মামুনুল হক প্রসঙ্গে ওলিপুরীর সেই চিঠি

ফন্ট সাইজ:

আকিদাগত বিরোধ কেবল সিলেটের খাদিমুল কোরআন পরিষদের মাহফিলকে কেন্দ্র করে শুরু হয়নি। এই বিরোধ কয়েক মাস ধরেই চলমান। ভার্চ্যুয়াল দুনিয়ায় চলছে তর্ক-বিতর্ক। আল্লামা নুরুল ইসলাম ওলিপুরী। সিলেট অঞ্চলের কওমি অঙ্গনের নীতিনির্ধারক পর্যায়ের এক প্রখ্যাত আলেম। রাজনীতি করেন না তিনি। সেটি তিনি ওয়াজ মাহফিলেই পরিষ্কার করেছেন। মাওলানা মামুনুল হক। বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমীর।

পিতার সূত্র ধরে সিলেট অঞ্চলের উলামাদের মধ্যে রয়েছে তার এবং শায়খুল হাদিস পরিবারের আলাদা আধিপত্য। এবারের আলোচনা শুরু সিলেটের খাদিমুল কোরআন পরিষদ আয়োজিত তিন দিনব্যাপী ওয়াজ মাহফিলকে ঘিরে। এ মাহফিলে বয়ান দেয়ার কথা মাওলানা মামুনুল হকের। তবে মাহফিলটি গত ৩২ বছর ধরে আবর্তিত হচ্ছে আল্লামা নুরুল ইসলাম ওলিপুরীকে কেন্দ্র করে। প্রতি বছর মাহফিলে তিনদিনই তাফসির পেশ করেন ওলিপুরী। এবারের মাহফিলের আয়োজনের পূর্বে আল্লামা নুরুল ইসলাম ওলিপুরী বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমীর মাওলানা মামুনুল হকের অতীত কর্মকাণ্ডের বিষয়গুলো তুলে ধরে মুরব্বিদের কাছে উত্তর জানতে চেয়েছেন। এ সংক্রান্ত একটি চিঠিও তিনি দিয়েছেন। খাদিমুল কোরআন পরিষদ সিলেটের সভাপতির কাছে তিনি যে চিঠি পাঠিয়েছেন সেই চিঠি মাওলানা মামুনুল হকের নিজের ঘোষিত তিন মুরব্বির কাছেও তিনি পাঠিয়েছেন।

এই তিন মুরব্বি হচ্ছেন- মিরপুরের মাদ্রাসা দারুর রাশাদের শিক্ষা সচিব মাওলানা লিয়াকত আলী, গাজীপুরের অধ্যক্ষ শাহ মুহাম্মদ মিজানুর রহমান চৌধুরী (দেওনার পীর) ও বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া বাংলাদেশের মহাসচিব মাওলানা মাহফুজুল হক। এখন আলোচনায় সেই চিঠি। কী আছে সেই চিঠিতে? ৬ পৃষ্ঠার সেই চিঠিতে নানা বিষয় তুলে ধরে দেয়া হয়েছে। আল্লামা ওলিপুরী চিঠিতে উল্লেখ করেন, মাওলানা মামুনুল হকের এক বক্তব্যে চার মাজহাব (হানাফি, মালেকি, শাফেয়ি ও হাম্বলি) এবং সালাফি ও মওদুদীবাদের আকিদার মধ্যে তেমন কোনো পার্থক্য নেই বলে উল্লেখ করার বিষয়টি চ্যালেঞ্জ করেছেন ওলিপুরী। তার বক্তব্য, চার মাজহাবের আকিদার সঙ্গে সালাফি ও মওদুদীবাদীদের আকিদার মৌলিক ও ব্যাপক পার্থক্য রয়েছে। কওমি অঙ্গনের শীর্ষ আলেম হিসেবে মামুনুল হকের এমন মন্তব্য সাধারণ আলেম ও শিক্ষার্থীদের মওদুদীবাদ ও সালাফিবাদের দিকে ধাবিত করতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি। নির্বাচনী প্রচারে ‘মওদুদীবাদের’ দলীয় প্রতীক দাঁড়িপাল্লাকে ইনসাফ ও ওলামায়ে কেরামের প্রতীক হিসেবে আখ্যা দেওয়ার সমালোচনা করেন ওলিপুরী। তিনি প্রশ্ন তোলেন, যেসব দল আকাবির, সাহাবা ও সালাফদের সঙ্গে বে-ইনসাফি করেছে, তাদের প্রতীক কীভাবে আলেমদের মার্কা হতে পারে।

উল্লেখ্য, দাঁড়িপাল্লা বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নির্বাচনী প্রতীক। মাওলানা মামুনুল হক কর্তৃক দেওবন্দি ও হানাফিদের আকিদা সংশোধনের আহ্বানকে অনভিপ্রেত এবং শত বছরের ঐতিহ্যের ওপর আঘাত হিসেবে চিহ্নিত করেন ওলিপুরী। মওদুদীবাদীদের সঙ্গে মামুনুল হকের রাজনৈতিক ঐক্যকে হজরত শাইখুল হিন্দ (রহ.)-এর কংগ্রেসের সঙ্গে ঐক্যের নজির হিসেবে উপস্থাপনকে বিভ্রান্তিকর বলে দাবি করেন ওলিপুরী। চিঠিতে আরও উল্লেখ করা হয়, মাওলানা মামুনুল হকের পিতা শায়খুল হাদিস মাওলানা আজিজুল হক (রহ.) বুখারি শরিফের ব্যাখ্যাগ্রন্থে মওদুদীর বিভিন্ন বিভ্রান্তির দলিলভিত্তিক খণ্ডন করে গেছেন। এখানে মওদুদীবাদী বলতে ওলিপুরী জামায়াতে ইসলামীকে বুঝিয়েছেন। জিহাদকে মূল আকিদা হিসেবে উপস্থাপন এবং ‘আকিদাতুল জিহাদিয়া’ পরিভাষা ব্যবহারের শাস্ত্রীয় ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন ওলিপুরী। একইসঙ্গে দেওবন্দি আকিদার সঠিক ব্যাখ্যার দাবি জানান তিনি।

এদিকে আল্লামা নুরুল ইসলাম ওলিপুরীর সেই চিঠি নিয়ে কওমি অঙ্গনে চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ। এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও কর্মী-সমর্থকরা সরব। চিঠি ভাসছে নেট দুনিয়ায়ও। পক্ষে-বিপক্ষে মতামতও আসছে। এ নিয়ে বিব্রত কওমি অঙ্গনের মুরব্বিরাও। তবে চিঠির প্রসঙ্গে তিন মুরব্বিই গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, তারা বিষয়টি নিয়ে আলোচনা চালাচ্ছেন। সরাসরি বসে আলোচনা হলে এ নিয়ে অনেক বিভ্রান্তি দূর হবে। সে পথেই তারা হাঁটছেন বলে জানিয়েছেন।