৪ বছরের শিশু রায়হান শেখ। ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে তিনদিন ধরে মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি। প্লাটিলেট পরীক্ষার জন্য এক হাতে শিশুসন্তান অন্য হাতে স্যালাইনের স্ট্যান্ড নিয়ে ৮ম তলার লিফটের সামনে দাঁড়িয়ে ছিলেন তার মা। বৃহস্পতিবার ৩৬ হাজার থাকলেও, শুক্রবার রায়হানের প্লাটিলেট নেমে আসে ৩৪ হাজারে। সন্তানের প্লাটিলেট নেমে যাওয়ায় উদ্বিগ্ন রায়হানের মা। একই সঙ্গে হাসপাতালের পরীক্ষার সিস্টেম নিয়ে অসন্তুষ্ট তিনি। রায়হান শেখের মা বলেন, ‘নার্সরে বলছিলাম রক্ত টাইনা নিতে। তারা বলে একজনের রক্তটা আইনা নিলে নাকি বাকি সবার রক্তও টাইনা নেয়া লাগবো। এজন্য রায়হানরে নিয়া আমারেই নিচে যাইতে বলছে। এখানে আমি ছাড়া কেউ নাই। ওর বাপ কাজে গেছে। এক হাতে ওরে (রায়হান) আরেক হাতে এইডা (স্যালাইন স্ট্যান্ড) নিয়ে যাওয়া যায় না। একটা চেয়ারও (হুইলচেয়ার) নাই যে, ওরে বসাইয়া নিয়া যামু।’
এদিকে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে দু’দিন ধরে মুগদা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি ৮ বছর বয়সী আহনাফ মুত্তাকী। ২৭ হাজার নেমেছে তার প্লাটিলেট। রক্ত জমা দিতে রায়হান শেখের মতো কোলে-কাঁখে করেই নিচতলায় নিয়ে যান আহনাফ মুত্তাকীর মা।
আহনাফ মুত্তাকীর মা জানান, ‘বেশি অর্থ-বিত্ত থাকলে তো আমরা বেসরকারি হাসপাতালে যাইতাম। এখানে আসলাম কম টাকার মধ্যে চিকিৎসা করাইতে। আমি দুইজন নার্সরে বলছিলাম আমার ছেলের রক্ত টাইনা দিতে। কিন্তু কেউ আসে নাই।
তিনদিন আগে ৭ বছর বয়সী সানাউল হাসান তাওহীদকে নিয়ে হাসপাতালে এসেছেন রাজধানীর মেরাদিয়ার মধুপাড়া এলাকার বাসিন্দা তানিয়া। মুগদা হাসপাতালে আসার আগের দু’দিন তাওহীদকে নিয়ে রাজধানীর অন্য একটি বেসরকারি হাসপাতালে ছিলেন তিনি। বেসরকারি হাসপাতালের চিকিৎসা ব্যয় মেটাতে না পেরে এখানে আসেন।
তাওহীদের মা তানিয়া বলেন, ‘গতকাল সকালে রাউন্ডের পর আজকে এখন (শুক্রবার বিকাল ৪টা) পর্যন্ত নিজে থেকে কোনো ডাক্তার আসে নাই। ডাকতে গেলে বলে আসতেছি। অনেকক্ষণ পরে আবার ডাকতে গেলে তারা আসে। এদিকে বাচ্চার কান্না থামান যায় না। আরেকটু আগে আসলেই কিন্তু বাচ্চাগুলার কষ্ট কম হয়।’
রক্তের পরীক্ষার জন্য বাইরে থেকে সিরিঞ্জ কিনে আনার কথা জানিয়েছেন ১১ বছর বয়সী ইয়াসিন আরাফাতের মা মার্জিয়া সুলতানা। ৬ দিন আগে ভর্তি হওয়ার পর সন্তানের রক্ত পরীক্ষার জন্য আলাদা সিরিঞ্জ কিনতে হয়েছে বলে জানান তিনি।
মুগদা জেনারেল হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডে শয্যা সংখ্যা ৬৭টি। কিন্তু এই ওয়ার্ডে চিকিৎসা নিচ্ছে ১৪১ জন শিশু। সংখ্যা নির্দিষ্ট উল্লেখ না করলেও চিকিৎসাধীন প্রায় অর্ধেক শিশুই ডেঙ্গু আক্রান্ত বলে জানিয়েছেন শিশু ওয়ার্ডে কর্তব্যরত এক নার্স।
যাত্রাবাড়ী এলাকায় থেকে সেলাইয়ের কাজ করেন ১৯ বছর বয়সী কিশোর মোহাম্মদ মোবারক। ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে তার প্লাটিলেট নেমেছে ১৫ হাজারে। মেঝেতে শুয়ে আছেন মোবারক। তার ঠিক পাশেই দেখা যাচ্ছে পুরুষ ওয়ার্ডের টয়লেটে যাওয়ার করিডোরটি।
মেঝেতে মোবারকের পাশের বিছানায় আছেন কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জ থানার সাকিব হাসান। ডেঙ্গুতে আক্রান্ত ২৩ বছর বয়সী এই ব্যক্তিও। ১১ দিন ধরে চিকিৎসা নিচ্ছেন মুগদা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে। শয্যা বিতরণ ব্যবস্থা নিয়ে অভিযোগ আছে তার। মোবারক বলেন, ’১১ দিন ধইরা এখানে চিকিৎসা নিতাছি, কিন্তু আমি সিট পাই নাই। কিন্তু আমার পরে আইসা একজন সিট পাইছে। যে পরে আইসা সিট পাইছে তার অবস্থা আমার চেয়ে ভালো আছিল।’
মুগদা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের পুরুষ ওয়ার্ডে শয্যা সংখ্যা রয়েছে ৫৫টি। তবে নিয়মিত শতাধিক রোগীকে চিকিৎসা দেয়া হয় বলে জানিয়েছেন হাসপাতালটিতে কর্তব্যরত একজন নার্স। একই চিত্র মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নারী ওয়ার্ডেও। একসঙ্গে ৫০ জনকে চিকিৎসা দেয়ার সুযোগ থাকলেও হাসপাতালটির এই ওয়ার্ডে প্রতিদিন চিকিৎসা নিচ্ছেন শতাধিক নারী।
