কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ‘বাব এল-মান্দেব’ প্রণালি অবরোধের কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছে ইরান-সমর্থিত ইয়েমেনের সশস্ত্র গোষ্ঠী আনসারুল্লাহ বা হুতি বিদ্রোহীরা। লোহিত সাগরের প্রবেশদ্বারে অবস্থিত এই জলপথে অবরোধ দিলে ইসরাইল এবং তার প্রধান মিত্র যুক্তরাষ্ট্রের নৌযানগুলো আর নির্বিঘ্নে চলাচল করতে পারবে না বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছে গোষ্ঠীটি। ইরানে চলমান পরিস্থিতিতে হুতিদের এই ঘোষণা সংঘাতের নতুন ফ্রন্ট খোলার ইঙ্গিত দিচ্ছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, যদি এই প্রণালিটি সত্যিই অবরুদ্ধ হয়, তবে বিশ্ব জুড়ে জ্বালানি তেল সরবরাহ ও পণ্য পরিবহনে বিপর্যয় নেমে আসবে। যা বিশ্ববাণিজ্যে সরাসরি আঘাত করবে। ইরানের বিপ্লবী গার্ড কর্তৃক হরমুজ প্রণালি অবরুদ্ধ করে রাখায় তেল অর্থনীতিতে বিশাল সংকট দেখা দিয়েছে। এই অবস্থায় কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ বাব এল-মান্দেব প্রণালি অবরুদ্ধ করলে চলমান সংকট আরও তীব্র হবে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।
হুতিদের কড়া হুঁশিয়ারি: হুতির সামরিক কর্মকর্তা আবদেল আল থাওরি বলেন, যদি যুদ্ধে সরাসরি হস্তক্ষেপের সিদ্ধান্ত আসে, তবে প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক নৌ অবরোধ দেয়া হবে। তিনি বলেন, এমন পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরাইলগামী বাণিজ্যিক জাহাজ ও যুদ্ধজাহাজ- এমনকি বিমানবাহী রণতরীগুলোতে হামলা হবে। আবদেল আরও বলেন, হুতিরা আরেকটি পদক্ষেপ হিসেবে বাব এল-মান্দেব প্রণালি পুরোপুরি বন্ধ করে দেয়ার বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করছে। যাতে ইসরাইলের বন্দরগামী কোনো জাহাজ চলাচল করতে না পারে।
বাব এল-মান্দেব প্রণালি বিশ্ব অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ জলপথ: বাব এল-মান্দেব কেবল একটি জলপথ নয়, এটি বিশ্ব অর্থনীতির ‘লাইফলাইন’ বা জীবনরেখা হিসেবে পরিচিত। এটি লোহিত সাগরকে এডেন উপসাগর ও আরব সাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে। এর একদিকে রয়েছে ইয়েমেন এবং অন্যদিকে জিবুতি ও ইরিত্রিয়া। একদিকে এশিয়া অন্যদিকে আফ্রিকা। মধ্যপ্রাচ্য থেকে ইউরোপ ও আমেরিকায় জ্বালানি তেল এবং প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) পাঠানোর প্রধান পথ এটি। প্রতিদিন লাখ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল এই সরু পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। সুয়েজ খাল দিয়ে চলাচলকারী যেকোনো জাহাজকে অবশ্যই বাব এল-মান্দেব পার হতে হয়। এটি অবরুদ্ধ হওয়া মানে কার্যত সুয়েজ খালকে অচল করে দেয়া। এশিয়া থেকে ইউরোপে পাঠানো কনজ্যুমার গুডস বা নিত্যপণ্যের সিংহভাগ এই পথেই যায়। অবরোধ সৃষ্টি হলে জাহাজের পথ পরিবর্তন করে পুরো আফ্রিকা ঘুরে আসতে হবে, যা পরিবহন খরচ ও সময় বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে।
ইসফাহানে হামলা, নিহত ১৫: ইরানের মধ্যাঞ্চলীয় শহর ইসফাহানের একটি শিল্প এলাকায় যৌথভাবে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল। এতে অন্তত ১৫ জন নিহত হয়েছেন। হামলার সময় একটি কারখানার ভেতরে কর্মরত শ্রমিকরা সেখানে অবস্থান করছিলেন বলে ইরানি গণমাধ্যম জানিয়েছে। আধা-সরকারি বার্তা সংস্থা ফার্স জানায়, ওই হামলায় গরম ও ঠান্ডা করার যন্ত্রপাতি তৈরির একটি কারখানা লক্ষ্যবস্তু হয়। গত ২৮শে ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলা শুরুর পর থেকে সংঘাতের ১৫তম দিনে এসে এ ঘটনা ঘটলো। ইরানের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, এ পর্যন্ত অন্তত ১ হাজার ৪৪৪ জন নিহত এবং ১৮ হাজার ৫০০-এর বেশি মানুষ আহত হয়েছেন। সংঘাত শুরুর পর থেকে ইরানের বিভিন্ন শহরে ধারাবাহিক হামলার ঘটনা ঘটছে।
ইরানের খার্গ দ্বীপে ফের হামলার হুমকি: ইরানের গুরুত্বপূর্ণ তেল রপ্তানি কেন্দ্র খার্গ দ্বীপে আরও হামলার হুমকি দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। সেই সঙ্গে বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের প্রধান পথ হরমুজ প্রণালির সুরক্ষায় মিত্র দেশগুলোকে যুদ্ধজাহাজ পাঠানোর আহ্বান জানিয়েছেন। ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যুদ্ধ তৃতীয় সপ্তাহে গড়ানোর মধ্যে ট্রাম্প বলেন, মার্কিন হামলায় খার্গ দ্বীপের বড় অংশ ‘সম্পূর্ণ ধ্বংস’ হয়ে গেছে। মার্কিন সংবাদমাধ্যমে ট্রাম্প বলেন, আমরা মজা করার জন্যও হয়তো আরও কয়েকবার সেখানে হামলা চালাতে পারি। মার্কিন প্রেসিডেন্টের এই মন্তব্যকে উত্তেজনা বৃদ্ধির ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে। এর আগে তিনি বলেছিলেন, খার্গ দ্বীপে শুধু সামরিক স্থাপনাগুলোকেই লক্ষ্য করা হচ্ছে। একই সময়ে মধ্যপ্রাচ্যের কিছু মিত্র দেশের আলোচনার উদ্যোগও তার প্রশাসন উপেক্ষা করেছে বলে একাধিক সূত্র জানিয়েছে।
হরমুজে উদ্ধারের আহ্বানে তাৎক্ষণিক সাড়া নেই: ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চীন, ফ্রান্স, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও যুক্তরাজ্যসহ কয়েকটি দেশকে হরমুজ প্রণালিতে যুদ্ধজাহাজ পাঠানোর আহ্বান জানান। তবে এসব দেশের কেউই তাৎক্ষণিকভাবে এতে সাড়া দেয়নি। জাপানের ক্ষমতাসীন দলের নীতিনির্ধারণী প্রধান তাকায়ুকি কোবায়াশি বলেন, এ ধরনের পদক্ষেপের জন্য আইনি সীমা অনেক বেশি কঠোর। তিনি দেশটির সরকারি সমপ্রচারমাধ্যমকে জানান, জাপানের যুদ্ধোত্তর শান্তিবাদী সংবিধান অনুযায়ী দেশের অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়লে তবেই সেনা মোতায়েন করা সম্ভব। দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট কার্যালয় জানিয়েছে, বিষয়টি তারা সতর্কভাবে পর্যালোচনা করবে। অন্যদিকে ফ্রান্স নিরাপত্তা পরিস্থিতি স্থিতিশীল হলে প্রণালি সুরক্ষায় একটি আন্তর্জাতিক জোট গঠনের চেষ্টা করছে। যুক্তরাজ্যও মিত্রদের সঙ্গে বিভিন্ন বিকল্প নিয়ে আলোচনা করছে বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। এদিকে ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি বলেছেন হরমুজ প্রণালি বন্ধই রাখা উচিত।
যুদ্ধ ও জ্বালানি সংকট দীর্ঘায়িত হওয়ার শঙ্কা: চলমান সংঘাত দ্রুত শেষ হওয়ার কোনো লক্ষণ নেই। একই সঙ্গে ইরান কার্যত হরমুজ প্রণালিতে তেলের ট্যাংকার চলাচল সীমিত করায় বৈশ্বিক তেলবাজারে চাপ বাড়ছে। বিশ্বের প্রায় পাঁচ ভাগের এক ভাগ তেল এই প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়। ফলে এই পথ বন্ধ থাকায় তা বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য বড় সংকট তৈরি করতে পারে বলে আশঙ্কা বিশ্লেষকদের। ট্রাম্প বলেছেন, তেহরান হয়তো যুদ্ধ শেষ করতে কোনো চুক্তিতে আগ্রহী, তবে এখন পর্যন্ত প্রস্তাবিত শর্তগুলো যথেষ্ট ভালো নয়। সামাজিক মাধ্যমে দেয়া এক পোস্টে ট্রাম্প বলেন, হরমুজ প্রণালি দিয়ে যে সকল দেশ তেল পায়, তাদেরই এই পথের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা উচিত এবং যুক্তরাষ্ট্র এতে বড় ধরনের সহায়তা দেবে। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি সতর্ক করে বলেছেন, ইরানের জ্বালানি স্থাপনায় হামলা হলে তার জবাব দেয়া হবে। ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী জানিয়েছে, তারা ইসরাইল এবং অঞ্চলে থাকা তিনটি মার্কিন ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে। তাদের দাবি, ইরানের শিল্পাঞ্চলে নিহত শ্রমিকদের ঘটনার প্রতিশোধ হিসেবে এ হামলা চালানো হয়েছে। ইসরাইলি সেনাবাহিনী বলেছে, তারা আসা হামলাগুলো প্রতিহত করার চেষ্টা করছে। এদিকে সৌদি আরবের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, রাজধানী রিয়াদ এবং পূর্বাঞ্চলে ১০টি ড্রোন ভূপাতিত করা হয়েছে। ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী এ হামলার সঙ্গে নিজেদের সম্পৃক্ততা অস্বীকার করেছে। ড্রোন হামলা ও অগ্নিকাণ্ডের পর সংযুক্ত আরব আমিরাতের জাহাজে জ্বালানি সরবরাহের বড় কেন্দ্র ফুজাইরাহে আবার তেল লোডিং কার্যক্রম শুরু হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ইরাকে অবস্থানরত তাদের নাগরিকদের দেশ ছাড়ার সতর্কবার্তা দিয়েছে।
