কলকাতায় বাংলাদেশ মিশনের নিরাপত্তা, সীমান্ত হত্যা বন্ধ ও পানির ন্যায্য হিস্যা চাইল চার ধর্মের ঐক্য ফোরাম

ফন্ট সাইজ:

বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব ও অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে বিদেশি হস্তক্ষেপের অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করেছে বাংলাদেশ মুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান ঐক্য ফোরাম। সংগঠনটি বলেছে, বাংলাদেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে এ দেশের জনগণ। কোনো বিদেশি রাষ্ট্রের রাজনৈতিক কিংবা গোয়েন্দা হস্তক্ষেপ মেনে নেয়া হবে না। ভারতের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক চাইলেও আধিপত্যবাদী কিংবা অসম সম্পর্ক গ্রহণযোগ্য নয়।

কলকাতায় বাংলাদেশের উপ-হাইকমিশন অভিমুখে উগ্র হিন্দুত্ববাদী সংগঠনের সমর্থকদের মিছিল ও কূটনৈতিক স্থাপনার নিরাপত্তা বিঘ্নিত করার ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে সংগঠনটি। একই সঙ্গে ভারতে বাংলাদেশের সব কূটনৈতিক মিশনের নিরাপত্তা নিশ্চিত, সীমান্ত হত্যা বন্ধ, পানির ন্যায্য হিস্যা আদায় এবং বাণিজ্য বৈষম্য দূর করার দাবি জানিয়েছে।

সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনের আহ্বায়ক সুরঞ্জন ঘোষ ও সাধারণ সম্পাদক মাহাবুবুর রহমান এসব দাবি তুলে ধরেন। লিখিত বক্তব্যে তারা বলেন, বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব, স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি ও জনগণের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকারকে সম্মান করতে হবে। বাংলাদেশ কোনো রাষ্ট্রের করদ রাজ্য নয়। এ দেশের সরকার গঠন কিংবা রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণের অধিকার অন্য কোনো দেশের নেই।

২০১৩ সালের দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে জাতীয় পার্টির তৎকালীন চেয়ারম্যান প্রয়াত হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের সঙ্গে ভারতের তৎকালীন পররাষ্ট্র সচিব সুজাতা সিংয়ের আলোচনার প্রসঙ্গ তুলে ধরে বক্তারা বলেন, বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও নিরাপত্তাবিষয়ক সিদ্ধান্তে ভারতের গোয়েন্দা ও কূটনৈতিক হস্তক্ষেপের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। এসব অভিযোগ নিরপেক্ষভাবে তদন্ত হওয়া প্রয়োজন।

সংবাদ সম্মেলনে কলকাতায় বাংলাদেশ উপ-হাইকমিশন অভিমুখে মিছিলের ঘটনায় ক্ষোভ জানিয়ে বলা হয়, শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের অধিকার সবার রয়েছে। কিন্তু কূটনৈতিক স্থাপনায় হামলার চেষ্টা কিংবা ভীতি প্রদর্শন কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। ১৯৬১ সালের ভিয়েনা কনভেনশন অনুযায়ী কূটনৈতিক মিশনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা স্বাগতিক রাষ্ট্রের দায়িত্ব। ভারত সরকারকে এ দায়িত্ব যথাযথভাবে পালনের আহ্বান জানানো হয়।

আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ভারতের গোয়েন্দা তৎপরতা নিয়েও প্রশ্ন তোলে সংগঠনটি। কানাডার নাগরিক হরদীপ সিং নিজ্জর হত্যাকাণ্ড এবং যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক গুরপতবন্ত সিং পান্নুনকে হত্যার ষড়যন্ত্রে ভারতীয় সরকারি এজেন্টদের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগের প্রসঙ্গ তুলে বলা হয়, এসব ঘটনা আন্তর্জাতিক আইন ও রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্বের গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এনেছে। এ ধরনের অভিযোগের বিচারিক প্রক্রিয়াকে সম্মান জানানোর আহ্বান জানানো হয়।

ভারতের মণিপুরে চলমান জাতিগত সংঘাত, কুকি-জো জনগোষ্ঠীর হতাহত ও বাস্তুচ্যুত হওয়ার ঘটনা এবং খ্রিস্টানদের ধর্মীয় স্থাপনায় হামলার ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করে সংগঠনটি। একই সঙ্গে ভারতে মুসলিম, খ্রিস্টান, দলিত ও আদিবাসী জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা এবং সমান নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করার দাবি জানানো হয়। নাগরিক অধিকারকর্মী ওমর খালিদের দীর্ঘ বিচারপূর্ব কারাবাসের প্রসঙ্গ তুলে প্রত্যেক অভিযুক্তের দ্রুত ও নিরপেক্ষ বিচার নিশ্চিতের আহ্বান জানানো হয়।

ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক প্রসঙ্গে সংগঠনটি জানায়, ভারতের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখতে তারা আগ্রহী। তবে বন্ধুত্ব হতে হবে সমতা ও পারস্পরিক সম্মানের ভিত্তিতে। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়ালের ইতিবাচক ও গঠনমূলক সম্পর্কের বক্তব্যকে স্বাগত জানিয়ে বলা হয়, বন্ধুত্বের ঘোষণা বাস্তব আচরণেও প্রতিফলিত হওয়া প্রয়োজন।
সংবাদ সম্মেলনে ১০ দফা দাবি তুলে ধরে সংগঠনটি। দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে—বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব ও স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতির প্রতি সম্মান, অভ্যন্তরীণ বিষয়ে বিদেশি গোয়েন্দা হস্তক্ষেপের অভিযোগ তদন্ত, ভারতে বাংলাদেশের কূটনৈতিক মিশনের নিরাপত্তা, সীমান্ত হত্যা বন্ধ, পানির ন্যায্য হিস্যা নিশ্চিত, বাণিজ্য বৈষম্য দূর এবং ভারতের সংখ্যালঘু ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মানবাধিকার সুরক্ষা।

সংগঠনটির নেতারা বলেন, তাদের বক্তব্য ভারতের জনগণ কিংবা কোনো ধর্মীয় সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে নয়। অন্যায়, আধিপত্যবাদ, সাম্প্রদায়িকতা ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে তাদের অবস্থান। বাংলাদেশের কোনো ধর্মীয় সম্প্রদায়ের ওপর অন্যায় হলে যেমন প্রতিবাদ করা হবে, তেমনি ভারতে কোনো সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর ওপর নিপীড়ন হলেও প্রতিবাদ জানানো হবে।

তারা বলেন, ‘বন্ধুত্ব চাই, আধিপত্য নয়। সহযোগিতা চাই, হস্তক্ষেপ নয়। সম্প্রীতি চাই, সাম্প্রদায়িকতা নয়। মানবাধিকার চাই, দ্বৈতনীতি নয়। ধর্ম যার যার, বাংলাদেশ সবার। বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে কোনো আপস নয়।’