কোনো কিছুর শুরু মানে তার শেষ অবধারিত। নশ্বর পৃথিবীতে কোনো কিছুই চিরস্থায়ী নয়। তবুও কিছু ‘শেষ’ বুকের ভেতর কোথাও একটা শূন্যতা তৈরি করে। যে মানুষটাকে নিজের বলে ভাবলেন, যার সঙ্গে আনন্দে চিৎকার করে উঠলেন, যার গোলের অপেক্ষায় রাত জাগলেন, একদিন সে জানিয়ে দিলো- আর নয়। এবার অন্য কেউ আসবে। অন্য কেউ জড়াবে সেই জার্সি। অন্য কেউ ছুটবে সেই মাঠে। ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোও তেমনই শেষের নাম। পর্তুগালের জার্সিতে সিআরসেভেনের ২৩ বছরের পথচলা শেষ হলো। ২৩৪ ম্যাচ, ১৪৬ গোল, ইউরো ও দুই নেশনস লীগের শিরোপা- পরিসংখ্যানের বাইরে তার বিদায় যেন এক বন্ধুর চলে যাওয়া। কিন্তু বন্ধুরা কি কখনো সত্যিই বিদায় নেয়? ২০০৩ সালের আগস্টে শুরু হয় এই যাত্রা। তখন রোনালদো কেবল এক তরুণ, চোখে স্বপ্ন আর পায়ে ফুটবল। সেই ছেলেটি আজ ৪১ বছরের মানুষ। মাঝে পাঁচটি বিশ্বকাপ, ছয়টি ইউরো, অসংখ্য জয়-পরাজয়। আর আছে নিজ দেশের সঙ্গে তার অবিচ্ছেদ্য হয়ে ওঠার গল্প। রোনালদো নিজেই বলেছেন, জাতীয় দলের কথা ভাবলে তার চোখে শুধু ম্যাচ, গোল, রেকর্ড কিংবা ট্রফি ভেসে ওঠে না। ভেসে ওঠে মানুষ।
বিদেশে থাকা সেই পর্তুগিজরা, যারা ৯০ মিনিটের জন্য অনুভব করতেন, বাড়ির একটু কাছে আছেন। সেই লাখো মানুষ, যাদের সঙ্গে কখনো দেখা হয়নি, অথচ যারা তার জীবনের অংশ হয়ে উঠেছেন। ‘ফুটবল মানুষের জন্য,’ বলেছেন রোনালদো। ‘ফুটবল একটা খেলার চেয়েও অনেক বড়।’ এই কথাটুকুই যেন তার বিদায়ের সবচেয়ে বড় ব্যাখ্যা। রোনালদোর আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারকে শুধু সংখ্যায় মাপা যায় না। যদিও সংখ্যাগুলোই অবিশ্বাস্য। আন্তর্জাতিক ফুটবলে সর্বোচ্চ ২৩৪ ম্যাচ, সর্বোচ্চ ১৪৬ গোল। ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপে ১৪ গোল, বিশ্বকাপে ১১। পাঁচটি ইউরো আর ছয়টি বিশ্বকাপে গোল করেছেন তিনি। আন্তর্জাতিক গোলের ৯৪টি এসেছে ৩০ বছর বয়স পেরিয়ে। কিন্তু বন্ধুর অবদান কি শুধু হিসাবের খাতায় লেখা থাকে?
২০১৬ সালের ইউরো ফাইনাল মনে পড়ে? ফ্রান্সের বিপক্ষে মাঠে নামেন রোনালদো। কিন্তু চোট তাকে স্রেফ ২৫ মিনিটেই মাঠ ছাড়তে বাধ্য করে। সেই মানুষটিই পরে সাইডলাইনে দাঁড়িয়ে সতীর্থদের নির্দেশনা দিয়েছেন, চিৎকার করেছেন, উৎসাহ দিয়েছেন। মাঠের বাইরে থেকেও যেন অধিনায়কত্বের দায় ছাড়েননি।
পর্তুগাল সেদিন জিতেছিল। দেশের ইতিহাসে প্রথম বড় আন্তর্জাতিক শিরোপা। রোনালদোর হাতে উঠেছিল ইউরোর ট্রফি। এরপর ২০১৯ সালে নেশনস লীগ। ২০২৫ সালে আবার সেই শিরোপা। ২০০৪ ইউরোর আগে যে মানুষটা দেশকে প্রথম আন্তর্জাতিক শিরোপা এনে দেয়ার ইচ্ছা পোষণ করেছিলেন, তিনি এনে দিলেন তিন-তিনটি শিরোপা।
তার বিদায়টা অবশ্য স্বপ্নের মতো মসৃণ নয়। গত বিশ্বকাপে তিন গোল করলেও শেষ ষোলোয় স্পেনের কাছে হেরে বিদায় নেয় পর্তুগাল। আগেই জানিয়েছিলেন, ২০২৬ বিশ্বকাপই হবে তার শেষ। এরপর জাতীয় দলের হয়ে আরেকটি শিরোপার স্বপ্নও ছিল। কিন্তু নতুন কোচ জর্জ জেসুসের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েন, দলের ক্যাম্প ছেড়ে চলে যাওয়া, পরবর্তী ম্যাচে বেঞ্চে থাকা-সব মিলিয়ে বিদায়ের মুহূর্তটা এসেছে প্রত্যাশার চেয়ে আগেই। ক্যাম্প ছাড়ার ঘটনায় জরিমানা হয়েছে ২৫৫ ইউরো, আর পেছনের তারিখ থেকে কার্যকর ৩০ দিনের নিষেধাজ্ঞাও পেয়েছেন। তবু এসব দিয়ে রোনালদোর ২৩ বছরের গল্পকে বিচার করা যায় না।
ভুল করেছেন, কষ্ট পেয়েছেন, হয়তো দেশের প্রত্যাশাও শতভাগ পূরণ করতে পারেননি। তবে নিজের ভাষায়, ‘আমি কখনো হাল ছাড়িনি। আর পর্তুগালের প্রতিনিধিত্ব করার গর্ব কখনো হারাইনি।’ এই কথাটুকুতে যেন তার সমস্ত অসমাপ্তি, সমস্ত আক্ষেপ আর সমস্ত ভালোবাসা একসঙ্গে এসে দাঁড়ায়। পরিবারের কাছেও তার কৃতজ্ঞতা। যাদের সঙ্গে ভাগ করে নিতে হয়েছে অনুপস্থিতি, ত্যাগ, জাতীয় দলের জন্য জীবনের অনেকটা জায়গা ছেড়ে দেওয়া। আর পর্তুগালের মানুষদের উদ্দেশে তার শেষ কথায় ফিরে এসেছে সেই ছোট্ট ছেলেটির স্মৃতি- মাদেইরায় ফুটবলের পেছনে ছুটে বেড়ানো এক শিশু। জাতীয় সংগীতের মুহূর্তটিও মনে রাখবেন রোনালদো। গ্যালারিতে শিশু, মা-বাবা, দাদা-দাদি। দূর দেশ থেকে আসা পর্তুগিজ মানুষ। তখন কোনো ক্লাব নেই, রং নেই, শ্রেণি নেই, পেশা নেই, মতামতের বিভেদ নেই। শুধু এক আবেগ-পর্তুগাল। সেই আবেগের সঙ্গেই বিদায় নিচ্ছেন রোনালদো। শেষবারের মতো বলেছেন, মাঠে জাতীয় দলের যাত্রা শেষ হলেও তিনি পর্তুগালেরই একজন হয়ে থাকবেন। প্রতিটি জয়-পরাজয়ে, প্রতিটি আনন্দে, প্রতিটি ‘সিউউউ’তে।
প্রথমবার ইউরো জিতে রোনালদো সতীর্থদের বলেছিলেন, “আমরা যখন বুড়ো হয়ে যাবো, কোনো পানশালায় বসে পান করবো এবং বলবো, ‘আমি পর্তুগালের হয়ে ২০১৬ সালে ইউরো জিতেছি।” ঠিক একইভাবে বুকভরা গর্ব নিয়ে গোটা একটা প্রজন্ম এক সময় বলবে, ‘আমরা রোনালদোকে খেলতে দেখেছি।’ রোনালদোর বিদায়ে তাই কেবল একজন ফুটবলারের অধ্যায় শেষ হলো না, শেষ হলো পুরো একটা প্রজন্মের একসঙ্গে বড় হয়ে ওঠার গল্পের একটা অংশেরও।
