতে কাতার এয়ারলাইন্সের বিশেষ একটি ফ্লাইটে বিমানবন্দরে অবতরণ করেন যাত্রীরা। তাদের বহনকারী কাতার এয়ারওয়েজের একটি বিশেষ ফ্লাইট হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করে। বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ জানায়, আটকে পড়া বাংলাদেশিদের মধ্যে ট্রানজিটে থাকা যাত্রী ও দূতাবাসের কর্মীরাও ছিলেন। জানা যায়, ফ্লাইট বাতিল হওয়ায় তারা দেশে ফিরতে পারছিলেন না। তাই বাংলাদেশ সরকার কাতার কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করে তাদের নিরাপদে ফিরিয়ে আনতে এই বিশেষ ফ্লাইটের ব্যবস্থা করে। এর আগে ১১ই মার্চ জারি করা এক জরুরি বার্তায় দূতাবাস জানিয়েছে, ক্ষতিগ্রস্ত প্রবাসী বাংলাদেশিদের ভ্রমণ সহজ করতে তারা কাতার সরকার ও কাতার এয়ারওয়েজের সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগ রক্ষা করছে। বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, বাংলাদেশে ফিরতে চাওয়া যাত্রীদের মধ্যে পরিবার, নারী, শিশু ও বয়স্কদের এই বিশেষ ফ্লাইটে অগ্রাধিকার দেয়া হবে।
প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, সৌদি আরব, কাতার, বাহরাইন ও সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ কয়েকটি দেশে ফ্লাইট চলাচলে সীমাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে চার্টার ফ্লাইট পরিচালনা করা হচ্ছে। পাশাপাশি সোশ্যাল মিডিয়ায় যুদ্ধসংক্রান্ত কোনো তথ্য ছড়িয়ে পড়লে সংশ্লিষ্ট আইডি শনাক্ত করে ব্যবস্থা নিচ্ছে ওইসব দেশের কর্তৃপক্ষ। অনেক ক্ষেত্রে গ্রেপ্তারের ঘটনাও ঘটছে।
