তাশরীফের সনদে নয়, কর্মেই প্রমাণিত হোক আমির হামজার চরিত্র

তাশরীফের সনদে নয়, কর্মেই প্রমাণিত হোক আমির হামজার চরিত্র

ফন্ট সাইজ:

মানুষের চরিত্র কি অন্যের দেয়া প্রশংসাপত্রে নির্ধারিত হয়, নাকি তাঁর কথা, কাজ ও আচরণে? প্রশ্নটি পুরোনো হলেও বাংলাদেশের ধর্মীয় ও রাজনৈতিক অঙ্গনে বারবার নতুন করে সামনে আসে। বিশেষ করে কোনো ধর্মীয় বক্তা কিংবা রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকে ঘিরে বিতর্ক তৈরি হলে তাঁর অনুসারীরা প্রশংসায় মুখর হন, সমালোচকেরা অভিযোগের ঝাঁপি খুলে বসেন। মাঝখানে হারিয়ে যায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সত্য, প্রমাণ ও ন্যায়বিচার।

সাম্প্রতিক সময়ে কুষ্টিয়া-৩ আসনের জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য মুফতি আমির হামজাকে নিয়ে ইসলামি বক্তা জুবায়ের আহমাদ তাশরীফের একটি ফেসবুক পোস্ট নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। রোববার (৮ নভেম্বর) আমির হামজার সঙ্গে নিজের একটি ছবি প্রকাশ করে তাশরীফ লিখেছেন, তাঁর সঙ্গে দীর্ঘদিন চলাফেরা করার অভিজ্ঞতা রয়েছে। সেই অভিজ্ঞতার আলোকে তিনি আমির হামজাকে অত্যন্ত সরল ও সহজ-সরল মানুষ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। একই সঙ্গে তাঁর বিরুদ্ধে যারা ষড়যন্ত্র করছেন, মহান আল্লাহ যেন তাঁদের সঠিক বুঝ দান করেন, সেই প্রার্থনা করেছেন।

তাশরীফের এই বক্তব্যকে অনেকে আমির হামজার পক্ষে একটি ব্যক্তিগত চরিত্র সনদ হিসেবে দেখছেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো, একজন মানুষের সঙ্গে দীর্ঘদিন চলাফেরা করার অভিজ্ঞতা কি তাঁর সামগ্রিক চরিত্র ও জনজীবনের চূড়ান্ত মূল্যায়নের জন্য যথেষ্ট? নিঃসন্দেহে নয়। ব্যক্তিগত সম্পর্কের জায়গা থেকে একজন মানুষকে ভালো মনে হতেই পারে। কারও সরলতা, আন্তরিকতা কিংবা ব্যক্তিগত ব্যবহারে মুগ্ধ হওয়াও অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা আর জনপরিসরে একজন মানুষের দায়িত্ব পালনের মূল্যায়ন এক বিষয় নয়। বিশেষ করে একজন সংসদ সদস্যের ক্ষেত্রে তাঁর রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, জনস্বার্থে ভূমিকা, বক্তব্য, আচরণ এবং জবাবদিহি সবকিছুই মূল্যায়নের আওতায় আসবে।

এখানে তাশরীফের বক্তব্যের আরেকটি দিকও বিবেচনার দাবি রাখে। তিনি আমির হামজার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের কথা বলেছেন। কিন্তু ষড়যন্ত্রের অভিযোগ আর রাজনৈতিক সমালোচনা এক নয়। কারা ষড়যন্ত্র করছেন, কী ধরনের ষড়যন্ত্র হচ্ছে এবং এর পেছনে কী প্রমাণ রয়েছে—এসব প্রশ্নের উত্তর থাকা জরুরি। কাউকে অপছন্দ করা, তাঁর রাজনৈতিক অবস্থানের বিরোধিতা করা কিংবা তাঁর কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করা মাত্রই ষড়যন্ত্রকারী হয়ে যাওয়ার কথা নয়।

একইভাবে আমির হামজার বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ থাকলে সেটিও যাচাই ছাড়া সত্য বলে ধরে নেওয়া যাবে না। অভিযোগের বিচার হবে তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে, ব্যক্তিগত বিদ্বেষ কিংবা রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে নয়।
পবিত্র কোরআন এ বিষয়ে অত্যন্ত স্পষ্ট নির্দেশনা দিয়েছে। মহান আল্লাহ বলেন ‘হে মুমিনগণ! তোমরা ন্যায়বিচারে দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত থাকো এবং আল্লাহর জন্য সাক্ষ্যদাতা হও, যদিও তা তোমাদের নিজেদের বিরুদ্ধে যায়।’ (সুরা আন-নিসা, আয়াত ১৩৫-এর অংশ)। এই আয়াতের শিক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নিজের পছন্দের ব্যক্তি, রাজনৈতিক দলের নেতা কিংবা ধর্মীয়ভাবে শ্রদ্ধাভাজন মানুষের ক্ষেত্রেও ন্যায়বিচারের প্রশ্নে আপস করার সুযোগ নেই। কেউ আমার পছন্দের মানুষ হলেই তাঁর সব কাজ সঠিক হয়ে যায় না। আবার রাজনৈতিকভাবে অপছন্দের হলেই তাঁর ভালো কাজ অস্বীকার করা ন্যায়সংগত নয়।

আমির হামজা একজন সংসদ সদস্য। তাঁর প্রতি মানুষের প্রত্যাশা কেবল ধর্মীয় বক্তা হিসেবে নয়, জনপ্রতিনিধি হিসেবেও। নির্বাচনী এলাকার মানুষের অধিকার রক্ষা, জনস্বার্থে কার্যকর ভূমিকা, সংসদীয় দায়িত্ব পালন, বক্তব্যের সংযম এবং ভিন্নমতের প্রতি শ্রদ্ধা এসবই তাঁর জনজীবনের মূল্যায়নের গুরুত্বপূর্ণ মানদণ্ড। একই মানদণ্ড দেশের অন্য সব জনপ্রতিনিধির ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।

ধর্মীয় পরিচয় কাউকে সমালোচনার ঊর্ধ্বে তুলে দেয় না। বরং একজন আলেম কিংবা ধর্মীয় বক্তার কাছ থেকে মানুষ অধিকতর দায়িত্বশীলতা, সততা ও ন্যায়নিষ্ঠ আচরণ প্রত্যাশা করে। তাঁর ভুল থাকলে তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে সমালোচনা করা যাবে। তবে সেই সমালোচনা যেন অপমান, অপপ্রচার কিংবা ব্যক্তিগত চরিত্রহননে পরিণত না হয়।
আমাদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের একটি বড় সমস্যা হলো, এখানে প্রমাণের চেয়ে প্রচারণা দ্রুত ছড়ায়। কেউ কারও পক্ষে একটি পোস্ট দিলেই সেটি হয়ে ওঠে চূড়ান্ত সত্যের মতো প্রচারিত। আবার কারও বিরুদ্ধে একটি অভিযোগ উঠলেই সেটি যাচাইয়ের আগেই সামাজিক বিচারের রায় ঘোষণা করা হয়। এই সংস্কৃতি ব্যক্তি, সমাজ এবং রাষ্ট্র কোনোটির জন্যই কল্যাণকর নয়।

তাশরীফের বক্তব্য তাঁর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও বিশ্বাসের প্রকাশ। সেটিকে সম্মান করা যায়। কিন্তু সেটিকে আমির হামজার চরিত্রের চূড়ান্ত প্রমাণ কিংবা তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা সব অভিযোগের জবাব হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা যায় না। একইভাবে তাঁর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের দাবি উত্থাপিত হলে তারও তথ্যভিত্তিক ব্যাখ্যা প্রয়োজন।

একজন মানুষের চরিত্র ফেসবুক পোস্টে তৈরি হয় না, প্রশংসাপত্রেও প্রতিষ্ঠিত হয় না। চরিত্রের পরিচয় পাওয়া যায় তাঁর দীর্ঘদিনের কর্মে, দায়িত্ব পালনে, মানুষের সঙ্গে আচরণে এবং ক্ষমতা ও প্রভাব ব্যবহারের ক্ষেত্রে সততায়। সনদ দেওয়া সহজ, কিন্তু চরিত্রের প্রমাণ দিতে হয় কর্মের মাধ্যমে। তাই ব্যক্তির পক্ষে-বিপক্ষে শোরগোল নয়, আমরা দেখতে চাই সত্য, স্বচ্ছতা ও ন্যায়বিচার।

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও কলামিস্ট