টানা কয়েকদিনের শ্রমিক অসন্তোষ, বিক্ষোভ, সংঘর্ষের পর স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে রাজধানীর মিরপুর, সাভার, আশুলিয়া, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জের শিল্পাঞ্চলের কর্মপরিবেশ। গতকাল শ্রমিকদের মধ্যে ফিরেছে কর্মচাঞ্চল্য। উৎপাদন কার্যক্রম চলছে পুরোদমে। গতকাল সকাল থেকে অধিকাংশ পোশাক কারখানায় শ্রমিকরা কাজে যোগ দিয়েছেন। শিল্পাঞ্চলে যেকোনো ধরনের অপ্রীতিকর পরিস্থিতি ও বিশৃঙ্খলা ঠেকাতে গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে পুলিশের পাশাপাশি বিজিবি, এসআরবি ও আনসার সদস্যদের সমন্বয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মোতায়েন করা হয়। সতর্ক অবস্থানে থাকেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। জোরদার করা হয় টহল। তবে গাজীপুরে শ্রমিক তৌফিক হোসেনের মৃত্যুর প্রতিবাদে আশুলিয়ায় বিক্ষোভ মিছিল করেন পোশাক শ্রমিকরা। এ ছাড়াও আশুলিয়ায় আব্দুল্লাহপুর-বাইপাইল সড়কের জামগড়া এলাকায় শ্রমিকদের সঙ্গে পাল্টাপাল্টি ধাওয়া ও পুলিশের একটি গাড়ি ভাঙচুর করা হয়। পরিস্থিতি বিবেচনায় শিল্পাঞ্চলের ৭০টি কারখানায় সাময়িকভাবে ছুটি ঘোষণা করা হয়।
সকাল থেকে রাজধানীর মিরপুর এলাকার কারখানাগুলোতে স্বতঃস্ফূর্তভাবে কাজে যোগ দেন পোশাক শ্রমিকেরা। ঢাকা-টাঙ্গাইল ও ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক সংলগ্ন কোনাবাড়ী, চান্দনা চৌরাস্তা, ভোগড়া, মৌচাক, সফিপুর, পল্লী বিদ্যুৎ ও চন্দ্রাসহ বিভিন্ন এলাকার কারখানাগুলোও চালু ছিল। অধিকাংশ কারখানা খুলে দেয়ায় শিল্পাঞ্চল জুড়েই পরিস্থিতি সম্পূর্ণ স্বাভাবিক ছিল। এ ছাড়াও সকাল থেকে নারায়ণগঞ্জে কোথাও শ্রমিকদের বিক্ষোভ বা আন্দোলনে নামতে দেখা যায়নি। সব পোশাক কারখানায় স্বাভাবিকভাবে উৎপাদন কার্যক্রম চলে। তবে, আশুলিয়ায় আব্দুল্লাহপুর-বাইপাইল সড়কের জামগড়া এলাকায় শ্রমিকদের পাল্টাপাল্টি ধাওয়া ও পুলিশের একটি গাড়ি ভাঙচুর করা হয়। এ ঘটনার পর আশুলিয়ার ৭০টি কারখানায় ছুটি ঘোষণা করা হয়।
বিজিএমইএ’র তথ্য অনুযায়ী, মিরপুর এলাকায় ৩২০টি তৈরি পোশাক কারখানা রয়েছে। সরজমিন দেখা যায়, কয়েকদিনের অস্থিরতা কাটিয়ে মিরপুরের পোশাকশিল্পে কর্মচাঞ্চল্য ফিরে এসেছে। অধিকাংশ কারখানায় শ্রমিকেরা কাজে ফিরেছেন এবং স্বাভাবিকভাবে শুরু হয়েছে উৎপাদন কার্যক্রম। এদিন সকালে শ্রমিকরা সারিবদ্ধভাবে ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশে কারখানায় প্রবেশ করেন। তবে নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগ ও শ্রমিক অসন্তোষের আশঙ্কায় কিছু কারখানা এখনো বন্ধ রেখেছে কর্তৃপক্ষ। এসব কারখানার ফটকে সাময়িক বন্ধ ও সাধারণ ছুটির নোটিশও টাঙানো রয়েছে। কর্তৃপক্ষ জানায়, শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই আপাতত উৎপাদন বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। বদরুল আলম নামে এক শ্রমিক বলেন, নতুন মাসের ৫ তারিখ চলছে। আমরা কাজ না করলে মালিকেরা কীভাবে বেতন দেবে? আর সরকারও মজুরি বোর্ড গঠন করেছে। সামনের মাস থেকে নতুন কাঠামোতে বেতন দিবে। এখন আর আন্দোলনের কোনো মানে নেই। তাই আমরা কাজে ফিরেছি। ফরিদ আহমেদ নামে আরেক শ্রমিক বলেন, গত কয়েকদিন কাজে যোগ দিতে পারিনি। কারখানার সামনে আসার আগেই আন্দোলন দেখে চলে যেতাম। বৃহস্পতিবার সকাল থেকে কোনো ঝামেলা বা আন্দোলন নেই। তাই শান্তিতে কারখানায় প্রবেশ করতে পারছি।
আমেনা বেগম বলেন, এখন কাজ না করলে বেতন দিতে পারবে না। আর বেতন না হলে আমরা বাসা ভাড়াও দিতে পারবো না। তখন না খেয়ে থাকতে হবে। তাই কাজ করাই ভালো।
এদিকে স্টাফ রিপোর্টার, সাভার থেকে জানান: ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হচ্ছে সাভার ও আশুলিয়া শিল্পাঞ্চলের কর্মপরিবেশ। বৃহস্পতিবার সকাল থেকে অধিকাংশ পোশাক কারখানায় শ্রমিকরা কাজে যোগ দেন। ঢাকা রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলসহ (ডিইপিজেড) বিভিন্ন কারখানায় শুরু হয়েছে উৎপাদন কার্যক্রম। তবে গাজীপুরে শ্রমিক তৌফিক হোসেনের মৃত্যুর প্রতিবাদে আশুলিয়ায় বিক্ষোভ মিছিল ও কয়েকটি স্থানে বিচ্ছিন্ন উত্তেজনার ঘটনা ঘটেছে। পরিস্থিতি বিবেচনায় শিল্পাঞ্চলের ৭০টি কারখানায় বৃহস্পতিবারের জন্য সাময়িক ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। শিল্পাঞ্চলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে বিজিবি, শিল্প পুলিশ ও থানা পুলিশের টহল জোরদার করা হয়েছে। পাশাপাশি মোতায়েন রয়েছে পাঁচ প্লাটুন বিজিবি। নয়জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের সমন্বয়ে ভ্রাম্যমাণ আদালতের কার্যক্রমও চলছে। সকাল থেকেই সাভার, আশুলিয়ার বিভিন্ন শিল্পকারখানায় শ্রমিকদের কাজে যোগ দিতে দেখা যায়। কেউ কারখানার নিজস্ব পরিবহনে, আবার কেউ পায়ে হেঁটে কর্মস্থলে আসেন। ডিইপিজেডসহ অধিকাংশ কারখানার সামনে শ্রমিকদের স্বাভাবিক উপস্থিতি ছিল।
তবে নরসিংহপুর, নিশ্চিন্তপুর, জামগড়া, সরকার মার্কেট, জিরাবো ও কাঠগড়াসহ কয়েকটি এলাকার কারখানায় শ্রমিকরা সকালে প্রবেশ করলেও পরে উৎপাদন কার্যক্রমে অংশ না নিয়ে বেরিয়ে যান। পরিস্থিতি বিবেচনায় সংশ্লিষ্ট কারখানাগুলোতে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করে কর্তৃপক্ষ।
এদিকে গাজীপুরে শ্রমিক আন্দোলন চলাকালে সংঘর্ষে আহত হয়ে পোশাকশ্রমিক তৌফিক হোসেনের মৃত্যুর প্রতিবাদে বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে আশুলিয়ার জিরাবো এলাকায় বিক্ষোভ মিছিল করেন বিভিন্ন কারখানার শ্রমিকরা। বিভিন্ন স্থান থেকে আসা প্রায় দুই থেকে আড়াই হাজার শ্রমিক মিছিলে অংশ নেন। মিছিলটি জিরাবো থেকে শুরু হয়ে ঘোষবাগ, নরসিংহপুর ও সরকার মার্কেট ঘুরে বেরন এলাকার এনভয় গার্মেন্টসের সামনে গিয়ে শান্তিপূর্ণভাবে শেষ হয়। এর আগে সকাল সাড়ে ৯টার দিকে জামগড়া এলাকার কয়েকটি কারখানার শ্রমিকরা কাজ না করে বাইরে বেরিয়ে আসেন। একপর্যায়ে তারা আশপাশের কারখানার শ্রমিকদেরও কাজে যোগ না দেয়ার আহ্বান জানান এবং কয়েকটি কারখানায় ইটপাটকেল নিক্ষেপ করেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নেয়ার চেষ্টা করলে পুলিশের সঙ্গে উত্তেজনা তৈরি হয়। বিক্ষোভকারীদের হামলায় পুলিশের একটি গাড়ি ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। পরে পুলিশ সাউন্ড গ্রেনেড ও কাঁদানে গ্যাসের শেল নিক্ষেপ করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন।
আশুলিয়া শিল্প পুলিশ-১-এর পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মোমিনুল ইসলাম ভূঁইয়া জানান, তাদের আওতাধীন ১ হাজার ৮৬৩টি কারখানার মধ্যে ৭০টি বৃহস্পতিবার সাময়িকভাবে বন্ধ রয়েছে। বাকি কারখানাগুলোতে শান্তিপূর্ণভাবে উৎপাদন চলছে। তিনি বলেন, গাজীপুরে শ্রমিক তৌফিক হোসেনের মৃত্যুর প্রতিবাদে জিরাবো এলাকায় দুই থেকে আড়াই হাজার শ্রমিক শান্তিপূর্ণ মিছিল করেন। তবে জামগড়ায় কয়েকটি কারখানার শ্রমিকদের ঘিরে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। এরপর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা হয়। তিনি আরও বলেন, শ্রমিকরা কাজ করতে চান। তবে বহিরাগত দুষ্কৃতকারীরা বিভিন্নভাবে তাদের কাজে বাধা দেয়ার চেষ্টা করছে এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উস্কানিমূলক প্রচার চালাচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
অন্যদিকে শ্রমিক আন্দোলনে উস্কানি দেয়ার অভিযোগে সাভার ও আশুলিয়ায় এ পর্যন্ত আটটি মামলা হয়েছে বলে জানিয়েছেন ঢাকা জেলা পুলিশ সুপার শামীমা পারভীন। বৃহস্পতিবার বিকালে সাভারের আল-মুসলিম গার্মেন্টস পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের তিনি জানান, সাভার মডেল থানায় দু’টি এবং আশুলিয়া থানায় ছয়টি মামলা দায়ের হয়েছে। এসব মামলায় এখন পর্যন্ত ৩০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বাকি আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে। এ ছাড়া আরও কয়েকটি মামলা দায়েরের প্রক্রিয়া চলছে। এ সময় ঢাকা রেঞ্জের ডিআইজি মুস্তাফিজুর রহমান বলেন, বৃহস্পতিবার শিল্পাঞ্চলের পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে। কোথাও অপ্রীতিকর ঘটনার খবর পাওয়া যায়নি।
