ইরান হামলার জেরে বিবেকের দংশনে পদত্যাগ করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল কাউন্টার টেরোরিজম সেন্টারের পরিচালক জো কেন্ট। মঙ্গলবার সামাজিক মাধ্যমে দেয়া এক বিবৃতিতে তিনি নিজেই এ সিদ্ধান্তের কথা জানান। বিবৃতিতে কেন্ট বলেন, আমি বিবেকের দংশনে ইরানে চলমান এই যুদ্ধকে সমর্থন করতে পারছি না। ইরান আমাদের দেশের জন্য কোনো তাৎক্ষণিক হুমকি ছিল না। ইসরাইল ও তাদের প্রভাবশালী মার্কিন লবির চাপেই এই যুদ্ধ শুরু হয়েছে বলেও মন্তব্য করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ এই কর্মকর্তা। ন্যাশনাল কাউন্টার টেরোরিজম সেন্টার যুক্তরাষ্ট্র সরকারের সন্ত্রাসী হুমকি সম্পর্কিত গোয়েন্দা কার্যক্রম তদারকি করে এবং পরিচিত ও সন্দেহভাজন সন্ত্রাসীদের একটি ডাটাবেজ সংরক্ষণ করে।
কেন্ট জাতীয় গোয়েন্দা পরিচালকের অধীনে কাজ করতেন এবং তিনি তুলসি গ্যাবার্ডের ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক সহযোগী ছিলেন। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে গ্যাবার্ড তুলনামূলকভাবে নীরব রয়েছেন এবং অতীতে তিনি বিদেশে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হস্তক্ষেপের সমালোচনা করেছেন। সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশিত প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পকে লেখা এক চিঠিতে কেন্ট জানান, ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদের নীতিমালার প্রতি তার সমর্থন ছিল। তবে তিনি অভিযোগ করেন, ইসরাইলের প্রভাবে ট্রাম্প ভুল পথে পরিচালিত হয়েছেন এবং এমন এক যুদ্ধে নতুন প্রজন্মকে পাঠানো সমর্থনযোগ্য নয়, যা আমেরিকান জনগণের কোনো উপকারে আসে না।
কেন্ট যুক্তরাষ্ট্রের আর্মি স্পেশাল ফোর্সে দীর্ঘ ২০ বছরের কর্মজীবনে ১১টি যুদ্ধ মিশনে অংশ নেন এবং পরে জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ-তে কাজ করেন। ২০১৯ সালে সিরিয়ায় এক সন্ত্রাসী হামলায় তার স্ত্রী শ্যানন কেন্ট নিহত হন। অন্যদিকে ট্রাম্প ও তার সমর্থকরা অতীতে অভিযোগ করে আসছেন, গোয়েন্দা সংস্থাগুলো প্রেসিডেন্টকে দুর্বল করার চেষ্টা করেছে এবং এ কারণে এসব সংস্থায় বড় ধরনের সংস্কার প্রয়োজন। কেন্টের নিয়োগ ছিল প্রশাসনের বৃহত্তর পরিকল্পনার অংশ, যার মাধ্যমে গোয়েন্দা, আইনশৃঙ্খলা ও কূটনৈতিক গুরুত্বপূর্ণ পদে বিশ্বস্ত ব্যক্তিদের বসানো হচ্ছিল। তিনি পূর্বে দাঙ্গায় জড়িতদের ‘রাজনৈতিক বন্দি’ বলে উল্লেখ করেছিলেন এবং একটি ডানপন্থি গোষ্ঠীর সদস্য বলে পুলিশের দাবি করা এক ব্যক্তির সঙ্গে তার যোগাযোগ ছিল বলেও জানা গেছে।
যুদ্ধ চালিয়ে যেতে একাট্টা ইরান: মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনা আরও জটিল রূপ নিচ্ছে, যেখানে সামরিক সংঘাত, কূটনৈতিক অচলাবস্থা এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা সংকট একসঙ্গে গভীর অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। এই সংকটের জন্য মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প এবং ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে দায়ী করেছেন বিশ্লেষকরা। বিনা উস্কানিতে ইরানে হামলার জেরেই জ্বলছে মধ্যপ্রাচ্য। ব্যাহত হচ্ছে জ্বালানি উৎপাদন। ঝুঁকিতে পড়েছে গোটা বিশ্ব। বিশ্লেষকরা সতর্ক করেছেন যে, এ বছর জ্বালানি অর্থনীতির স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক কম হবে। তেহরান যে এতটা চৌকস আক্রমণ চালাবে তা চিন্তাও করতে পারেন নি ট্রাম্প। ফক্স নিউজকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি নিজেই এ কথা বলেছেন। যুদ্ধের বাস্তব চিত্র বলছে, পরিস্থিতি এখন আর ট্রাম্পের হাতে নেই।
বিশ্বকে এক অর্থনৈতিক ঝুঁকির মধ্যে ফেলে ইউরোপীয় মিত্রদের যুদ্ধে টেনে আনার চেষ্টা করছেন। যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব পাঠিয়েছেন ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের টেবিলে। কিন্তু চাপিয়ে দেয়া এই যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার কথা জানিয়েছে ইরান। দেশটির নবনির্বাচিত নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের আত্মসমর্পণ ছাড়া এই যুদ্ধ শেষ হবে না। শান্তি আলোচনায় বসার আগে উভয়কেই নতি স্বীকার করতে হবে।
অন্যথায় কোনোরকম শান্তি আলোচনার সময় হয়নি বলে মন্তব্য করেছেন ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দুইজন কর্মকর্তার বরাতে এই তথ্য জানিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স। সূত্রের দাবি, দু’টি মধ্যস্থতাকারী দেশ ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে উত্তেজনা কমানো বা যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব পাঠায়। তবে প্রস্তাবগুলোর বিস্তারিত বা কোনো দেশগুলো মধ্যস্থতা করেছে, তা জানানো হয়নি। একটি সূত্র বলেছে, সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে দায়িত্ব নেয়ার পর প্রথম বৈদেশিক নীতি বৈঠকে যোগ দেন মোজতবা খামেনি। তবে তিনি বৈঠকে সরাসরি উপস্থিত ছিলেন নাকি ভার্চ্যুয়ালি অংশ নেন, তা স্পষ্ট করা হয়নি। গত সপ্তাহে নিহত পিতার স্থলাভিষিক্ত হওয়ার পর থেকে তাকে এখনো প্রকাশ্যে দেখা যায়নি।
উপসাগরীয় দেশগুলোতে হামলায় বিস্মিত ট্রাম্প: ইরান উপসাগরীয় প্রতিবেশী দেশগুলোতেও হামলা চালিয়েছে, যা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের কাছে অপ্রত্যাশিত বলে মনে হয়েছে। তবে মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থানরত ছয়জন বিদেশি কূটনীতিক রয়টার্সকে জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরাইল ইরানের ওপর হামলা চালালে তেহরান উপসাগরীয় আরব দেশগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করবে- এমন আশঙ্কা আগে থেকেই ছিল। সংঘাত শুরুর পর থেকে সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ উপসাগরীয় দেশগুলোতে দুই হাজারের বেশি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা হয়েছে। এসব হামলায় মার্কিন কূটনৈতিক মিশন, সামরিক ঘাঁটি, তেল স্থাপনা, বন্দর, বিমানবন্দর, জাহাজ এবং আবাসিক ও বাণিজ্যিক ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের ফুজাইরাহ বন্দরে টানা চারদিনের মধ্যে তৃতীয় হামলার ফলে রপ্তানি টার্মিনালে আগুন লাগে এবং মঙ্গলবার তেল লোডিং আংশিকভাবে বন্ধ হয়ে যায়। হরমুজ প্রণালির বাইরে অবস্থানের কারণে এই বন্দরটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এখান থেকে প্রণালি এড়িয়ে তেল রপ্তানি করা সম্ভব। এই পরিস্থিতিতে বৈশ্বিক বাজারে তেল সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, যা জ্বালানির দাম আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। আমিরাত কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, প্রতিহত করা একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের ধ্বংসাবশেষ আবুধাবির বানি ইয়াস এলাকায় পড়ে এক পাকিস্তানি নাগরিক নিহত হয়েছেন। এ ছাড়া আবুধাবির শাহ গ্যাসক্ষেত্রে ড্রোন হামলায় সৃষ্ট আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ চলছে। সংঘাত দীর্ঘায়িত হওয়ায় বিনিয়োগকারীদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। মঙ্গলবার তেলের দাম প্রায় ৪ শতাংশ বেড়েছে এবং শেয়ারবাজারে দরপতন হয়েছে।
কেউ ঝুঁকিতে ফেলতে চায় না নিজেদের জনগণকে: বিশ্ব অর্থনীতির ওপর প্রভাব কমাতে হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালু করতে মিত্র দেশগুলোর সামরিক সহায়তা চেয়েছেন ট্রাম্প। তবে এখন পর্যন্ত তার আহ্বানে সাড়া মেলেনি। রয়টার্সকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে ইউরোপীয় ইউনিয়নের পররাষ্ট্রনীতি প্রধান কাজা কাল্লাস বলেছেন, প্রণালি খোলা রাখতে কূটনৈতিক সমাধান খুঁজে বের করতে হবে। তিনি বলেন, হরমুজ প্রণালিতে কেউই নিজেদের জনগণকে ঝুঁকিতে ফেলতে প্রস্তুত নয়। আমাদের কূটনৈতিক উপায়ে এটি খোলা রাখতে হবে, যাতে খাদ্য, সার ও জ্বালানি সংকট তৈরি না হয়।
