ছয়দিন পর মুসলমানদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব ঈদুল ফিতর। ঈদে নতুন পোশাক পরিধান বাঙালির ঐতিহ্যের অংশ। এরই ধারাবাহিকতায় শনিবার ঈদের শেষ মুহূর্তের সাপ্তাহিক ছুটির দিনে নতুন পোশাক কেনার জন্য রাজধানীর বিপণিবিতানগুলোতে ছিল ক্রেতাদের উপচে পড়া ভিড়। এদিন সকাল থেকে শিশু থেকে শুরু করে বিভিন্ন বয়সী মানুষের পদচারণায় মুখর হয়ে উঠে বিপণিবিতানগুলো, যা গভীর রাত পর্যন্ত অব্যাহত থাকে। বড় বড় বিপণিবিতানগুলোর পাশাপাশি ফুটপাথের অস্থায়ী মার্কেটগুলোর গলিতেও ছিল না পা রাখার জায়গা। বিশেষ করে মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তের আস্থার জায়গা ছিল নিউ মার্কেট, মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেটসহ ফুটপাথের অস্থায়ী মার্কেটগুলো।
বিক্রেতারা বলছেন, সকাল থেকে কেনাবেচা শুরু হলেও বিকাল ও ইফতারির পর মার্কেটগুলো লোকে লোকারণ্য হয়ে ওঠে। শনিবার ঈদের আগে শেষ সাপ্তাহিক ছুটি হওয়ায় চাকরিজীবীসহ অনেকেই কেনাকাটা সেরে ফেলতে মার্কেটে এসেছেন। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, এবারের ভারতীয় পণ্যের পাশাপাশি পাকিস্তানি, চায়না ও থাই পোশাকের প্রতি ক্রেতাদের আগ্রহ বেশি। গরমের মৌসুমের কথা মাথায় রেখে ক্রেতারা সুতি ও আরামদায়ক কাপড় বেশি কিনেছেন। অন্যদিকে ক্রেতারা অভিযোগ করেছেন এবারের পোশাকের দাম বেশি রাখছেন বিক্রেতারা। সরজমিন রাজধানীর শনিরআখড়া, নিউ মার্কেট, গাউছিয়া, হকার্স মার্কেট ও মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেট ঘুরে দেখা যায়, মার্কেটগুলোতে চলছে ক্রেতা-বিক্রেতাদের কেনাবেচার ঘুম, চলছে দর-কষাকষি। তবে বড় বড় বিপণিবিতানগুলোতে দাম বেশি থাকায় সাধ ও সাধ্যের সমন্বয় ঘটাতে মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তরা ভিড় জমিয়েছেন নিউ মার্কেট, হকার্স মার্কেট, কৃষি মার্কেটসহ ফুটপাথ ও অস্থায়ী মার্কেটগুলোতে। ঈদের নতুন পোশাক, জুতা প্রসাধনী কিংবা গৃহস্থালির প্রয়োজনীয় সামগ্রী এক ছাদের নিচে পাওয়া যাওয়ায় নিউ মার্কেট, গাউছিয়া ও মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেট ছিল ক্রেতাদের প্রথম পছন্দ।
মার্কেট ঘুরে দেখা যায়, কেউ স্ত্রী-সন্তান ও পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে এসেছেন, আবার কেউ বন্ধুদের সঙ্গে ঈদের কেনাকাটায় মেতেছেন। মার্কেট জুড়ে ক্রেতাদের উপচেপড়া ভিড় থাকায় দম ফেলার ফুরসত ছিল না দোকানিদের। একেকজন ক্রেতা একেক ধরনের পোশাক দেখতে চাইলে সেই চাহিদা মেটাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে কর্মচারীদের। কেউ থ্রি-পিস, টু-পিস ট্রায়াল দিচ্ছেন, কেউ শার্ট- প্যান্ট। আবার কেউ শাড়ি গায়ের সঙ্গে ধরে সঙ্গে থাকা পরিবারের সদস্যদের কাছে মতামত নিচ্ছনে মানিয়েছে কিনা। অনেকে আবার পছন্দের ড্রেস না পাওয়ায় দোকানিকে অন্য ড্রেস দেখাতে বলছেন। দোকান জুড়ে ছিল উৎসবের এক ব্যাস্ত ছিত্র। এবারের ঈদে মেয়েদের পছন্দের তালিকায় রয়েছে- ফারসি সালোয়ার কামিজ, আগানুর, শাহিনশাহ, তাওকাল, মুসলিম অরগেঞ্জা, সিকুয়েন্স, সাদা বাহার বুটিক্স, কারিজমা ও শারারা থ্রি পিস। এছাড়া গরমকে সামনে রেখে ক্রেতারা হালকা পাতলা ও সুতি কাপড়কে প্রাধান্য দিচ্ছেন। শাড়ির কালেকশনে রয়েছে- জামদানি, সুতি, জামদানি, কাতান, সিল্ক কাতান, কাঞ্জিভরম কাতান, ফেন্ডি সিল্ক। এবারে কাতান, মহীশূর কাতান বা মাহেশ্বরী সিল্ক, কোটা শাড়ি বেশি চলছে। ছেলেদের পছন্দের তালিকায় রয়েছে শার্ট, প্যান্ট, কার্গো, টুইল পান্ট, ব্যাগি প্যান্ট, পাঞ্জাবি ও পায়জামা। এছাড়া রয়েছে বিভিন্ন ডিজাইনের জুতাও। মার্কেট জুড়ে রাজত্ব করছে কাজ করা রকমারি জুতা। এরমধ্যে স্নেকার্স, কেডস, লোফার, ক্যাজুয়াল জুতা, ফ্ল্যাট হিল, ওয়েডজ হিল, পেন্সিল হিল, নাগড়া, পাম্প সু, জুত্তি জুতা ইত্যাদি রয়েছে। জুতায় রয়েছে স্টোন ও পুতির কারুকাজ। শনিরআখড়া আর এস মার্কেটের দ্যা আউটফিটে চার বছর বয়সী মিনহাজের পায়ে জুতা ফিট হয়েছে কি না তা পরখ করছিলেন তার বাবা জাবেদ। ওষুধ কোম্পানিতে চাকরি করেন জাবেদ। বেতন পাওয়ায় চলে এসেছেন পরিবারের সদস্যদের নিয়ে। তিনি বলেন, ঈদ মানে খুশি আর আনন্দ। সেই আনন্দকে ভাগাভাগি করতেই পরিবারের সদস্যদের নিয়ে এসেছি নতুন পোশাক কিনতে। এখানে মধ্যবিত্তের নাগালে দাম থাকায় এই মার্কেটে এসেছি বড় বড় ব্রাণ্ডের দোকানে যাইনি। মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেটে স্ত্রী সন্তানকে নিয়ে এসেছেন সিএনজিচালক সগির আহমেদ। তিনি বলেন, এখানে দাম আমাদের নাগালে থাকায় কেনাকাটা করতে প্রতি বছরই এই মার্কেটে আসা হয়। বাচ্চার জন্য ৪০০ টাকা দিয়ে পাঞ্জাবি কিনেছি অন্য দোকানে গেলে এই দামে কেনা সম্ভব হতো না।
কারণ বড় বড় মার্কেটে দাম অনেক বেশি। ঈদে তো সবাইকে নতুন পোশাক কিনে দিতে হয়, তা নাহলে তো ঈদ জমে না। বছরে এই একদিনই সবাই একইসঙ্গে নতুন পোশাক পরে এটাই আনন্দ।
নিউ মার্কেট জাহান ম্যানশনে ঈদের কেনাকাটা করতে এসেছেন ব্যাংক কর্মকর্তা ফয়সাল হোসেন। তিনি বলেন, অফিস বন্ধ থাকায় কেনাকাটা করতে চলে এসেছি , পাঁচদিন পর অফিস বন্ধ হয়ে যাবে। এর আগে সাপ্তাহিক ছুটির দিন আর না থাকায় আজই চলে এসেছি। ঈদের আনন্দকে স্মৃতিময় করে তুলতেই নতুন পোশাক কেনা। ঈদের দিন পরিবারের সকলে মিলে ছবি তুলা, আত্মীয় স্বজনদের বাসায় যাওয়া এইগুলাই তো ঈদের আনন্দ। এই সময়টাতে পরিবারের সবাই একসঙ্গে মিলিত হতে পারে। আজ মার্কেটে ভিড় অনেক পছন্দের ড্রেস কিনতে বেগ পোহাতে হচ্ছে অনেক, দোকানিদের দম ফেলার সময় নেই। দু-তিন দোকান থেকে ফিরে এসেছি প্রচণ্ড ভিড়ের কারণে।
এলিফ্যান্ট রোডে প্লাস পয়েন্ট শো-রুমে কথা হয় সরকারি চাকরিজীবী জাহিদ হোসেনের সঙ্গে। তিনি বলেন, ঈদ মানে খুশি, ঈদ মানে আনন্দ। সেই আনন্দ যেন স্মৃতিময় হয়ে থাকে সেজন্য পরিবারের সবার জন্য নতুন পোশাক কিনছি। আজ ঈদের আগে শেষ সাপ্তাহিক ছুটি হওয়ায় ভিড় অনেক। তারপরেও মানিয়ে নিচ্ছি এটাও খুশির একটা অংশ। এমন উৎসবমুখর পরিবেশ তো আর সবসময় আসে না। ব্রান্ডের দোকানে এসেছি কারণ, এখানে ভিড় হলেও এসি থাকায় একটু স্বাচ্ছন্দ্যে কেনাকাটা করা যায়। শরীরে ক্লান্তি লাগে না। আমার স্ত্রী আর দুই বাচ্চাদের কেনাকাটা প্রায় শেষ, এখান থেকে পাঞ্জাবি কিনে জুতার দোকানে যাবো। সময়তো আর বেশি নেই।
নিউ মার্কেটের মনিকা ফ্যাশনের বিক্রেতা সাব্বির হোসেন বলেন, আলহামদুলিল্লাহ বিক্রি ভালো হচ্ছে। ঈদের এই মুহূর্তেই বেচাকেনা বেশি হয় আমাদের। আজ সাপ্তাহিক ছুটি ক্রেতাদের উপচেপড়া ভিড়, ইফতারির পর ভিড় আরও বেশি হয়। গরমের মৌসুম থাকায় ক্রেতারা সুতি ও পাতলা কাপড়ের দিকে বেশি ঝুঁকছেন। তাই ক্রেতাদের পছন্দের কথা মাথায় রেখে সুতি ও আরামদায়ক কাপড়ের বিভিন্ন ডিজাইনের কালেকশন রেখেছি দোকানে। এবারের ঈদে ফারসি সালোয়ার কামিজ বেশি চলছে। ঈদ উপলক্ষে বেশির ভাগ ক্রেতা ভারতীয় ও পাকিস্তানি পোশাক চান। আমাদের এখানে ৮০০ থেকে শুরু করে ৪ হাজার টাকার পর্যন্ত থ্রি-পিস আছে। ঈদ উপলক্ষে দোকানে নতুন কালেকশন এনেছি।
ওদিকে জুতার দোকানেও ক্রেতাদের উপস্থিতি ছিল অনেক। শেষ মুহূর্তে ড্রেসের সঙ্গে মানিয়ে পছন্দের জুতা কিনতে ভিড় করেছেন নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ। এলিফ্যান্ট রোডে নিউ লেদার দোকানে বন্ধুদের সঙ্গে জুতা কিনতে এসেছেন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়য়ের শিক্ষার্থী অর্ণব। তিনি বলেন, এক জোড়া লোফার কিনবো কারণ পাঞ্জাবির সঙ্গে লোফার আর স্লিপার ছাড়া অন্য কোনো জুতা মানানসই হয় না। ব্রান্ডের দোকানে দুই হাজারের নিচে লোফার নেই তাই এখানে এসেছি একটু কম দামে জুতা কিনতে।
এপেক্স শো-রুমে কেডস হাতে দেখে যাচাই-বাচাই করছিলেন সফটওয়ার ইঞ্জিনিয়ার সাইফুল আলম। তিনি বলেন, কেনাকাটা প্রায় শেষ। এখন শুধু কেডস কিনবো। সাপ্তাহিক ছুটির দিন থাকায় মার্কেটে অনেক ভিড়। পাঞ্জাবি শার্ট কিনতে অনেক বেগ পেতে হয়েছে। দোকানিদের দম ফেলার সময় ছিল না। ভিড় হবে এই বিষয় মাথায় রেখেই মার্কেটে এসেছি। দিন শেষে পরিবারে সঙ্গে ঈদ কাটাতে পারলেই খুশি। ঈদে নতুন পোশাক পরা তো বাঙালির ঐতিহ্যের অংশ।
ছুটির দিনে মার্কেটে উপচে পড়া ভিড়, মধ্য ও নিম্নবিত্তের আস্থা ফুটপাথ
আফজাল হোসেন
১৫ মার্চ (রবিবার), ২০২৬
লিংক কপি হয়েছে!
ফন্ট সাইজ:
100%
