নোয়াখালী জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের উচ্চমান সহকারী ও কম্পিউটার অপারেটরের বিরুদ্ধে প্রশ্নপত্র ফাঁস, প্রক্সির মাধ্যমে চাকরি দেয়ার প্রলোভন দেখিয়ে অর্থ আদায় এবং নিয়োগ বাণিজ্যের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার ইশরাত নাছিমা হাবিবের যোগসাজশ ও সহযোগিতার অভিযোগও করেছেন এক ভুক্তভোগী নারী। বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের দাবিতে জেলা প্রশাসকের কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন সহকারী শিক্ষক পদে চাকরিপ্রার্থী মুক্তা বেগম। অভিযুক্তরা হলেন, নোয়াখালী জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের উচ্চমান সহকারী মো. সোহরাব উদ্দিন ও কম্পিউটার অপারেটর মোহাম্মদ মঈন উদ্দিন। লিখিত অভিযোগে মুক্তা বেগম উল্লেখ করেন, ২০২৫ সালের ২৯শে ডিসেম্বর প্রশ্নপত্র ফাঁস অথবা প্রক্সির মাধ্যমে সহকারী শিক্ষক পদে চাকরি পাইয়ে দেয়ার আশ্বাস দিয়ে অভিযুক্তরা তার কাছ থেকে নগদ, চেক ও বাহকের মাধ্যমে মোট ৮ লাখ টাকা গ্রহণ করেন। স্থানীয় এক শিক্ষকের মাধ্যমে এ অর্থ লেনদেনের ব্যবস্থা করা হয়। তবে দীর্ঘ সময় পার হলেও চাকরি না হওয়ায় তিনি টাকা ফেরত চাইতে গেলে অভিযুক্তরা বিভিন্ন অজুহাতে সময়ক্ষেপণ করছেন বলে অভিযোগ করেন তিনি।
অভিযোগে আরও বলা হয়, লম্বরিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক ওবায়দুর রহমানের মাধ্যমে ওই টাকা গ্রহণ করা হয়েছিল। বর্তমানে তিনি অবসর-পূর্ব ছুটিতে (পিআরএল) রয়েছেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। মুক্তা বেগমের দাবি, উচ্চমান সহকারী সোহরাব উদ্দিন এর আগে ২০২৩ সালে তার স্ত্রীকে প্রশ্নপত্র ফাঁসের মাধ্যমে সহকারী শিক্ষক পদে চাকরি পাইয়ে দিয়েছিলেন বলে তাকে আশ্বস্ত করা হয়। একই কৌশলে তাকেও চাকরি দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ৮ লাখ টাকা নেয়া হয়েছে। অভিযোগে প্রশ্নপত্র ফাঁস ও প্রক্সি জালিয়াতির সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে ম্যাকপার্শ্বান সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক হাছান উদ্দিন বিপ্লবের নামও উল্লেখ করা হয়েছে। তিনি বর্তমানে সাময়িক বরখাস্ত রয়েছেন বলে অভিযোগে বলা হয়। ২০২২ সালে প্রশ্নপত্র ফাঁস ও প্রক্সি জালিয়াতির অভিযোগে তৎকালীন জেলা প্রশাসক তাকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে সোপর্দ করেন এবং এ ঘটনায় জিআর মামলা নং-১৭২৩/২০২২ দায়ের হয় বলে অভিযোগকারী উল্লেখ করেছেন। ওই ঘটনায় দুই মাস কারাভোগের পর সোহরাব উদ্দিন ও মঈন উদ্দিনের তদবিরে তিনি জামিনে মুক্ত হন বলেও দাবি করা হয়েছে। অভিযোগকারীর আরও দাবি, জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসারের সঙ্গে অভিযুক্ত দুই কর্মচারীর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে-এ কথা বলে তাকে ভয়ভীতি দেখানো হতো। এ ছাড়া বিভিন্ন অজুহাতে শিক্ষকদের হয়রানি এবং তাদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা দাবি করার অভিযোগও রয়েছে ওই দুই কর্মচারীর বিরুদ্ধে। লিখিত অভিযোগে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসারের যোগসাজশে জেলা নিয়োগ, বদলি ও পদায়ন কমিটির মাসিক সভার রেজ্যুলেশনে জালিয়াতির মাধ্যমে একটি বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক পদে কর্মরত থাকা অবস্থায় একই পদে অন্য বিদ্যালয় থেকে আরেকজন শিক্ষককে বদলি করার অভিযোগও তোলা হয়েছে। অভিযোগকারীর মতে, এ ধরনের বদলি প্রচলিত বিধিবিধানের পরিপন্থি। স্থানীয় সূত্রের বরাত দিয়ে অভিযোগে আরও বলা হয়, হাতিয়া উপজেলায় কর্মরত থাকাকালে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে সোহরাব উদ্দিনকে সেখান থেকে অন্যত্র বদলি করা হয়েছিল। এ ছাড়া তার বড় ভাই প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার (গবেষণা ও বই বিতরণ) পদে কর্মরত থাকায় প্রভাব খাটিয়ে তিনি জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসে দায়িত্ব পালন করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। টাকা ফেরত চাইলে ওই ভাই ও জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসারের সঙ্গে সুসম্পর্কের কথা উল্লেখ করে তাকে ভয় দেখানো হতো বলে দাবি করেন মুক্তা বেগম। অভিযোগকারীর দাবি, এসব অর্থ লেনদেনের অডিও রেকর্ড এবং ব্যাংক চেকসংক্রান্ত প্রমাণাদি তার কাছে সংরক্ষিত রয়েছে।
তবে অভিযোগ অস্বীকার করেছেন অভিযুক্ত দুই কর্মচারী। উচ্চমান সহকারী মো. সোহরাব উদ্দিন বলেন, কোনো প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক আমার কোনো কর্মকাণ্ডে হয়রানি বা ক্ষতিগ্রস্ত হলে তিনি আমার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ করতে পারেন। বিষয়টি তদন্ত হলেই সত্যতা বেরিয়ে আসবে। আমার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো সম্পূর্ণ মিথ্যা ও ভিত্তিহীন। এসব বিষয়ে আমি কিছুই জানি না। অন্যদিকে কম্পিউটার অপারেটর মোহাম্মদ মঈন উদ্দিন বলেন, আমার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা ও বানোয়াট। এ বিষয়ে আমি কিছুই জানি না। এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে নোয়াখালী জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার ইশরাত নাছিমা হাবিবের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি। অভিযোগের বিষয়ে নোয়াখালীর জেলা প্রশাসক ইশতিয়াক আহমেদ বলেন, এ বিষয়ে একটি লিখিত অভিযোগ পেয়েছি। অভিযোগটি তদন্তের জন্য অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক পর্যায়ের দুই কর্মকর্তাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তারা তদন্ত করে প্রতিবেদন জমা দেবেন। তদন্তে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে অপরাধের প্রমাণ পাওয়া গেলে তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে।
প্রাথমিক শিক্ষা অফিস
নোয়াখালীতে দুই কর্মচারীর বিরুদ্ধে টাকা আত্মসাৎ ও প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ
স্টাফ রিপোর্টার, নোয়াখালী থেকে
৭ নভেম্বর (শনিবার), ২০২৬
লিংক কপি হয়েছে!
ফন্ট সাইজ:
100%
