গার্ডিয়ানের রিপোর্ট

ট্রাম্পের আহ্বান প্রত্যাখ্যান করেছে ইউরোপের দেশগুলো

ফন্ট সাইজ:

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলতে সহায়তার আহ্বান প্রত্যাখ্যান করেছে ইউরোপীয় দেশগুলো। ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন, যদি ন্যাটোর সদস্যরা এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ খুলতে সাহায্য না করে, তবে ন্যাটো ‘খুব খারাপ ভবিষ্যৎ’-এর মুখে পড়তে পারে। তবুও ইউরোপের দেশগুলো সেখানে যুদ্ধজাহাজ পাঠাতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। জার্মানি স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, তারা কোনো সামরিক অভিযানে অংশ নেবে না। হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালু করার প্রচেষ্টাতেও নয়। দেশটির চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মেৎস বলেন, এ বিষয়ে কোনো যৌথ সিদ্ধান্ত হয়নি। তাই জার্মানি সামরিকভাবে কীভাবে অংশ নেবে। এ প্রশ্নই ওঠে না। আমরা এতে অংশ নেবো না। তিনি আরও বলেন, ইরানের বর্তমান শাসনব্যবস্থার অবসান হওয়া উচিত। কিন্তু অতীত অভিজ্ঞতা বলছে, বোমা হামলার মাধ্যমে তা সম্ভবত সঠিক উপায় নয়। এ খবর দিয়েছে অনলাইন গার্ডিয়ান।
জার্মানির প্রতিরক্ষামন্ত্রী বরিস পিস্টোরিয়াস বলেন, এটা আমাদের যুদ্ধ নয়। আমরা এটি শুরু করিনি। হরমুজ প্রণালিতে কয়েকটি ইউরোপীয় যুদ্ধজাহাজ পাঠিয়ে এমন কী করা সম্ভব, যা শক্তিশালী মার্কিন নৌবাহিনী একা করতে পারছে না? অন্যদিকে বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ের স্টারমার বলেন, তার দেশ ‘বৃহত্তর যুদ্ধে জড়িয়ে পড়বে না’। তবে একটি ‘কার্যকর পরিকল্পনা’ নিয়ে কাজ করছে। তিনি বলেন, তেলের বাজারে স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালু করা প্রয়োজন। কিন্তু এটি সহজ কাজ নয়। তিনি কোনো পদক্ষেপ পুরোপুরি বাতিল না করলেও বলেন, তা যত বেশি সম্ভব অংশীদার দেশের সম্মতিতে হতে হবে। ইউরোপীয় নেতারা সামরিক পদক্ষেপের বদলে কূটনৈতিক সমাধানের ওপর জোর দিয়েছেন। হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল ও তরলীকৃত গ্যাস পরিবহন হয়। তা ইরান কার্যত বন্ধ করে দিয়েছে। ইতালির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্তোনিও তাজানি বলেন, কূটনৈতিক পথই প্রাধান্য পাওয়া উচিত। তিনি জানান, তার দেশ কোনো নৌ অভিযানে যুক্ত নয় এবং লোহিত সাগরে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিদ্যমান মিশন হরমুজে সম্প্রসারণের সম্ভাবনাও কম। ইউরোপের এই অবস্থানটি তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ কয়েকদিন আগে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল একসঙ্গে ইরানের ওপর হামলা চালালেও ইউরোপীয় দেশগুলো ট্রাম্পকে সরাসরি সমালোচনা করা এড়িয়ে গিয়েছিল। শুরুতে এই সামরিক অভিযানের লক্ষ্য ছিল শাসন পরিবর্তন। তবে এখন তা একটি বৃহত্তর আঞ্চলিক সংঘাতে রূপ নিয়েছে। যার ফলে জ্বালানির দাম বেড়ে গেছে। অস্ট্রেলিয়া, ফ্রান্স এবং জাপানও জানিয়েছে, তারা যুদ্ধজাহাজ পাঠানোর কোনো পরিকল্পনা করছে না। সোমবার এক সংবাদ সম্মেলনে ট্রাম্প আবারো মিত্র দেশগুলোকে আহ্বান জানান, যেন তারা হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল পুনরায় চালু করতে সহায়তা করে। তিনি বলেন, কিছু দেশ খুবই আগ্রহী, আবার কিছু নয়। একই সঙ্গে তিনি আবারো বৃটেনের ওপর অসন্তোষ প্রকাশ করেন। তিনি ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসকে দেয়া সাক্ষাৎকারে বলেন, যেসব দেশ এই প্রণালির সুবিধা ভোগ করে, তাদের উচিত এর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। যদি তারা সাড়া না দেয় বা নেতিবাচক সাড়া দেয়, তবে ন্যাটোর ভবিষ্যৎ খুব খারাপ হতে পারে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা বৈঠকে লোহিত সাগরে তাদের ছোট নৌ মিশনের দায়িত্ব বাড়ানোর প্রস্তাবও প্রত্যাখ্যান করেন। কায়া কাল্লাস বলেন, এই মিশন শক্তিশালী করার ইচ্ছা থাকলেও এর ম্যান্ডেট পরিবর্তনের ব্যাপারে আগ্রহ ছিল না। ইউরোপীয় নেতারা আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যুদ্ধের লক্ষ্য সম্পর্কে তারা পরিষ্কার ধারণা চান। মারগুস সাখনা বলেন, আমরা ট্রাম্পের কৌশলগত লক্ষ্য কী- তা জানতে চাই। গ্রিস-ও জানায়, তারা হরমুজ প্রণালিতে কোনো সামরিক অভিযানে অংশ নেবে না। এদিকে ইসরাইল জানিয়েছে, তারা ব্যাপক আকারে হামলা চালিয়েছে। তারা দাবি করেছে, তেহরানের মেহরাবাদ বিমানবন্দরে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির ব্যবহৃত একটি বিমান ধ্বংস করেছে। ইসরাইলি সামরিক মুখপাত্র নাদাভ শোশানি জানান, আগামী তিন সপ্তাহের জন্য বিস্তারিত সামরিক পরিকল্পনা প্রস্তুত রয়েছে।
সংঘাত ধীরে ধীরে উপসাগরীয় অঞ্চলেও ছড়িয়ে পড়ছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতের ফুজাইরাহ বন্দরে ড্রোন হামলার পর আগুন লাগায় তেল লোডিং কার্যক্রম বন্ধ করা হয়েছে। একই সময়ে তেল আবিব ও জেরুজালেমে বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে, যখন ইরান থেকে ছোড়া একটি ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করা হয়। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বলেন, তারা যুদ্ধবিরতি চান না। তবে এর মানে এই নয় যে, তারা যুদ্ধ চান। তিনি বলেন, এই যুদ্ধ এমনভাবে শেষ হতে হবে যাতে শত্রুরা ভবিষ্যতে আর এমন আক্রমণের কথা চিন্তাও না করে। ইরানের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী সাঈদ খাতিবজাদেহ যুক্তরাষ্ট্রকে সতর্ক করে বলেন, ভিয়েতনামে কী হয়েছিল, তা মনে রাখুন।
সংঘাতের ফলে হতাহতের সংখ্যাও বাড়ছে। যুক্তরাষ্ট্র জানায়, প্রায় ২০০ সেনা আহত হয়েছে। এর মধ্যে বেশির ভাগই আবার দায়িত্বে ফিরেছে। এ ছাড়া ২৮শে ফেব্রুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত ১৩ জন সেনা নিহত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংস্থা হিউম্যান রাইটস অ্যাক্টিভিস্টস নিউজ এজেন্সি জানায়, ১১ই মার্চ পর্যন্ত ইরানে কমপক্ষে ১৮২৫ জন নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে ১২৭৬ জনই বেসামরিক নাগরিক।
এদিকে লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে ইসরাইল তাদের স্থল অভিযান সম্প্রসারণ করেছে। ইরান সমর্থিত গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ’র সঙ্গে সংঘর্ষে সেখানে কমপক্ষে ৮৫০ জন নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে শতাধিক শিশু। জার্মানি এই অভিযানের সমালোচনা করে বলেছে, এটি মানবিক সংকটকে আরও জটিল করে তুলবে এবং একটি ভুল সিদ্ধান্ত।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন