বিমান বাহিনীর সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট তাহসিফ সাউরির মৃত্যুর ঘটনায় করা হত্যা মামলায় তিন দফা রিমান্ড শেষে জুনিয়র বন্ধু শাহরিয়ার দীপকে কারাগারে পাঠিয়েছে আদালত। গতকাল ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মো. মনিরুল ইসলাম তার জামিন আবেদন নামঞ্জুর করে এ আদেশ দেন। এর আগে এই মামলায় আটক হওয়া অন্যতম আসামি নিহত তাহসিফের বান্ধবী জেরিকা তাসনিম দিশাকেও রিমান্ড শেষে কারাগারে পাঠায় আদালত। সন্ধিগ্ন প্রধান দুই আসামির কয়েক দফা রিমান্ড শেষ হলেও আজ পর্যন্ত এই হত্যা মামলার রহস্য উন্মোচন করতে পারেনি পুলিশ। এমনকি মৃত্যুর আগে ঠিক কী হয়েছিল তাহসিফের সঙ্গে তা নিয়েও ধোঁয়াশায় রয়েছেন তদন্তকারী কর্মকর্তারা।
গত ২৭শে অক্টোবর তাহসিফ নিখোঁজের আগের বিভিন্ন সিসিটিভি ফুঁটেজ পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ওইদিন রাত ১২টা ৩৯ মিনিটের দিকে নিজের মোটরসাইকেল চালিয়ে টঙ্গীর মাজার বস্তিতে প্রবেশ করছেন তাহসিফ। এরপর মেইন রাস্তার পাশে তাহসিফ ও দীপ দু’জনে তাদের মোটরসাইকেল পার্ক করে উল্টো পাশের দোকানের মাঝের গলি দিয়ে ১২টা ৪০ মিনিটের দিকে মাজারের রোডের দিকে প্রবেশ করছেন। তখন গলির মুখেই তাদেরকে মাঠের দিকে যেতে বাধা দেন তিন মহিলা। সেই বাধা অতিক্রম করে দীপকে সঙ্গে নিয়ে অন্ধকারের মধ্যদিয়েই সামনের দিকে এগিয়ে যান তাহসিফ। ওই সময়ে সেখানে এক নারীর সঙ্গে বেশ বাকবিতণ্ডা হয় তাহসিফের।
এরপর গলিপথ ধরে মাজারের সামনের রাস্তায় ওঠে তুরাগ তীরের মাঠের দিকে যেতে থাকেন তাহসিফ। আর তার পেছন পেছন মোবাইলের টর্চ জ্বালিয়ে যাচ্ছিলেন দীপ। রাত ১২টা ৫২ মিনিটের সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, মাজারের সামনে হয়ে মাঠে প্রবেশের আগে তাহসিফ ও দীপের সঙ্গে আরও অন্তত ৫/৬ জন যুবক রয়েছে। তারা সকলেই তাহসিফের সঙ্গে মাদক স্পটের ওই মাঠের দিকে যাচ্ছিলেন। এরপর রাত ১টা ৫ মিনিটে বস্তির আরেকটি ক্যামেরায় দেখা যায়, ৮ সদস্যের পুলিশের একটি দল ওই মাঠে প্রবেশ করছে। এরপর রাত ১টা ১৯ মিনিটের সেই একই সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, পুলিশ সদস্যরা মাঠের দিক থেকে বেরিয়ে চলে আসছেন। আর তাদের বের হওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই ওই একইসময়ে বস্তির আরেক পাশে দেখা যায় দীপও মাঠ থেকে হেলমেট হাতে একা বের হয়ে আসছেন। বিভিন্ন গলি ঘুরে রাত ১টা ২১ মিটের দিকে বাস্তির আরেক গলি দিয়ে নিজের মোটরসাইকেলের দিকে যাচ্ছেন দীপ। এরপর রাত ১টা ৫২ মিনিটের দিকে নিজের মোটরসাইকেল নিয়ে বস্তি থেকে মোহাম্মদপুর বাসার উদ্দেশ্যে বস্তি ছেড়ে চলে যান দীপ। তবে ২১ থেকে ৫২ মিনিট এই ৩১ মিনিট দীপ কোথায় ছিলেন সে সম্পর্কে এখনো কোনো সুদত্তর দিতে পারেননি দীপ। রিমান্ডে তার ভাষ্য, তিনি ওই সময়ে রাস্তা হারিয়ে ফেলেছিলেন।
রিমান্ডে দেয়া দীপের দেয়া ভাষ্য ও সিসিটিভি ফুটেজ অনুযায়ী পুলিশের ধাওয়া খেয়ে তাহসিফ নদীর দিকে দৌড় দেয়। এরপর দীপ ১টা ১৯ মিনিটে মাঠ থেকে বের হয়ে আসেন। দীপের ভাষ্য অনুযায়ী যদি তাহসিফ পুলিশ দেখে নদীতে ঝাঁপও দেন তাহলে পুলিশ ও দীপ মাঠ থেকে বেরিয়ে আসার ১৬ মিনিট পর নিহত তাহসিফ কীভাবে তার মাকে ভয়েজ মেসেজ পাঠিয়ে বলেন, ‘মা আসছি, রওনা হয়েছি’। এই ১৬ মিনিটের রহস্য এখনো উদ্ঘাটন করা সম্ভব করা হয়নি।
মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা গাজীপুরের টঙ্গী নৌ-পুলিশ ফাঁড়ির পরিদর্শক ফিরোজ উদ্দিন বলেন, আসামি দীপ মামলার ঘটনা সম্পর্কে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছেন। যা তদন্তের স্বার্থে গোপন রেখে যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। তিনি বলেন, রিমান্ডে থাকাকালীন দীপ অত্যন্ত চতুরতার সঙ্গে আমাদের একাধিক প্রশ্নের জবাব কৌশলে এড়িয়ে গেছেন।
অনেক প্রশ্নের সময়ে চুপও ছিলেন। এই জন্য আমরা তাকে তিন দফায় ১০ দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করেছি। তিনি বলেন, এই তাহসিফ হত্যা মামলার ঘটনাটি স্পর্শকাতর ও চাঞ্চল্যকর। তাহসিফ সাউরি ঘটনার আগে দীপ ও দিশার সঙ্গ ঘোরাফেরাসহ বিভিন্ন রেস্তরাঁয় খাবার খেয়েছেন। সিসিটিভি ভিডিও ও মোবাইল ফোন থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী সাউরিকে মৃত্যুর আগে শেষবারের মতো দিশা ও দীপের সঙ্গে দেখা হয়েছে। এ অবস্থায় আসামিরা কোনো না কোনোভাবে মামলার ঘটনার সঙ্গে জড়িত রয়েছে মর্মে তথ্য প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে। তাই মামলার সুষ্ঠু তদন্ত ও ন্যায়বিচারের স্বার্থে দীপকে মামলার তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত কারাগারে আটক রাখা প্রয়োজন। আমরা আদালতের কাছে সেই আবেদনই করেছিলাম। মামলার মূল রহস্য উদ্ঘাটনসহ জড়িতদের গ্রেপ্তারে দীপকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পুনরায় রিমান্ডের প্রয়োজন হতে পারে বলেও জানিয়েছেন নৌ-পুলিশের এই কর্মকর্তা।
এদিকে দুই দফা রিমান্ড শেষে তাহসিফ সাউরির মৃত্যুর ঘটনায় করা হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার জেরিকা তাসনিম দিশাকে রিমান্ড শেষে শুক্রবার কারাগারে পাঠিয়েছে আদালত। রিমান্ডে দিশা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছেন বলে আদালতের কাছে দাবি করেছে তদন্ত সংস্থা।
প্রসিকিউশন বিভাগের এসআই সাইফুল ইসলাম বলেন, দিশাকে কারাগারে আটক রাখার আবেদনে বলা হয়েছে, মামলার ঘটনার মূল রহস্য উদ্ঘাটনের জন্য দিশাকে ব্যাপকভাবে বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। সেখানে দিশা বলেছেন, তাহসিফের সঙ্গে ঘটনার আগে ২৭শে অক্টোবর রাতে উত্তরার ‘নেস্ট বার অ্যান্ড রেস্টুরেন্টে’ যান তিনি। এর আগে সন্ধ্যায়ও তারা অনেকক্ষণ একসঙ্গে ঘোরাঘুরি করে নেস্ট বার অ্যান্ড রেস্টুরেন্টে যান। বিভিন্ন জায়গায় তাহসিফের সঙ্গে বাইকে ঘোরাঘুরি করেন বলেও দিশা বলেছেন। এ ছাড়াও তদন্তে সন্দিগ্ধ আসামি দিশা মামলার ঘটনা সম্পর্কে বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছেন, যা তদন্তের স্বার্থে গোপন রেখে যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। একইসঙ্গে আবেদনে বলা হয়েছে, আসামি অত্যন্ত চতুর প্রকৃতির হওয়ায় একাধিক প্রশ্নের জবাব কৌশলে এড়িয়ে যায়। তদন্তে পুলিশ হেফাজতে রিমান্ডে থাকা সন্দিগ্ধ আরেক আসামি আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দীপের (তাহসিফের বন্ধুস্থানীয়) বক্তব্যের সঙ্গে দিশার বক্তব্য ক্রস চেক করা হয়। এ ছাড়া তাহসিফের মোবাইল ফোনের কললিস্ট পর্যালোচনায় দিশার সঙ্গে একাধিকবার কথা বলার প্রমাণ পাওয়া যায়। প্রাথমিক তদন্তে মামলার ঘটনার সঙ্গে দিশার জড়িত থাকার তথ্য প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে। তার বিরুদ্ধে তদন্ত অব্যাহত। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাকে কারাগারে আটক রাখা একান্ত প্রয়োজন। আবেদনে দাবি করা হয়, দিশা জামিনে মুক্তি পেলে পলাতক হয়ে মামলার তদন্তে ব্যাঘাত ঘটাতে পারে।
