রাজধানীতে ককটেল বিস্ফোরণ, বাসে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটায় নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এক রাতেই ঢাকার অন্তত আটটি স্থানে ককটেল বিস্ফোরণ করেছে দুর্বৃত্তরা। শুক্রবার সন্ধ্যা থেকে গভীর রাত পর্যন্ত আদাবর, শাহবাগ, বিমানবন্দর, খিলগাঁও ও মিরপুরের কালশী এলাকায় এসব বিস্ফোরণ ঘটে। এ ছাড়া প্রগতি সরণির কোকাকোলা ক্রসিং এলাকায় বৈশাখী পরিবহনের একটি বাসে আগুন দেয়ার ঘটনা ঘটে। যদিও এসব ঘটনায় কেউ হতাহত হয়নি। এর বাইরে পুলিশের ওপর হামলার ঘটনাও ঘটেছে। এসব ঘটনার পর নড়েচড়ে বসেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। তবে এসব ঘটনার সঙ্গে জড়িত কাউকে চিহ্নিত ও গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, এসব ঘটনার মধ্যে দিয়ে নাশকতার আলামত পাওয়া যাচ্ছে। দুর্বৃত্তরা এসব ছোট ছোট ঘটনা দিয়ে তাদের অবস্থান জানান দেয়ার চেষ্টা করছে।
পুলিশের সূত্রগুলো বলছে, দেশের সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ, ককটেল বিস্ফোরণ, অগ্নিসংযোগের মতো ঘটনা ও পুলিশের ওপর যাতে দুর্বৃত্তরা কোনো ধরনের হামলা করতে না পারে সেজন্য সারা দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের সতর্ক করা হয়েছে।
গোয়েন্দা সূত্রগুলো বলছে, ডিসেম্বরে পলাতক শেখ হাসিনা ফিরবেন- এমন আলোচনা আছে দলটির নেতাকর্মীদের মাঝে। এমন আলোচনা সামনে রেখে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা দেশকে অস্থিতিশীল করার পাঁয়তারা করছে। তারা মাঝে-মধ্যে ককটেল বিস্ফোরণ ও বাসে অগ্নিসংযোগ করে নিজেদের অবস্থান জানান দিচ্ছে। সর্বশেষ পোশাক শ্রমিকদের আন্দোলনে ছদ্মবেশে ঢুকে তারা নাশকতা করেছে। সরকার যখন শ্রমিকদের দাবি সমঝোতার মাধ্যমে পূরণের নানা উদ্যোগ গ্রহণ করেছে তখন তারা কর্মবিরতি দিয়ে সড়ক অবরোধ করে নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড চালিয়েছে। যারা ছদ্মবেশে নাশকতা চালাচ্ছিল তাদের অনেককে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তবে পুলিশের শক্তিশালী অবস্থানের কারণে সুবিধা করতে না পারায় নিষিদ্ধ দলটি ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা কিছুটা পিছু হটে। তারা কৌশল পাল্টে পরিস্থিতি উত্তপ্ত করার জন্য ককটেল ও অগ্নি-সন্ত্রাসের মতো ঘটনা ঘটাচ্ছে।
একাধিক সূত্র জানিয়েছে, শ্রমিকদের আন্দোলনে পুলিশ আক্রান্ত, ককটেল বিস্ফোরণের পর নতুন করে সতর্ক থাকার নির্দেশ দিয়েছে পুলিশ সদরদপ্তর। সেইসঙ্গে নাশকতায় অর্থদাতা, ইন্ধনদাতা ও উসকানিদাতাদের তালিকা করা হয়েছে। আরও নতুন কোনো ইস্যুকে সামনে রেখে নাশকতাকারীরা যাতে তৎপর হতে না পারে সেজন্য প্রকৃত দোষীদের আইনের আওতায় আনতে সংশ্লিষ্ট ইউনিটগুলোকে কড়া বার্তা দেয়া হয়েছে। ইতিমধ্যে পুলিশ, ডিবি, এসআরবিসহ বিভিন্ন ইউনিট নাশকতায় সংশ্লিষ্ট নিষিদ্ধ দলের নেতা-কর্মীদের গ্রেপ্তারে অভিযান জোরদার করেছে। শিল্পাঞ্চল ছাড়া অন্য কোথাও নতুন করে কেউ তৎপর হচ্ছে কি না তা গোয়েন্দা নজরদারির মাধ্যমে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এর আগে চলতি বছরের আগস্টে নাশকতার আশঙ্কায় সারা দেশে পুলিশকে সতর্ক থাকতে বলা হয়। এমনকি দু’-একটি রেঞ্জ ও মেট্রোপলিটন পুলিশও অধীনস্ত সদস্যদের উদ্দেশ্যে বিশেষ সতর্কবার্তা দেয়। যা তখন ব্যাপকভাবে আলোচনায় আসে। আগস্টে কিছু ঝটিকা মিছিল ও ককটেল হামলা করা হলেও সেপ্টেম্বরে সেটি চরম আকার নেয়। রাজধানী জুড়ে ককটেল হামলা ও বাসে অগ্নিসংযোগ শুরু হয়। যাত্রাবাড়ী থানার সামনে পরপর ৫টি ককটেল বিস্ফোরণ ও কাফরুল থানার সামনে বাসে আগুন দিয়ে পুলিশের মধ্যে ভীতি ছড়ানোর চেষ্টা করা হয়।
পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, শুক্রবার সন্ধ্যা ৭টা ৫৫ মিনিটের দিকে খিলগাঁওয়ে আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর সদর দপ্তরের ভেতরে একটি ককটেল বিস্ফোরণ ঘটে। খিলগাঁও থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাইফুল ইসলাম বলেন, আশপাশের কোনো বাসার ছাদ অথবা নিচের কোনো স্থান থেকে ককটেলটি নিক্ষেপ করা হয়ে থাকতে পারে। রাত ৯টা ৫ মিনিটের দিকে আদাবর থানার সামনে দু’টি ককটেল বিস্ফোরণ ঘটায় মোটরসাইকেলে আসা অজ্ঞাতপরিচয় দুর্বৃত্তরা। বিস্ফোরণের পর তারা দ্রুত ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যায়। এরপর রাত ১০টা ২০ মিনিটের দিকে শাহবাগ থানাধীন আইবি গেটের সামনে পুলিশের ডিউটি গাড়ি লক্ষ্য করে একটি ককটেল নিক্ষেপ করা হয়।
মোটরসাইকেলে করে যাওয়ার সময় দুর্বৃত্তরা ককটেলটি নিক্ষেপ করে পালিয়ে যায়। এর কিছুক্ষণ পর রাত ১২টা ১ মিনিটের দিকে শাহবাগের জুলাই চত্বরের পাশেও আরেকটি ককটেল বিস্ফোরিত হয়। রাত পৌনে ১২টার দিকে রাজধানীর বিমানবন্দরের গোলচত্বরে পরপর দু’টি ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। বিমানবন্দর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কামরুল হাসান তালুকদার বলেন, উড়ালসড়ক থেকে কে বা কারা দু’টি ককটেল নিক্ষেপ করে বিস্ফোরণ ঘটিয়ে পালিয়ে যায়। এ ছাড়া রাতে মিরপুরের কালশী মোড়ে নম্বরপ্লেটবিহীন একটি মোটরসাইকেলে এসে একটি ককটেল বিস্ফোরণ ঘটিয়ে পালিয়ে যায় দুর্বৃত্তরা। এ ঘটনার একটি ভিডিওতেও মোটরসাইকেলে আসা ব্যক্তিদের বিস্ফোরণ ঘটিয়ে দ্রুত চলে যেতে দেখা যায়। অন্যদিকে, প্রগতি সরণির কোকাকোলা ক্রসিং এলাকায় বৈশাখী পরিবহনের একটি বাসে আগুন দেয়ার ঘটনা ঘটেছে। শুক্রবার সন্ধ্যায় এ ঘটনা ঘটে।
বাসটি সাভার-নতুন বাজার রুটে চলাচল করতো। নতুন বাজারে যাত্রী নামানোর কিছু সময় পর দুর্বৃত্তরা বাসটিতে আগুন দেয়। তবে কারা এ ঘটনা ঘটিয়েছে, সে বিষয়ে এখনো কিছু জানাতে পারেননি পরিবহন কোম্পানির কর্মকর্তারা। যেসব এলাকায় ঘটনা ঘটেছে সেসব এলাকার দায়িত্বপ্রাপ্ত পুলিশ ও গোয়েন্দা কর্মকর্তারা বলেছেন, ঘটনার পরপরই ঘটনাস্থল পরিদর্শন করা হয়েছে। হতাহতের ঘটনা না ঘটলেও এসব ঘটনাকে গুরুত্বের সঙ্গে আমলে নিয়ে তদন্ত শুরু হয়েছে। এসব বিস্ফোরণের পেছনে কে বা কারা জড়িত সেটি খুঁজতে ঘটনাস্থলের আশপাশে সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করে বিশ্লেষণ করা হচ্ছে।
