আর কতো রক্ত ঝরলে উখিয়া-টেকনাফের মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে? একজন সেনাসদস্যের প্রাণ গেল সশস্ত্র অপরাধীদের গুলিতে। দুর্গম পাহাড়ের আস্তানা থেকে উদ্ধার করা হলো ৫৭ জন জিম্মিকে। অথচ এই জনপদের পাহাড়ে অপহরণ, মুক্তিপণ আদায়, ডাকাতি ও মানব পাচারকারী চক্রের তৎপরতা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই উদ্বেগ রয়েছে। অভিযান হয়েছে, গ্রেপ্তারও হয়েছে; কিন্তু অপরাধী চক্রের নেটওয়ার্ক কতোটা ভেঙেছে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। কক্সবাজারের উখিয়া-টেকনাফে রোহিঙ্গা ক্যাম্প ঘিরে নিরাপত্তা পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল হয়ে উঠছে। একদিকে ক্যাম্পের বাইরে ভাড়া বাসা ও পাহাড় কেটে গড়ে ওঠা বসতি, অন্যদিকে স্থানীয় বাজারগুলোতে রোহিঙ্গাদের দোকানপাট ও ব্যবসা-বাণিজ্যের বিস্তার। এসব বসতি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কারা জড়িত, কারা আশ্রয় ও সহযোগিতা দিচ্ছে, কতজনের বৈধ পরিচয় ও নিবন্ধন রয়েছে এসব বিষয়ে প্রশাসনের নজরদারি কতটা কার্যকর, তা নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে।
সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবার টেকনাফের রঙ্গিখালী এলাকার দুর্গম পাহাড়ে মানব পাচারকারী চক্রের আস্তানায় সেনাবাহিনী, বিজিবি ও পুলিশের যৌথ অভিযানে সশস্ত্র ব্যক্তিদের গুলিতে সেনাসদস্য সৈনিক মোহাম্মদ তিতাস শেখ নিহত হন। এ সময় জিম্মি অবস্থায় থাকা ৫৭ জনকে উদ্ধার এবং পাঁচজনকে আটক করা হয়। গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী, ১৫ থেকে ১৬ জনের একটি সশস্ত্র চক্র সেখানে প্রায় ১২০ জন রোহিঙ্গা ও বাংলাদেশিকে জিম্মি করে রেখেছিল। একজন সেনাসদস্যের এই আত্মত্যাগ নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে, উখিয়া-টেকনাফের বিস্তীর্ণ পাহাড়ি এলাকায় অপরাধীদের আস্তানা, অস্ত্রের মজুত ও অপহরণকারী চক্রের নেটওয়ার্ক কতটা বিস্তৃত। এর আগে চলতি বছরের ৮ই ফেব্রুয়ারি উখিয়ার পালংখালী ইউনিয়নের বালুখালী ও আশপাশের এলাকায় যৌথ বাহিনীর অভিযানে ক্যাম্পের বাইরে বসবাসরত ৬২২ জন রোহিঙ্গাকে আটক করে ক্যাম্পে ফেরত পাঠায়।
একই অভিযানে বাড়িভাড়া দেয়ার অভিযোগে ১৩ জন বাড়ির মালিকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া এবং মোট ১ লাখ ৫৭ হাজার টাকা জরিমানার তথ্যও উঠে আসে। ওই অভিযানে মরা গাছতলা এলাকায় পাহাড় কেটে প্রায় ৩৫০টি অবৈধ বসতি নির্মাণের তথ্যও সামনে আসে। এসব বসতি থেকে জনপ্রতি মাসে দুই থেকে তিন হাজার টাকা ভাড়া আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। একটি প্রভাবশালী চক্র এসব বসতি নির্মাণ করে রোহিঙ্গাদের কাছে ভাড়া দিচ্ছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ। এত বড় অভিযান ও জরিমানার পরও ক্যাম্পের বাইরে বসবাসের প্রবণতা পুরোপুরি বন্ধ হয়েছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। উখিয়ার বিভিন্ন বাজারেও রোহিঙ্গাদের দোকানপাট ও ব্যবসা-বাণিজ্যের বিস্তার নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে। আবার কোথাও স্থানীয়দের সঙ্গে অংশীদারিত্বে ব্যবসা করার অভিযোগ রয়েছে। উখিয়া টেকনাফে অপহরণ ও মুক্তিপণ আদায়ের ভয়াবহ চিত্রও দীর্ঘদিনের।
স্থানীয় ও রোহিঙ্গা উভয় জনগোষ্ঠীর মানুষ অপহরণের শিকার হচ্ছেন। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীদের পাহাড়ে আটকে রেখে পরিবারের কাছে মোটা অঙ্কের মুক্তিপণ দাবি করা হচ্ছে। অপহরণকারীদের কাছে ভুক্তভোগীদের অবস্থান ও আর্থিক সামর্থ্যের তথ্য পৌঁছে দেয়া, পাহাড়ে যাতায়াতের পথ দেখানো এবং মুক্তিপণের অর্থ লেনদেনে স্থানীয় সহযোগীদের ভূমিকা থাকার অভিযোগও রয়েছে। স্থানীয়দের সবচেয়ে বড় অভিযোগ, অপরাধীরা একা অপরাধ পরিচালনা করে না। তাদের জন্য প্রয়োজন হয় আশ্রয়, তথ্যদাতা, রসদ সরবরাহকারী, অস্ত্রের জোগানদাতা এবং মুক্তিপণের অর্থ লেনদেনে সহযোগী। এসব সহযোগীর মধ্যে স্থানীয় কেউ জড়িত থাকলে তাদেরও আইনের আওতায় আনা জরুরি। একজন সেনাসদস্যের আত্মত্যাগ যেন কেবল শোক ও সমবেদনার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে। উখিয়া-টেকনাফের মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থার সমন্বিত, দৃশ্যমান ও ধারাবাহিক পদক্ষেপ এখন সময়ের দাবি।
