ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে রাজধানীর সোহ্রাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে কাতরাচ্ছেন আড়াই বছরের শিশু মাহিন। শয্যা সংকটের কারণে আরও দুই শিশুর সঙ্গে একই বেডে রেখে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। মাহিনের বাবা শরীফুল শিকদার বলেন, আমার ছেলে ডেঙ্গু ও নিউমোনিয়ার উপসর্গ থাকায় সাতদিন ধরে এখানে চিকিৎসাধীন। চিকিৎসক ও নার্সদের সেবায় কোনো সমস্যা নেই। সবসময় নার্সদের পাওয়া যায়। তবে এক শয্যায় দু’-তিনজন শিশুকে রাখায় অনেক সমস্যা হচ্ছে। ওষুধ খাওয়ানো, মায়ের দুধ পান করানো এবং প্রয়োজনীয় খাবার দেওয়াও কঠিন হয়ে পড়ে। তিনটি শিশু ওয়ার্ডে মোট শয্যা ৩০টি। শয্যা না পেয়ে অনেক শিশুকে মেঝেতে বসে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে। আবার একই শয্যায় একাধিক শিশু থাকায় অনেকে মেঝেতে থাকতে বাধ্য হচ্ছেন।
ডেঙ্গু আক্রান্ত আকাশের মা জাহানারা বেগম জানান, তার ১৩ বছর বয়সী ছেলে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে প্রায় এক সপ্তাহ ধরে শহীদ সোহ্রাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পুরুষ ওয়ার্ডে ভর্তি রয়েছে। তাদের বাড়ি মানিকগঞ্জ। স্থানীয় চিকিৎসকের মাধ্যমে পরীক্ষা করানোর পর ডেঙ্গু পজিটিভ শনাক্ত হলে ছেলেকে নিয়ে সোহ্রাওয়ার্দী হাসপাতালে আসেন তারা।
তিনি বলেন, এখানে গত এক সপ্তাহ ধরে ছেলের ভালো চিকিৎসা পাচ্ছি। চিকিৎসক ও নার্সরা নিয়মিত খোঁজখবর নিচ্ছেন। আগের তুলনায় আমার ছেলে অনেক সুস্থ হয়েছে। ওষুধ, খাবার স্যালাইন ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসামগ্রী হাসপাতাল থেকেই দেয়া হচ্ছে। পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্যও খরচ তুলনামূলক কম।
ভোলার বাসিন্দা নিঠুর দে প্রায় এক সপ্তাহ ধরে জ্বর ও পাতলা পায়খানায় ভুগছিলেন। প্রথমে বাড়িতে দুই থেকে তিনদিন চিকিৎসা নেন তিনি। পরে ঢাকায় এসে শহীদ সোহ্রাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হন ৩রা নভেম্বর। এর প্রায় সাতদিন আগে ভোলার একটি বেসরকারি হাসপাতালে ডেঙ্গু পরীক্ষা করালে তার ফল পজিটিভ আসে। হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর তার শারীরিক অবস্থার উন্নতি হয়েছে। বর্তমানে আগের তুলনায় অনেকটাই সুস্থ বোধ করছেন। চিকিৎসকরা নিয়মিত তার শারীরিক অবস্থা পর্যবেক্ষণ করছেন বলে জানান- তিনি। তার পাশে রয়েছেন স্ত্রী ও মেয়ে। পরিবারের সদস্যরা জানান, তিনি তাদের পরিবারের প্রধান উপার্জনকারী। তার অসুস্থতায় পুরো পরিবার উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছে।
৬০ বছর বয়সী কমলা ঠাকুর দু’দিন আগে শহীদ সোহ্রাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। প্রায় এক মাস আগে জ্বর, ঠাণ্ডা ও গলাব্যথা নিয়ে অসুস্থ হন তিনি। পরে শ্বাসকষ্ট দেখা দিলে তাকে অক্সিজেন দিতে হয়। এ সময় নরসিংদীর স্থানীয় এক চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী বাড়িতে চিকিৎসা নেন। ওই চিকিৎসকের মাধ্যমে ডেঙ্গু পরীক্ষায় পজিটিভ ফল আসে। পরে তিনি সোহ্রাওয়ার্দী হাসপাতালে ভর্তি হন। হাসপাতালে ভর্তির পর তার শারীরিক অবস্থার উন্নতি হয়েছে।
এদিকে সোহ্রাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগীর চাপ বাড়ছে। নির্ধারিত শয্যার তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ রোগীকে চিকিৎসা দিতে হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে হাসপাতালের ওয়ার্ডগুলোতে বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে। ৬ই নভেম্বর হাসপাতালটিতে ১৮০ জন ডেঙ্গু রোগী চিকিৎসাধীন ছিলেন। তাদের জন্য নির্ধারিত শয্যা ১৫১টি। অর্থাৎ নির্ধারিত শয্যার চেয়ে ২৯ জন বেশি রোগীকে চিকিৎসা দিতে হচ্ছে। অতিরিক্ত রোগীদের জায়গা করে দিতে গিয়ে চিকিৎসক, নার্স ও রোগীর স্বজনদেরও নানা সমস্যার মুখোমুখি হতে হচ্ছে। বিশেষ করে শিশুদের চিকিৎসা, রোগীদের নিয়মিত পর্যবেক্ষণ এবং শয্যা ব্যবস্থাপনা নিয়ে বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, ৬ই নভেম্বর চিকিৎসাধীন ১৮০ জন রোগীর মধ্যে পুরুষ ছিলেন ৬০ জন, নারী ৫০ জন এবং শিশু ৭০ জন। গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন ভর্তি হয়েছেন ৮ জন। তাদের মধ্যে ৩ জন পুরুষ, নারী ২ জন এবং ৩ শিশু জন । এ সময়ে সুস্থ হয়ে ছাড়পত্র ৫ পেয়েছেন জন।
গত ৩০ই অক্টোবর থেকে ৬ই নভেম্বর পর্যন্ত হাসপাতালে নতুন ভর্তি হয়েছেন প্রায় ১০০ জন। এ সময়ে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন ৬০ জনের বেশি।
হাসপাতালের শিশু বিভাগেও ডেঙ্গু রোগীর চাপের চিত্র উদ্বেগজনক ছিল। হাসপাতালের তিনটি শিশু ইউনিটে নির্ধারিত ৩০টি শয্যার বিপরীতে ৭০ জন শিশুকে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছিল। এর আগের দিন রোগীর সংখ্যা ছিল ৬৭ এবং তার আগের দিন ৬০। জায়গার সংকটে কোনো কোনো শয্যায় দুই থেকে তিনজন শিশুকে একসঙ্গে থাকতে হচ্ছে। এতে শিশুদের চিকিৎসা ও পর্যবেক্ষণের পাশাপাশি স্বজনদের অবস্থান নিয়েও সমস্যা তৈরি হয়।
নার্সদের দেয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০ শয্যার একটি ওয়ার্ডে কখনো ৪০ থেকে ৫০ জন পর্যন্ত রোগী রাখতে হয়। ওয়ার্ডের জন্য ১২ জন নার্স দায়িত্ব পালন করলেও রোগীর সংখ্যা অনেক বেড়ে গেলে তাদের পক্ষে সব কাজ সামলানো কঠিন হয়ে পড়ে। বিশেষ করে বিকাল ও রাতের পালায় চাপ বাড়ে। কোনো কোনো সময়ে ৩০ শয্যার শিশু ডেঙ্গু ওয়ার্ডে ৯০ জনের বেশি রোগীও চিকিৎসাধীন ছিলেন।
হাসপাতালের ডেঙ্গু ওয়ার্ডের ফোকাল পারসন ও শিশু বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. ফারজানা আফরোজ জানান, ক’দিন ধরে শিশু রোগী ভর্তির সংখ্যা ছাড়পত্র পাওয়া রোগীর তুলনায় বেশি ছিল। নির্ধারিত শয্যার দেড় থেকে দুইগুণ রোগী থাকায় চিকিৎসক, নার্স, রোগী ও স্বজনদের জন্য কঠিন পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে। শিশু বিভাগে হামের রোগী থাকায় চিকিৎসক ও নার্সদের ওপর বাড়তি চাপও রয়েছে।
শিশুদের ক্ষেত্রে সতর্কতার বিষয়ে ডা. ফারজানা বলেন, অতিরিক্ত বমি, তীব্র পেটব্যথা, খেতে না পারা, পাতলা পায়খানা বা শরীরের কোথাও রক্তপাতের মতো বিপদচিহ্ন দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে নেয়া জরুরি। তবে শিশু স্বাভাবিকভাবে খেতে ও পান করতে পারলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী বাড়িতেও পর্যবেক্ষণে রাখা সম্ভব।
