অস্ত্র মামলায় দশ বছরের সাজাপ্রাপ্ত আসামি মো. আলমাছ নিরাপদে কানাডা চলে গেছেন। বিচারের শুরু থেকেই তিনি পলাতক। তার পরিবর্তে ১০ মাস ধরে কারাভোগ করছেন মো. আলমাস নামের এক নিরপরাধ ব্যক্তি। হাইকোর্টের নির্দেশে গঠিত অনুসন্ধান কমিটির প্রতিবেদনে এই তথ্য উঠে এসেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঢাকা জেলার দোহারের কুসুমহাটির অধিবাসী শেখ খলিলের পুত্র মো. আলমাস অস্ত্র মামলার প্রকৃত আসামি নন। এই মামলার সাজাপ্রাপ্ত আসামি হলেন দোহারের নয়াবাড়ী ইউনিয়নের পূর্ব ধোয়াইর গ্রামের মো. খলিলুর রহমানের পুত্র মো. আলমাছ। যিনি ঢাকার মিরপুর থানার অস্ত্র আইনের মামলার দশ বছরের সাজাপ্রাপ্ত আসামি। কারাগারে থাকা আলমাস আর কানাডায় অবস্থান করা দন্ডিত আলমাছ দুজন সম্পূর্ণ ভিন্ন ব্যক্তি। বিচারপতি জে বি এম হাসান ও বিচারপতি আজিজ আহমদ ভূঞার দ্বৈত হাইকোর্ট বেঞ্চে বৃহস্পতিবার এই প্রতিবেদন দাখিল করা হয়। আদালত রবিবার এ বিষয়ে আদেশের জন্য দিন ধার্য করেছেন বলে জানিয়েছেন সহকারি অ্যার্টনি জেনারেল ব্যারিস্টার মহিউদ্দীন মো. হানিফ।
আসামি না হয়েও অস্ত্র মামলায় তাকে দশ বছরের দন্ডিত হিসেবে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। পরে তাকে কারাগারে পাঠানো হয়। এ বিষয়ে আইনি প্রতিকার চেয়ে হাইকোর্টে আবেদন করেন নিরাপরাধ মো. আলমাস। ওই রিটের প্রাথমিক শুনানি নিয়ে ঘটনার বিষয়ে বিচারিক অনুসন্ধানের নির্দেশ দেয় হাইকোর্ট। ওই নির্দেশনা মোতাবেক সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মাহফুজুর রহমান ঘটনার অনুসন্ধান করে হাইকোর্টে প্রতিবেদন দাখিল করেন।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মূল মামলায় আসামিকে আদালতে প্রেরণের ফরোয়াডিং, পুলিশ প্রতিবেদন এবং আদালত থেকে সাজা হওয়ার পরে প্রেরিত গ্রেফতারি পরোয়ানায় আসামির ঠিকানা ভুল ছিল মর্মে প্রতীয়মান হয়। প্রকৃত দন্ডপ্রাপ্ত আসামি মোঃ আলমাছের পিতামহ এবং গ্রেফতার হওয়া মোঃ আলমাসের পিতামহের নামে অমিল রয়েছে। গ্রেফতার হওয়া মোঃ আলমাসের পিতা শেখ খলিলের জাতীয় পরিচয়পত্র পর্যালোচনায় দেখা যায়, শেখ খলিলের পিতার নাম শেখ নওয়াব আলী। অর্থ্যাৎ গ্রেফতার হওয়া আসামি মোঃ আলমাসের পিতামহের নাম ‘শেখ নওয়াব আলী’। অন্যদিকে দন্ডপ্রাপ্ত মোঃ আলমাছের পিতার নাম এজাহার অনুসারে ‘খলিল আহম্মেদ’। যদিও উক্ত খলিল আহম্মেদ এর কোনো পরিচয়পত্র পাওয়া যায়নি।
নিরাপরাধ আলমাসের গ্রেপ্তার হওয়ার পেছনে তিনটি বিষয় রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, গ্রেফতারকৃত মো. আলমাস সপরিবারে ২০০৭ সালের আগে দক্ষিণ বাহ্রা ডাকঘরের অধীন বাহ্রা গ্রামে বসবাস করতেন। অপরদিকে প্রকৃত আসামির গ্রাম পূর্ব ধোয়াইরও একই ডাকঘরের অধীন। ফলে ডাকঘরের নামে পরিচয় দেওয়ার প্রচলনের কারণে দুজনের ঠিকানা এক হয়ে যায়। উভয়ের পিতার নামে অনেকাংশে মিল ছিল। এই নামের সাদৃশ্য পরিচয় নির্ধারণে বিভ্রান্তি বাড়িয়েছে। দন্ডিত মো. আলমাছের ঠিকানা ভুলক্রমে “পূর্ব ধোয়াইর”-এর স্থলে “দক্ষিণ বাহ্রা” লেখা হয়, যা পরবর্তী নথিতেও বহাল থাকে। এবং মামলার রায় শেষে গ্রেফতারি পরোয়ানাতেও আসামী মোঃ আলমাছের ঠিকানা ‘পূর্ব ধোয়াইর’ এর পরিবর্তে ‘দক্ষিণ বাহ্রা’ লেখা হয়ে যায়।
অনুসন্ধান প্রতিবেদনের সার্বিক আলোচনা ও বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, সাক্ষীদের জবানবন্দি ও নথিপত্র পর্যালোচনায় প্রতীয়মান হয় যে, প্রকৃত আসামি মোঃ আলমাছের এবং গ্রেফতার হওয়া মোঃ আলমাসের পিতৃপরিচয় মেলে না। প্রকৃত আসামি মোঃ আলমাছের পিতা খলিলুর রহমান/ মোঃ আবুল খায়ের (খলিল), আর গ্রেফতার হওয়া মোঃ আলমাসের পিতা শেখ খলিল। দুজনের পিতামহও ভিন্ন, প্রকৃত আসামি মোঃ আলমাছের পিতামহের নাম শেখ শহর আলী আর গ্রেফতার হওয়া মোঃ আলমাসের পিতামহের নাম শেখ নওয়াব আলী। দুই পরিবারের ভাইবোনের তালিকায়ও একটি নামও মেলে না। প্রকৃত আসামি মোঃ আলমাছের তিন বোনের একমাত্র ভাই, আর গ্রেফতার হওয়া মোঃ আলমাসের আছে দুই ভাই ও দুই বোন। এক নামের আড়ালে দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন বংশের পরিচয় লুকিয়ে ছিল।
দ্বিতীয়ত, ঠিকানার গরমিল আসলে একটি লেখার ভুল।
তবে এটি পরিষ্কার যে গ্রেফতার হওয়া মোঃ আলমাসের গ্রাম বর্তমানে সুন্দরীপাড়া এবং ২০০৭ সনের আগে ‘বাহ্রা’ ছিল। অন্যদিকে প্রকৃত দন্ডপ্রাপ্ত আসামির গ্রাম সব সময়ই ‘পূর্ব ধোয়াইর’ ছিল। তৃতীয়ত, ২০০২ সালে সাজাপ্রাপ্ত মোঃ আলমাছের বয়স ছিল ২৪, সেই হিসাবে ২০২৬ সালে তাঁর বয়স হওয়ার কথা প্রায় ৪৮। অথচ গ্রেফতারকৃত মোঃ আলমাসের জন্মতারিখ ১৯৮৫ সালের ১০ ডিসেম্বর। সেই হিসেবে তার বর্তমান বয়স ৪১ বছর, অর্থাৎ ২০০২ সালে তিনি ছিলেন প্রায় ১৭ বছরের। বয়সের ব্যবধান প্রায় ৭ বছরে। এটি উপেক্ষা করার মতো নয়।
চতুর্থত, জীবনযাপনের ধরনেও অমিল আছে। মামলার মূল আসামি মিরপুরের পাইকপাড়ায় থাকতেন। তার কোনো পেশা ছিল মর্মে মিরপুর থানার মামলার তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ নেই। আর গ্রেফতার হওয়া মোঃ আলমাস বাহ্রা ও পরে সুন্দরীপাড়ায় কৃষিকাজ করে এবং ইলেকট্রিকের কাজ করে জীবন চালিয়েছেন। পঞ্চমত, প্রকৃত আসামির ঠিকানা ওকালতনামায় ও হাইকোর্টের জামিন আদেশে ‘পূর্ব ধোয়াইর’ উল্লেখ আছে, যা গ্রেফতার হওয়া মোঃ আলমাসের গ্রাম নয়।
