জাতিসংঘের জলবায়ু সম্মেলন কপ-৩১ এ যোগ দিতে আগামী ১০ই নভেম্বর তুরস্কে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সফরকালে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোগান, অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি আলবানিজ এবং চীনের ভাইস প্রেসিডেন্ট হান ঝেংয়ের সঙ্গে তার দ্বিপক্ষীয় বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। ঢাকা ও আঙ্কারার কূটনৈতিক সূত্র এ তথ্য নিশ্চিত করেছে। সূত্র বলছে, এই বৈঠকগুলো ১২ই নভেম্বর হওয়ার কথা।
সম্মেলনের মূল পর্ব লিডারশিপ সামিট। যেখানে এবার প্রায় বিশ্বের ৮০টি দেশের রাষ্ট্রপ্রধান ও তাদের প্রতিনিধিরা অংশ নিচ্ছেন। লিডারশিপ সামিট অনুষ্ঠিত হবে ১১ই নভেম্বর। এতে অংশ নিয়ে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় সরকারের উদ্যোগ ও পরিকল্পনা তুলে ধরবেন।
সূত্র জানায়, সম্মেলনের বিভিন্ন পর্বে অংশগ্রহণের পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রী বেশ কয়েকটি রাউন্ড টেবিল বৈঠকেও যোগ দেবেন। এর ফাঁকে তিন দেশের শীর্ষ পর্যায়ের প্রতিনিধিদের সঙ্গে পৃথক বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। এসব বৈঠকে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের বিভিন্ন বিষয় গুরুত্ব পাবে। প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গী হচ্ছেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনমন্ত্রী আব্দুল আউয়াল মিন্টু। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জলবায়ু উইংয়ের কর্মকর্তারাও এই সম্মেলনে যোগ দিচ্ছেন।
এ ছাড়া সফরসঙ্গী হিসেবে আরও গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী থাকবেন। তবে এ বিষয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানানো হয়নি। এদিকে কূটনৈতিক সূত্র জানিয়েছে, কপ-৩১ সম্মেলনে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান যোগ দেবেন। তিনি জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের প্রেসিডেন্ট হিসেবে সম্মেলনে ভূমিকা রাখবেন। তার পরিবর্তে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্ব দিবেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির।
জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বেড়ে যাওয়া, ঘূর্ণিঝড়, বন্যা ও অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগ বাংলাদেশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এমন প্রেক্ষাপটে কপ-৩১ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর অংশগ্রহণকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। সম্মেলনে জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বাংলাদেশের অবস্থান ও সরকারের নেয়া উদ্যোগগুলো তুলে ধরবেন তিনি।
জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতি মোকাবিলায় জাতিসংঘের আওতায় থাকা বৈশ্বিক তহবিল থেকে অর্থপ্রাপ্তির প্রক্রিয়া সহজ করার আহ্বান আগেই জানিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী। জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর জন্য এই অর্থায়ন আরও সহজলভ্য করার বিষয়টি সম্মেলনে তুলে ধরবেন তিনি। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় উন্নত দেশগুলোর প্রতিশ্রুত অর্থ দ্রুত ও সহজে পাওয়ার ওপর গুরুত্ব দেবে ঢাকা।
তারেক-এরদোগান বৈঠকে গুরুত্ব পাবে যেসব বিষয়: ২০২৪ সালের ৫ই আগস্ট সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পতনের পর বাংলাদেশ-তুরস্কের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় দুই দেশের সম্পর্ক জোরদারে নানা উদ্যোগ শুরু হয়। যা এখনো চলমান। আন্তর্জাতিক ফোরামে ঢাকা-আঙ্কারা সম্পর্ক আগের তুলনায় আরও বেশি জোরালো হয়েছে। জাতিসংঘসহ বিশ্বের নানা বহুপক্ষীয় ফোরামে দুই দেশের অবস্থান অনেকাংশেই অভিন্ন থাকে। তারেক রহমান নেতৃত্বাধীন সরকার, বিরোধী দল এবং তরুণদের জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ (এনসিপি) অন্যান্য দলের সঙ্গে রাজনৈতিক যোগাযোগ বৃদ্ধি করছে এরদোগান প্রশাসন।
গত বছর ঢাকায় দুই দেশের পররাষ্ট্র সচিব পর্যায়ে রাজনৈতিক পরামর্শ সভা অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে দুই দেশের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ কিছু সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। শেখ হাসিনার আমলে তুরস্কের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা শুরু করে বাংলাদেশ। সে সময় নজরদারি ড্রোন, রকেট ব্যবস্থা, সাঁজোয়া যান ও রাডার কেনা হয়। তবে এখন এই সম্পর্ক কেবল অস্ত্র কেনায় আটকে নেই। যৌথভাবে সামরিক সরঞ্জাম উৎপাদনেও দুই দেশের আলোচনা বহুদূর এগিয়েছে। গত জুনে তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদানের ঢাকা সফরে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা জোরদারের বিষয়ে আলোচনা হয়। দুই দেশ প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্রবিষয়ক মন্ত্রী পর্যায়ের যৌথ কমিটি গঠনের সিদ্ধান্তও নেয়। সে সময় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ফিদানের বৈঠক হয়। সেখানে দুই দেশের মধ্যে পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষামন্ত্রীদের অংশগ্রহণে নিয়মিত ২+২ আলোচনা চালুর উদ্যোগ নেয়। এ ছাড়া রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সহযোগিতার জন্য যৌথ পরামর্শ কাঠামো গঠনের সিদ্ধান্ত নেয় ঢাকা-আঙ্কারা।
কূটনৈতিক সূত্র বলছে, এরদোগানের সঙ্গে তারেক রহমানের এবারের বৈঠকে এসব বিষয় এগিয়ে নেয়ার বিষয়ে আলোচনা হতে পারে। ক্ষমতায় আসার পর এটাই তারেক রহমানের সঙ্গে তুর্কি প্রেসিডেন্টের প্রথম সাক্ষাৎ নয়। গত ২৩শে সেপ্টেম্বর নিউ ইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে তারেক রহমানের সঙ্গে এরদোগানের বৈঠক হয়। বৈঠকে দুই নেতা বাণিজ্য, বিনিয়োগ, প্রতিরক্ষা সহযোগিতা এবং অর্থনৈতিক সম্পর্ক সম্প্রসারণ নিয়ে আলোচনা করেন। এরদোগান তারেক রহমানকে তুরস্ক সফরের আমন্ত্রণও জানান। এবারের বৈঠকে রোহিঙ্গা ইস্যুতে দুই নেতার মধ্যে আলোচনার কথা রয়েছে।
কপ-৩১ সম্মেলন ৯ থেকে ২০ নভেম্বর: এবারের জাতিসংঘ জলবায়ু সম্মেলন কপ-৩১ আগামী ৯ই নভেম্বর থেকে ২০শে নভেম্বর পর্যন্ত তুরস্কের আনতালিয়ায় অনুষ্ঠিত হবে। জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক ফ্রেমওয়ার্ক কনভেনশনের (ইউএনএফসিসিসি) অধীনে আয়োজিত এই সম্মেলনে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সরকারপ্রধান, রাষ্ট্রপ্রধান, মন্ত্রী, কূটনীতিক, জলবায়ু বিশেষজ্ঞ ও উন্নয়ন সহযোগী সংস্থার প্রতিনিধিরা অংশ নেবেন। ১১ ও ১২ই নভেম্বর অনুষ্ঠিত হবে বিশ্বনেতাদের শীর্ষ সম্মেলন। এবারের সম্মেলনে জলবায়ু অর্থায়ন, অভিযোজন, জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলা এবং বৈশ্বিক উষ্ণতা নিয়ন্ত্রণে প্যারিস চুক্তির লক্ষ্য বাস্তবায়নের বিষয়গুলো গুরুত্ব পাবে। ১২ই নভেম্বর দ্বিপক্ষীয় বৈঠক শেষে তুরস্ক ছাড়ার কথা প্রধানমন্ত্রীর।
