রেজাউল করিম খন্দকার। ভোলার চরফ্যাশনের দক্ষিণ আইচা গ্রামের এই বাসিন্দা একসময় শিক্ষকতা করলেও রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর দখলবাজিতে মেতে উঠেছেন। রাজধানী থেকে শুরু করে নিজ এলাকা ভোলাতেও প্রভাব বিস্তার করছেন তিনি। জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে অবৈধভাবে মানুষের জমি দখল, সরকারি ও ব্যক্তিমালিকানাধীন সম্পত্তি গ্রাস এমনকি চরাঞ্চলের শত শত একর জমি নিজের নিয়ন্ত্রণে নেয়ার অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে। স্থানীয় সংসদ সদস্য থেকে শুরু করে পুলিশ সদর দপ্তরে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ জমা পড়েছে। এমনকি এলাকাবাসী সংবাদ সম্মেলন, মানববন্ধন, জুতা মিছিলও করেছেন তার বিরুদ্ধে।
সূত্র মতে, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে প্রথমে চরফ্যাশন কলেজে চাকরি নেন রেজাউল। এরপর ২০১৩ সালের ১লা অক্টোবর ঢাকা সরকারি মাদ্রাসা-ই-আলিয়ায় আধুনিক আরবি বিষয়ের প্রভাষক হিসেবে যোগদান করেন। তবে ৫ই আগস্ট পট পরিবর্তনের পর এলাকায় ফিরে চরের জমির ধান লুটসহ জমি দখল ও বিভিন্ন অপরাধে জড়িয়ে পড়েন। আর ওই দখলদারিত্বের কাজের সুবিধার্থেই শিক্ষকতার চাকরি ছেড়ে দেন তিনি। সম্প্রতি রাজধানীর মোহাম্মদপুরের চাঁদ উদ্যান হাউজিং এলাকায় শতাধিক লোক নিয়ে হাউজিংয়ের জমি দখলের চেষ্টার ঘটনাতেও এই রেজাউলের উপস্থিতি দেখা যায়। স্থানীয়রা বলেন, মোহাম্মদপুর বেড়িবাঁধসংলগ্ন প্রবাসী এবং স্থানীয়রা মিলে ক্রয় করা জমিতে প্রস্তাবিত টুইন টাওয়ার নামে একটি শপিংমল কাম আবাসিক বাসাবাড়ি নির্মাণের কাজ চলছিল। গত ২৬শে সেপ্টেম্বর সকাল ১০টার দিকে ওই প্লটের অফিসের দ্বিতীয় তলায় একদল ব্যক্তি দেশীয় অস্ত্র ও লাঠিসোটা নিয়ে ঢুকে মালামাল ভাঙচুর করে। সিসিটিভি ক্যামেরা, এসি, কম্পিউটার, আসবাবপত্র থেকে শুরু করে ইলেকট্র্রিক বোর্ডের সুইচ পর্যন্ত খুলে নিয়ে যায়। এ ছাড়াও অফিসে থাকা নগদ ১৫ লাখ টাকাসহ বিভিন্ন জমি সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র লুটে নিয়ে যায় তারা।
ওই ঘটনায় মোহাম্মদপুর থানায় একটি মামলাও করা হয়। প্রত্যক্ষদর্শীরা বলেন, ওই ঘটনায় রেজাউল করিম খন্দকার নেতৃত্ব দেন। শুধু চাঁদ উদ্যান নয়, মোহাম্মদপুরের জমি দখলের চেষ্টার অভিযোগে রেজাউল করিম খন্দকারের বিরুদ্ধে নতুন করে আরও একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের হয়েছে থানায়। সাজেদা বেগম নামে এক ভুক্তভোগী গত ১লা নভেম্বর মোহাম্মদপুর থানায় জিডিটি করেন। লিখিত অভিযোগে সাজেদা মোহাম্মদপুরের বেড়িবাঁধ রোডের জহুরা মঞ্জিল নামের একটি বাড়িতে হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট, সিসিটিভি ক্যামেরা ভাঙচুর এবং বিভিন্ন ধরনের হুমকির অভিযোগ তুলে জীবনের নিরাপত্তা চেয়েছেন। জিডিতে উল্লেখ করা হয়, গত ২৬শে সেপ্টেম্বর মোস্তাকের রহমান খোকন চৌধুরীর নেতৃত্বে ২৫০ থেকে ৩০০ জনের একটি দল বাড়ির মালিকের অফিসে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাট চালায়। ওই ঘটনায় ২৭শে সেপ্টেম্বর মোহাম্মদপুর থানায় মামলা করা হয়। এরপর গত ৭ই অক্টোবর রাতে মো. স্বপনের নেতৃত্বে একদল দুর্বৃত্ত বাড়ির সিসিটিভি ক্যামেরা ভেঙে নিয়ে যায়। এরপর ২১শে অক্টোবর রেজাউল করিম খন্দকারের নেতৃত্বে কয়েকজন ওই বাড়িতে গিয়ে মহড়া দেন এবং বিভিন্ন ধরনের হুমকি দেন।
ওই প্লট মালিকরা বলেন, ২০ বছর আগে মায়ের বিক্রি করে দেয়া জমি এখন ছেলেকে সঙ্গে করে নিয়ে এসে ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে নতুন করে নাটক সাজিয়ে রেজাউল পুরো প্লট দখল করার চেষ্টা করছে। এই সব ঘটনার সিসিটিভি ফুটেজ আমাদের কাছে সংরক্ষিত আছে। ভবিষ্যতে বড় ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার আশঙ্কাও প্রকাশ করে নিজের জীবন নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন সাজেদা।
এদিকে চরফ্যাশনে খোঁজ নিলে সেখানকার বাসিন্দারা বলেন, ২০০১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় ভোলা-৪ (চরফ্যাশন-মনপুরা) আসনের তৎকালীন বিএনপি প্রার্থীর নির্বাচনী জনসভায় ফুল দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে বিএনপিতে যোগ দেন রেজাউল করিম খন্দকার। পরবর্তীতে দক্ষিণ আইচা থানা বিএনপি’র আহ্বায়কের পদ বাগিয়ে নেন। গত ১৭ বছর সেই পরিচয় ব্যবহার না করলেও জুলাই আন্দোলনের পর আবারো প্রভাব বিস্তার শুরু করেন তিনি।
রেজাউল বিভিন্ন সময়ে তার সহযোগী ও সংঘবদ্ধ লোকজনের মাধ্যমে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে আনুমানিক ৪শ’ থেকে ৫শ’ একর সরকারি খাসজমি নিজের নিয়ন্ত্রণে নিয়েছেন। অথচ এসব জমির বিভিন্ন অংশে দীর্ঘদিন ধরে প্রকৃত ভূমিহীন ও দরিদ্র কৃষক পরিবার বসবাস ও চাষাবাদ করে আসছিল। তাদেরকে ভয়ভীতি দেখিয়ে তাদের বসতবাড়ি ও চাষাবাদের জমি থেকে উচ্ছেদের চেষ্টা চালান তিনি। এমনকি একাধিক পরিবারকে বসতভিটা ছেড়ে যেতে বাধ্য করেছেন রেজাউল। সম্প্রতি জমির ধান লুট করে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগে থানায় গিয়েও বিচার না পেয়ে মাথার ঘাম পায়ে ফেলে জমিতে ফলানো ধান উদ্ধারে স্থানীয় সংসদ সদস্যের কাছে নালিশ দেন ভুক্তভোগীরা। একইসঙ্গে রেজাউলের হাত থেকে বাঁচতে স্থানীয় বাসিন্দারা পুলিশ হেডকোয়ার্টারেও লিখিত অভিযোগ জমা দিয়েছে।
পুলিশ হেডকোয়ার্টার্স থেকে স্থানীয় প্রশাসনকে তদন্তের নির্দেশ দেয়া হয়। কিন্তু অদৃশ্য কারণে সেই তদন্ত এখনো আলোর মুখ দেখেনি। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বরাবরও একাধিক লিখিত অভিযোগ জমা দিয়েছেন স্থানীয় ভুক্তভোগীরা। ওই বিষয়েও তদন্তের জন্য দক্ষিণ আইচা থানায় নির্দেশ দেয়া হয়। এমনকি বাংলাদেশ পুলিশ হেডকোয়ার্টার্স থেকে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশনাসংক্রান্ত একটি পত্র জারি করা হয়েছে। এত কিছুর পরও বহাল তবিয়তে রয়েছেন তিনি।
এসব বিষয়ে ভোলার দক্ষিণ আইচা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আহসান কবির মানবজমিনকে বলেন, রেজাউল করিম খন্দকারের বিরুদ্ধে একটি নয়, একাধিক অভিযোগ এসেছে আমাদের কাছে। পুলিশ হেডকোয়ার্টার থেকেও আমাদের পুলিশ সুপারের কাছে দু’টি অভিযোগ তদন্তের চিঠি এসেছে। আমি নিজে এসব অভিযোগ তদন্ত করছি। তদন্তের পর এ বিষয়ে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া হবে।
বিষয়টি নিয়ে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ-ডিএমপি’র মোহাম্মদপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আব্দুল হালিম বলেন, চাঁদ উদ্যানের জমি দখলের চেষ্টার ঘটনায় আমাদের থানায় একাধিক লিখিত অভিযোগ করা হয়েছে। বর্তমানে সেগুলো তদন্তাধীন রয়েছে। এসব বিষয়ে একাধিকবার ফোন দেয়ার পরও রিসিভ না করায় রেজাউলের বক্তব্য নেয়া সম্ভব হয়নি।
