নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্র যখন নিরাপত্তা ঝুঁকি

রোহিঙ্গা ক্যাম্প

নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্র যখন নিরাপত্তা ঝুঁকি

ফন্ট সাইজ:

তিতাস শেখের মৃত্যু, ১২০ জনকে জিম্মি করার ঘটনা এবং মাঠপর্যায়ের নিরাপত্তা-তথ্য বলছে, মানবিক সংকটের পাশাপাশি রোহিঙ্গা ক্যাম্প ও সীমান্তবর্তী এলাকায় অপরাধী নেটওয়ার্কের বিস্তার এখন বড় ধরনের উদ্বেগ তৈরি করছে। সীমান্তের ওপাশের বিভিন্ন বিদ্রোহী গোষ্ঠীর চলমান সংঘাতের আঁচ আর এপাশে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে নিরাপত্তার উচ্চ ঝুঁকি সামগ্রিক পরিস্থিতিকে জটিল ও বিপজ্জনক দিকে নিয়ে যাচ্ছে। ফলে নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্র ক্রমশ পরিণত হচ্ছে নিরাপত্তা ঝুঁকিতে।

টেকনাফের রঙ্গীখালী পাহাড়ে বৃহস্পতিবারের গোলাগুলি আবারো একটি কঠিন প্রশ্ন সামনে এনেছে: রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিতে গিয়ে বাংলাদেশ কি ক্যাম্প ও আশপাশের এলাকায় ক্রমবর্ধমান নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়ছে? সশস্ত্র মানব পাচারকারীদের হাতে প্রায় ১২০ জন রোহিঙ্গা ও বাংলাদেশি নাগরিক জিম্মি থাকার গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে যৌথ বাহিনী অভিযান চালায়। ১৫-১৬ জনের একটি সশস্ত্র দলের সঙ্গে গোলাগুলিতে সেনাবাহিনীর সৈনিক মো. তিতাস শেখ (২৭) গুরুতর আহত হন। পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। আইএসপিআরের তথ্য অনুযায়ী, ওই অভিযানে ৫৭ জনকে উদ্ধার এবং পাঁচজনকে আটক করা হয়েছে। একটি পিস্তল, একটি দেশীয় তৈরি বন্দুক ও চার রাউন্ড গোলাবারুদও উদ্ধার করা হয়। অর্থাৎ গোয়েন্দা তথ্যে ১২০ জন জিম্মি থাকার কথা বলা হলেও অভিযানে উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে ৫৭ জনকে। বাকি ব্যক্তিদের বিষয়ে স্পষ্ট তথ্য জনসমক্ষে আসা প্রয়োজন। তারা পালিয়ে কোথায় গেছে বা কাদের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে রয়েছে, সেটাও উদ্‌ঘাটন করা দরকার। সশস্ত্র-সন্ত্রাসমূলক ঘটনাটি কেবল একটি পাহাড়ি এলাকায় সংঘটিত গোলাগুলির ইস্যু নয়। এর মধ্যে সীমান্তবর্তী অঞ্চলে মানব পাচার, অপহরণ, সশস্ত্র অপরাধ এবং দুর্বল নজরদারির একটি জটিল বাস্তবতা প্রকাশ পেয়েছে।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো- যে ভূখণ্ডে বিপুলসংখ্যক বাস্তুচ্যুত মানুষকে নিরাপত্তা দেয়ার কথা, সেই ভূখণ্ডের কিছু অংশে তাদেরই একটি অংশ সশস্ত্র গোষ্ঠী ও অপরাধী চক্রের শিকার হচ্ছে। একইসঙ্গে স্থানীয় জনগোষ্ঠী, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং মানবিক কার্যক্রমও ঝুঁকির মধ্যে পড়ছে। কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের ৩৩টি ক্যাম্পে বসবাসকারী রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে যৌথ সুরক্ষা পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনগুলো উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরেছে। জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা ইউএনএইচসিআর, আইওএম, আইআরসি, ডিআরসি, অক্সফাম সহ বিভিন্ন সংস্থা এসব প্রতিবেদন তৈরিতে যুক্ত। এখানে শুধু সংবাদমাধ্যমের বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, মাঠপর্যায়ের ফোকাস গ্রুপ আলোচনা, বাড়ি পরিদর্শন এবং গুরুত্বপূর্ণ তথ্যদাতাদের সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে নিরাপত্তা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হয়।
২০২৫ সালের প্রথম তিন মাসে ৩৩টি ক্যাম্পে ৩৯৮টি গুরুতর নিরাপত্তা ঘটনা নথিভুক্ত হয়, যাতে ৬৩৪ জন রোহিঙ্গা সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হন। এর মধ্যে ১৭৬টি অপহরণ ও জিম্মি করার ঘটনা, ১১৮টি গুরুতর শারীরিক নির্যাতন, ৫৫টি চাঁদাবাজি, ২৪টি নিয়োগ বা রিক্রুটমেন্ট, ১৫টি গুলিবর্ষণ বা আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহারের ঘটনা এবং ১০টি হত্যাকাণ্ড ছিল। একই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অপহরণ ও জিম্মি করার ঘটনা আগের প্রান্তিকের তুলনায় ১২ শতাংশ বেড়েছিল।

২০২৫ সালের অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত পর্যবেক্ষণেও পরিস্থিতির মৌলিক পরিবর্তন দেখা যায়নি। ওই তিন মাসে ৩৩টি ক্যাম্পে ৩২৪টি গুরুতর নিরাপত্তা ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে, যাতে ৫১০ জন রোহিঙ্গা সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হন। এর মধ্যে ১৫৮টি অপহরণ ও জিম্মি করার ঘটনা, ৭৫টি গুরুতর শারীরিক নির্যাতন, ৫১টি চাঁদাবাজি, ১৯টি রিক্রুটমেন্ট, ১৮টি গুলিবর্ষণ বা আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহারের ঘটনা এবং দু’টি হত্যাকাণ্ড ছিল। সংখ্যায় আগের প্রান্তিকের তুলনায় ঘটনা কমলেও অপহরণ ও জিম্মি করার প্রবণতা তখনো সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা উদ্বেগ হিসেবে রয়ে যায়। এই পরিসংখ্যানের তাৎপর্য শুধু অপরাধের সংখ্যা দিয়ে বোঝা যাবে না। অপহরণ, মুক্তিপণ আদায়, জোরপূর্বক নিয়োগ এবং চাঁদাবাজি একটি জনগোষ্ঠীর দৈনন্দিন জীবনকে কীভাবে নিয়ন্ত্রণের মধ্যে নিয়ে আসে- সেটিও বিবেচনায় নিতে হবে। ২০২৫ সালের প্রথম প্রান্তিকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কিছু ক্ষেত্রে অপহৃত ব্যক্তিদের মুক্তির জন্য পরিবারের কাছ থেকে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত আদায় করা হয়েছে। অপহরণের শিকার ব্যক্তিদের মধ্যে এমন তরুণও ছিলেন, যারা সশস্ত্র গোষ্ঠীতে যোগ দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন। রোহিঙ্গা ক্যাম্পের নিরাপত্তা সমস্যার একটি বড় দিক হলো- সংগঠিত সশস্ত্র গোষ্ঠীর প্রভাব বিস্তার। বিভিন্ন সংগঠিত গোষ্ঠীর তৎপরতা নিয়ে বিভিন্ন পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। এসব গোষ্ঠীর মধ্যে প্রভাব বিস্তার, নিয়ন্ত্রণ, অর্থ সংগ্রহ এবং মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের সংঘাতে অংশগ্রহণের জন্য লোক সংগ্রহের প্রবণতা দেখা গেছে।

২০২৫ সালের প্রথম প্রান্তিকের যৌথ পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তরুণদের মিয়ানমারের সংঘাতে অংশ নিতে উৎসাহিত করার জন্য বিভিন্ন ক্যাম্পে সভা ও বৈঠকের খবর পাওয়া গেছে। ১৫ থেকে ৩৫ বছর বয়সী কিছু তরুণকে অর্থের প্রলোভন দেখানো হয়েছে, আবার কাউকে হুমকি দেয়া হয়েছে। এমনকি অভিভাবকদের মধ্যে সন্তানদের মাদ্রাসা বা জনসমাগমস্থলে পাঠানো নিয়েও ভয় তৈরি হয়েছিল।
পরবর্তী ২০২৫ সালের শেষ প্রান্তিকের প্রতিবেদনেও সংগঠিত গোষ্ঠীগুলোর তৎপরতার কথা উঠে এসেছে। অন্তত ১৫টি ক্যাম্পে বিভিন্ন গোষ্ঠীর সভা ও সমাবেশের খবর নথিভুক্ত হয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে তরুণদের মিয়ানমারে গিয়ে আরাকান আর্মির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে অংশ নিতে উৎসাহিত করার অভিযোগ পাওয়া গেছে। যারা যেতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে, তাদের ওপর চাপ, ভয়ভীতি বা নির্যাতনের অভিযোগও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য মনে রাখা জরুরি। রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী এবং সশস্ত্র গোষ্ঠী এক বিষয় নয়। অধিকাংশ রোহিঙ্গা নিজেরাই এসব গোষ্ঠীর ভয়ভীতি, চাঁদাবাজি, অপহরণ ও জোরপূর্বক নিয়োগের শিকার। ফলে নিরাপত্তা সংকটের সমাধান করতে গিয়ে পুরো জনগোষ্ঠীকে সন্দেহের চোখে দেখা বা সমষ্টিগতভাবে দায়ী করা হলে অপরাধী গোষ্ঠীগুলোই লাভবান হবে। রাষ্ট্রের লক্ষ্য হওয়া উচিত অপরাধী নেটওয়ার্ককে বিচ্ছিন্ন করা এবং সাধারণ শরণার্থীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা।

টেকনাফের রঙ্গীখালীর ঘটনা মানবপাচারের সঙ্গে সশস্ত্র অপরাধের সংযোগকে সামনে এনেছে। পাহাড়ি পথ, সীমান্তবর্তী জনপদ এবং সমুদ্রপথ ব্যবহার করে মানব পাচারের ঝুঁকি দীর্ঘদিনের। পাচারকারীরা কখনো চাকরি, কখনো বিদেশে উন্নত জীবনের প্রলোভন দেখায়। আবার কাউকে অপহরণ করে আটকে রেখে পরিবারের কাছ থেকে মুক্তিপণ আদায় করা হয়। নারী ও শিশুদের ক্ষেত্রে যৌন শোষণ এবং জোরপূর্বক শ্রমের ঝুঁকিও রয়েছে।
জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক বিশেষজ্ঞরা ২০২৬ সালের ২৯শে জুলাই প্রকাশিত এক বিবৃতিতে জানান, ২০২৫ সালে ছয় হাজার পাঁচ শতাধিক রোহিঙ্গা বিপজ্জনক সমুদ্রযাত্রায় অংশ নিয়েছিলেন এবং আনুমানিক ৯০০ জন প্রাণ হারিয়েছেন।

তাদের হিসাবে, এই যাত্রায় অংশ নেয়া মানুষের প্রায় ৬৬ শতাংশ ছিলেন নারী ও শিশু। বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, দীর্ঘস্থায়ী বাস্তুচ্যুতি, রাষ্ট্রহীনতা, কর্মসংস্থানের অভাব এবং নিরাপদ অভিবাসনের পথ না থাকা মানবপাচারের ঝুঁঁকি বাড়াচ্ছে।
মানব পাচার, মাদক ও অস্ত্রের অবৈধ বাণিজ্যকে আলাদা অপরাধ হিসেবে দেখলে পুরো চিত্রটি বোঝা কঠিন। একই অপরাধী নেটওয়ার্ক একাধিক অবৈধ কর্মকাণ্ডে যুক্ত হতে পারে। পাহাড়ি আস্তানা, সীমান্তের অনিয়ন্ত্রিত চলাচল, স্থানীয় যোগাযোগ এবং সমুদ্রপথের ব্যবহার তাদের কার্যক্রম সহজ করে। তবে কোনো নির্দিষ্ট পাচারকারী চক্রের সঙ্গে সন্ত্রাসী সংগঠনের অর্থায়নের সরাসরি সম্পর্ক আছে-এমন সিদ্ধান্তের জন্য তদন্ত ও প্রমাণ প্রয়োজন। সম্ভাবনাকে প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করা যাবে না।
রোহিঙ্গা ক্যাম্পের নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে স্থানীয় বাংলাদেশি জনগোষ্ঠীর অভিজ্ঞতাও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। উখিয়া ও টেকনাফের অনেক স্থানীয় মানুষ দীর্ঘদিন ধরে রোহিঙ্গা সংকটের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত চাপ বহন করছেন। পাহাড় কাটা, বনভূমির ওপর চাপ, শ্রমবাজারে প্রতিযোগিতা, মাদক ও অপরাধের বিস্তার এবং নিরাপত্তাহীনতা নিয়ে তাদের উদ্বেগ রয়েছে। একইসঙ্গে অনেক স্থানীয় মানুষ মানবিক সহায়তা ও সামাজিক সহযোগিতার ক্ষেত্রেও ভূমিকা রেখেছেন।

মাঠপর্যায়ের সাক্ষাৎকারে এই সংকট বোঝার জন্য অন্তত চারটি পক্ষের অভিজ্ঞতা পাশাপাশি দেখা প্রয়োজন। রোহিঙ্গা পরিবারের সদস্য ও কমিউনিটি প্রতিনিধি, স্থানীয় বাসিন্দা ও জনপ্রতিনিধি, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং মানবিক সহায়তা সংস্থার কর্মী। বিশেষ করে অপহরণের শিকার পরিবার, স্বেচ্ছাসেবক, শিক্ষক, নারী প্রতিনিধি ও তরুণদের অভিজ্ঞতা নিরাপত্তা পরিস্থিতির এমন কিছু দিক তুলে ধরতে পারে, যা কেবল সরকারি পরিসংখ্যানে ধরা পড়ে না।
২০২৫ সালের শেষ প্রান্তিকের পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে টেকনাফের ক্যাম্প ২৪ থেকে নিরাপত্তাহীনতার কারণে প্রায় ২৩৫টি পরিবারের অন্যত্র সরে যাওয়ার তথ্য রয়েছে। অপহরণ, চাঁদাবাজি ও শারীরিক নির্যাতনের আশঙ্কা তাদের স্থানান্তরের অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। একই প্রতিবেদনে ক্যাম্প ২৬-এ সশস্ত্র ব্যক্তিদের টহলের খবরও নথিভুক্ত হয়েছে।
এই তথ্যগুলো দেখায়, নিরাপত্তাহীনতা কেবল আইনশৃঙ্খলার সমস্যা নয়; এটি মানুষের বাসস্থান, জীবিকা, শিক্ষা ও স্বাভাবিক জীবনযাপনের উপর সরাসরি আঘাত। ক্যাম্পের ভেতরে অপরাধী গোষ্ঠীর প্রভাব থাকলে শরণার্থীরা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে অভিযোগ করতেও ভয় পেতে পারেন। ফলে অপরাধের প্রকৃত চিত্র আড়ালে থেকে যায়।

রোহিঙ্গা ক্যাম্পের নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের সংঘাত থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেখার সুযোগ নেই। আরাকান আর্মির উত্থান, মিয়ানমারের সামরিক জান্তার সঙ্গে সংঘর্ষ এবং রাখাইনের বিভিন্ন এলাকায় নিয়ন্ত্রণ পরিবর্তনের ফলে সীমান্তের দুই পাশে নতুন নিরাপত্তা বাস্তবতা তৈরি হয়েছে। ক্যাম্পের কিছু সশস্ত্র গোষ্ঠী এই সংঘাতকে নিজেদের রাজনৈতিক ও সামরিক স্বার্থে ব্যবহার করার চেষ্টা করছে বলে একাধিক পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
এর ফলে বাংলাদেশের সামনে দ্বিমুখী চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। একদিকে সীমান্তের সার্বভৌমত্ব ও অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা রক্ষা করতে হবে, অন্যদিকে রোহিঙ্গাদের জোরপূর্বক মিয়ানমারে ফেরত পাঠানো বা সংঘাতে ঠেলে দেয়ার ঝুঁকি প্রতিরোধ করতে হবে। বাংলাদেশকে এমন কোনো পরিস্থিতি তৈরি করতে দেয়া যাবে না, যেখানে শরণার্থী শিবিরগুলো মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ সংঘাতের সম্প্রসারিত ক্ষেত্র হয়ে ওঠে।

ফলে কিছু বিষয়ে জরুরি পদক্ষেপ নেয়া যেতে পারে: প্রথমত, গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণের সক্ষমতা বাড়াতে হবে। রঙ্গীখালীর ঘটনায় প্রায় ১২০ জনকে জিম্মি করার তথ্য পাওয়া গিয়েছিল। কিন্তু অভিযান শেষে ৫৭ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে। বাকি ব্যক্তিদের অবস্থান, অপহরণকারীদের নেটওয়ার্ক এবং জিম্মি করার উদ্দেশ্য সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত প্রয়োজন। তথ্য পাওয়া এবং দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেয়ার মধ্যে যে ব্যবধান রয়েছে, তা কমাতে হবে।
দ্বিতীয়ত, সেনাবাহিনী, বিজিবি, পুলিশ, এপিবিএন, কোস্ট গার্ড ও গোয়েন্দা সংস্থার মধ্যে সমন্বিত তথ্য বিনিময় নিশ্চিত করতে হবে। পাহাড়ি এলাকা, ক্যাম্পসংলগ্ন অঞ্চল এবং সমুদ্রপথে অপরাধী নেটওয়ার্কের চলাচল পর্যবেক্ষণে যৌথ পরিকল্পনা দরকার। তবে অভিযান পরিচালনার পাশাপাশি গ্রেপ্তার, তদন্ত, বিচার এবং অপরাধের অর্থনৈতিক উৎস বন্ধ করার উপর গুরুত্ব দিতে হবে।

তৃতীয়ত, ক্যাম্পের ভেতরে কমিউনিটিভিত্তিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। বিশ্বস্ত রোহিঙ্গা প্রতিনিধি, নারী সংগঠক, শিক্ষক, ধর্মীয় নেতা ও যুব প্রতিনিধিদের সম্পৃক্ত করে নিরাপদ অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থা করা যেতে পারে। তথ্যদাতাদের পরিচয় গোপন রাখা এবং তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি। কমিউনিটি অংশগ্রহণ যেন কোনো গোষ্ঠীর আধিপত্য বা জোরপূর্বক নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ার না হয়, সেদিকেও নজর রাখতে হবে।
চতুর্থত, তরুণদের জন্য শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন ও নিরাপদ জীবিকার সুযোগ বাড়াতে হবে। দীর্ঘদিনের অনিশ্চয়তা, কর্মসংস্থানের অভাব এবং ভবিষ্যৎ সম্পর্কে হতাশা অপরাধী ও সশস্ত্র গোষ্ঠীর নিয়োগের সুযোগ তৈরি করে। মানবিক সহায়তার পাশাপাশি শিক্ষার ধারাবাহিকতা, কারিগরি প্রশিক্ষণ এবং সুরক্ষিত কর্মসংস্থানের পথ তৈরি করা প্রয়োজন।
পঞ্চমত, মানব পাচার প্রতিরোধে বাংলাদেশকে আঞ্চলিক সহযোগিতা বাড়াতে হবে। মিয়ানমার, আন্তর্জাতিক সংস্থা এবং সংশ্লিষ্ট আঞ্চলিক রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে তথ্য বিনিময়, পাচারকারী নেটওয়ার্ক শনাক্তকরণ এবং সমুদ্রপথে উদ্ধার কার্যক্রম জোরদার করতে হবে। একইসঙ্গে পাচারের শিকার ব্যক্তিদের অপরাধী হিসেবে বিবেচনা না করে ভুক্তভোগী হিসেবে সুরক্ষা ও পুনর্বাসন নিশ্চিত করতে হবে।
সৈনিক তিতাস শেখের মৃত্যু আমাদের মনে করিয়ে দেয়, সীমান্তবর্তী নিরাপত্তা সংকট কতোটা বাস্তব ও বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে। তার আত্মত্যাগের প্রতি যথাযথ শ্রদ্ধা জানাতে হলে শুধু শোক প্রকাশ যথেষ্ট নয়; যে অপরাধী নেটওয়ার্কের বিরুদ্ধে অভিযান চালাতে গিয়ে তিনি প্রাণ হারিয়েছেন, তার শিকড় অনুসন্ধান করে নির্মূল করার সক্ষমতা গড়ে তুলতে হবে।

একইসঙ্গে মনে রাখতে হবে, রোহিঙ্গা শরণার্থীরা বাংলাদেশের নিরাপত্তা সমস্যার একমাত্র কারণ নন। তারা নিজেরাও সশস্ত্র গোষ্ঠী, মানব পাচারকারী ও অপরাধী নেটওয়ার্কের শিকার। তাই নিরাপত্তা নিশ্চিত করার নামে তাদের মানবিক অধিকার সংকুচিত করা হলে সংকট আরও গভীর হবে। আবার মানবিকতার যুক্তিতে অপরাধী নেটওয়ার্কের তৎপরতা উপেক্ষা করলেও রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ও শরণার্থীদের সুরক্ষা দুটিই বিপন্ন হবে।
বাংলাদেশের প্রয়োজন এমন একটি সমন্বিত নীতি, যেখানে মানবিক সুরক্ষা, আইন প্রয়োগ, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, স্থানীয় জনগোষ্ঠীর স্বার্থ এবং আঞ্চলিক কূটনীতি একই কাঠামোর অংশ হবে। রোহিঙ্গা ক্যাম্পকে অপরাধী গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণমুক্ত নিরাপদ আশ্রয়ে পরিণত করতে হবে। নিরাপদ আশ্রয় যেন নিরাপত্তাহীনতার উৎস না হয়-এ দায়িত্ব রাষ্ট্রের, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের এবং সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের।
তিতাস শেখের মৃত্যু যেমন মানবিক বেদনার, তেমনি আমাদের নিরাপত্তা ব্যবস্থার সামনে একটি কঠিন সতর্কবার্তাস্বরূপ, যা থেকে শিক্ষা নিয়ে ভবিষ্যতের জন্য যথাযথ কর্মপন্থা গ্রহণ করা অত্যাবশ্যক।

লেখক: প্রফেসর ও চেয়ারম্যান, রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় এবং নির্বাহী পরিচালক, চট্টগ্রাম সেন্টার ফর রিজিওনাল স্টাডিজ বাংলাদেশ (সিসিআরএসবিডি)।