মিশিগানে প্রথম মুসলিম সিনেটর নির্বাচিত আবদুল আল-সায়েদের বিজয় যুক্তরাষ্ট্রের মুসলিমদের জন্য একটি যুগান্তকারী এবং একই সঙ্গে জটিল মুহূর্ত। তার জয়ে উচ্ছ্বসিত মুসলিম সম্প্রদায়। বিশে^র বিভিন্ন দেশে এ সম্প্রদায়ের মধ্যে আলোড়ন দেখা গেছে। বিশেষ করে গাজার নির্যাতিত মুসলিমরা তার জয়ে উল্লাস প্রকাশ করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় রাজনীতিতে এই সম্প্রদায়ের ক্রমবর্ধমান প্রভাবকে এ জয় আরও সুসংহত করেছে। তবে একই সময়ে বিভিন্ন মহলে ইসলামবিদ্বেষও বাড়ছে। এর বিরুদ্ধে যে প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে, তা সম্ভবত তার নির্বাচনী সাফল্যে অবদান রেখেছে। অনলাইন নিউইয়র্ক টাইমসে এ নিয়ে প্রতিবেদন লিখেছেন সাংবাদিক এলিজাবেথ ডায়াস। তিনি দ্য নিউইয়র্ক টাইমসের জাতীয় ধর্মবিষয়ক সংবাদদাতা। ২০১০ সাল থেকে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনে ধর্মের ভূমিকা নিয়ে প্রতিবেদন লিখেছেন। তিনি আল সায়েদের বিজয় নিয়ে লিখেছেন, মিশিগানের ডিয়ারবর্নের একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে মঙ্গলবার জীবনে প্রথমবারের মতো ভোট দিয়েছেন ১৮ বছর বয়সী কারার আল-সাদখান। তিনি তার রাজ্যের পরবর্তী সিনেটর নির্বাচিত করতে ভোট দিয়েছেন একজন সহমুসলিম প্রার্থীকে। তবে তার পছন্দের প্রার্থী আবদুল আল-সায়েদ মুসলিমবিরোধী ব্যাপক আক্রমণ মোকাবিলা করে যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম মুসলিম সিনেটর নির্বাচিত হলেও আল-সাদখানের কাছে ধর্মীয় পরিচয় এ ক্ষেত্রে খুব একটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল না।
তিনি বলেন, ডেমোক্রেট পক্ষ গ্যাস, স্বাস্থ্যসেবা এবং মুদি পণ্যের দাম নিয়ে বেশি মনোযোগী ছিল। এসব বিষয়ই আমাকে ভোট দিতে উৎসাহিত করেছে। সংবিধান আমাদের নিজেদের পছন্দমতো ধর্ম পালনের স্বাধীনতা দিয়েছে। তবে সংবিধানের প্রতি আমাদের আনুগত্যও রয়েছে। তবে ইলিনয় থেকে মিশিগান, এমনকি ওয়াশিংটন ডিসি পর্যন্ত মুসলিম ভোটারদের সাক্ষাৎকারে দেখা গেছে, তারা আল-সায়েদের বিজয়কে নিজেদের ধর্মীয় পরিচয়ের সঙ্গে মিল থাকার কারণে তাৎপর্যপূর্ণ মনে করছেন না। বরং তাদের অনেকের কাছে মিশরীয় অভিবাসীদের সন্তান আল-সায়েদ মূলত কোনো ধর্মীয় প্রতীক নন। তারা তাকে দেশজুড়ে গড়ে ওঠা প্রগতিশীল ডেমোক্রেট জোটের অংশ হিসেবে দেখছেন। এই জোট জীবনযাত্রার ব্যয় সাশ্রয়, সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা এবং ইসরাইলকে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থায়ন বন্ধ করার মতো বিষয়গুলোকে অগ্রাধিকার দেয়।
ডিয়ারবর্নে আল-সায়েদকে ভোট দেয়া ২৩ বছর বয়সী কলেজ শিক্ষার্থী মোহাম্মদ সাব বলেন, আমাদের দেশ ইসলামভিত্তিক রাষ্ট্র নয়। এটি একটি ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র। আমরা চাই, দেশটি সেভাবেই থাকুক। নির্বাচনী প্রচারণায় আল-সায়েদ যুক্তরাষ্ট্রে আধুনিক ধর্মীয় উগ্রবাদ দেখতে কেমন, সে সম্পর্কে প্রচলিত ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করার চেষ্টা করেছেন। তিনি উল্লেখ করেছেন, রক্ষণশীল খ্রিষ্টান আইনপ্রণেতারা রাষ্ট্র ও ধর্মের পৃথকীকরণ ভেঙে দেয়ার জন্য সুস্পষ্ট উদ্যোগ নিয়েছেন। দুই সপ্তাহ আগে এক টাউন হল বৈঠকে এক তরুণ আল-সায়েদকে চ্যালেঞ্জ করেন। তিনি তাকে একটি ইসলামপন্থী রাজনৈতিক সংগঠন মুসলিম ব্রাদারহুডের নিন্দা জানাতে বলেন। আল-সায়েদ তা করেন। নিজেকে খ্রিষ্টান হিসেবে পরিচয় দেয়া ওই তরুণকে তিনি প্রশ্ন করেন, তিনি কি যুক্তরাষ্ট্রের আইনে কোনো ধর্মীয় মতবাদ অন্তর্ভুক্ত করার ‘যেকোনো প্রচেষ্টার’ নিন্দা জানাবেন? তরুণটি আগে রক্ষণশীল রিপাবলিকান সিনেটর যশ হাওলির হয়ে কাজ করেছিলেন। তিনি জানান, এমন নিন্দা জানাবেন না। আল-সায়েদ জবাব দেন, আমার নয়, বরং আপনারই সংবিধান বোঝা প্রয়োজন বলে মনে করি। এ সময় হলজুড়ে করতালি ও উল্লাস শুরু হয়।
মঙ্গলবার ওয়াশিংটনে ৬৫ বছর বয়সী নেসরিন আবাজা তার ফিলিস্তিনি রেস্তোরাঁয় ‘আই ভোটেড’ (আমি ভোট দিয়েছি) স্টিকার দেখানো যে কাউকে বিনামূল্যে কফি দিচ্ছিলেন। আল-সায়েদের ধর্মীয় পরিচয় নিয়ে আলোচনা করাকে তিনি ‘হাস্যকর’ বলে অভিহিত করেন। বরং তিনি আল-সায়েদকে নিউইয়র্কের প্রতিনিধি আলেকজান্দ্রিয়া ওকাসিও-কর্টেজ এবং মঙ্গলবার টেক্সাসের সিনেট নির্বাচনে জয়ী জেমস তালারিকোর মতো উদীয়মান তরুণ ডেমোক্রেটদের অংশ হিসেবে দেখেন আবাজা বলেন, আমি একটি নতুন ডেমোক্রেটিক আন্দোলনকে সমর্থন করি। মানুষ আমাদের কথা শুনছে না। এতে আমরা ক্লান্ত। ইলিনয়ের স্কোকিতে ২৮ বছর বয়সী বুশরা আমিওয়ালা বলেন, আল-সায়েদ তার মতো মুসলিম- এ বিষয়টি কিংবা ইসরাইলের সমালোচনা নিয়ে তিনি ভাবেননি। বরং শহরের নির্বাচিত স্কুল বোর্ড সদস্য হিসেবে তিনি আশা করেন, আল-সায়েদ নারীদের প্রজনন অধিকার রক্ষা এবং স্থানীয় স্কুলগুলোতে বিনিয়োগের মতো অভিন্ন মূল্যবোধের পক্ষে কথা বলবেন। তিনি বলেন, রাজনীতি থেকে অর্থ সরানো, মানুষের পকেটে অর্থ রাখা এবং সবার জন্য মেডিকেয়ার- সত্যি বলতে, আবদুলকে আমি শুধু এসব কথাই বলতে শুনি।
আল-সায়েদের প্রতি সমর্থন গত বছর নিউইয়র্কবাসী জোহরান মামদানিকে শহরের প্রথম মুসলিম মেয়র এবং যুক্তরাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ের মুসলিম নির্বাহী হিসেবে নির্বাচিত করার পর থেকেই বাড়ছিল। মুসলিম সমর্থকরা সেই ডেমোক্রেট জোটের অংশ ছিলেন, যারা আল-সায়েদ ও মামদানি উভয়কে বিজয়ী হতে সহায়তা করেছেন। তবে সামগ্রিকভাবে ডেমোক্রেট পার্টি ক্রমেই ধর্মীয় পরিচয়হীন মানুষের দলে পরিণত হচ্ছে। একই সঙ্গে দলটির খ্রিষ্টান সদস্যের সংখ্যাও কমছে। আল-সায়েদ এই পরিবর্তিত জনতাত্ত্বিক পরিস্থিতির বিভিন্ন অংশের ভোটারদের আকৃষ্ট করার চেষ্টা করেছেন। প্রচারণার শেষ দিকে তিনি একটি বিজ্ঞাপন প্রকাশ করেন। সেখানে নিজেকে মুসলিম হিসেবে নয়, বরং বিশ্বাসী মানুষ হিসেবে তুলে ধরেন। তিনি উল্লেখ করেন, তার নামের অর্থ ‘সেবক’ এবং তিনি প্রতিদিন প্রার্থনা করেন। পুরো নির্বাচনী প্রচারণায় রিপাবলিকানরা আল-সায়েদের বিরুদ্ধে বর্ণবাদী ও মুসলিমবিরোধী আক্রমণ চালিয়েছেন। তার রিপাবলিকান প্রতিদ্বন্দ্বী, সাবেক প্রতিনিধি মাইক রজার্স তার মায়ের সঙ্গে আল-কায়েদার সম্পর্ক রয়েছে বলে অভিযোগ তোলার চেষ্টা করেন। প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প তাকে ‘হিংস্র, সহিংস জিহাদি’ বলে আখ্যায়িত করেন। তিনি দাবি করেন, আল-সায়েদ জয়ী হলে যুক্তরাষ্ট্রে জিহাদিদের ঢল নামবে। পাশাপাশি তাকে খ্রিষ্টানদের শত্রু হিসেবে বর্ণনা করেন, যিনি বড়দিনের উৎসব বন্ধ করে দেবেন।
এসব আক্রমণ সম্ভবত মুসলিম ভোটারদের মধ্যে আল-সায়েদের সাফল্যে অবদান রেখেছে। ইউনিটি অ্যান্ড জাস্টিস ফান্ডের জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা বাসিম এলকাররা বলেন, এসব আক্রমণ আমাদের আগে কখনো না দেখা মাত্রায় সম্প্রদায়কে সংগঠিত করতে সহায়তা করেছে। এই সংগঠনটি ডেট্রয়েটের মুসলিম ও মধ্যপ্রাচ্যীয় জনগোষ্ঠীর বসবাস বেশি এমন এলাকাগুলোতে আল-সায়েদের পক্ষে ১ লাখ ৩৫ হাজার বাড়িতে প্রচারণা চালিয়েছিল। ভোটারদের কাছে প্রচারণা চালানোর সময় এলকাররা প্রায়ই সাম্প্রতিক কিছু নির্বাচনের উদাহরণ তুলে ধরতেন, যেখানে মুসলিম প্রার্থীরা অল্প ব্যবধানে পরাজিত হয়েছেন। এর মধ্যে গত বছর ইলিনয়ের একটি স্থানীয় নির্বাচনে মাত্র এক ভোটের ব্যবধানে পরাজয়ের ঘটনাও ছিল। তিনি বলেন, গাজা ইস্যুটি আমাদের সম্প্রদায়ের বহু মানুষের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। তিনি উল্লেখ করেন, বিষয়টি অনেক ডেমোক্রেট ভোটারের কাছে গ্রহণযোগ্য হলেও বহু ইহুদি ভোটারকে দূরে সরিয়ে দিয়েছে।
আল-সায়েদের সাফল্য সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্রে ইসলাম সম্পর্কে মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি ১১ সেপ্টেম্বরের হামলার পরের সময়ের তুলনায় এখন আরও নেতিবাচক এবং রাজনৈতিকভাবে বিভক্ত। পিউ রিসার্চ সেন্টারের তথ্য অনুযায়ী, ৭৬ শতাংশ রিপাবলিকান মনে করেন, অন্যান্য ধর্মের তুলনায় ইসলামে সহিংসতাকে উৎসাহিত করার সম্ভাবনা বেশি। ২০০২ সালের শুরুতে এই হার ছিল ৩২ শতাংশ। ডেমোক্রেটদের মধ্যে এই হার ২৩ শতাংশ থেকে বেড়ে ২৯ শতাংশ হয়েছে। টেক্সাসে রিপাবলিকান আইনপ্রণেতারাÑযাদের মধ্যে মঙ্গলবার নির্বাচনে পরাজিত গভর্নর গ্রেগ অ্যাবট এবং অ্যাটর্নি জেনারেল কেন প্যাক্সটনও রয়েছেনÑমুসলিম প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে তদন্ত চালিয়েছেন এবং জনসমক্ষে ইসলাম পালনের ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করেছেন। অথচ একই সময়ে তাদের রাজ্যে সরকারি স্কুলগুলোতে বাইবেল পাঠ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। টেক্সাসের সুগার ল্যান্ডের একটি বড় মসজিদে তালারিকোকে ভোট দেওয়া ৪০ বছর বয়সী অ্যান্ডি নগুয়েন মনে করেন, আল-সায়েদ ও মামদানি সব নাগরিকের কল্যাণে কাজ করতে চান। তিনি আশা করেন, তাদের কর্মকাণ্ড মুসলিমবিরোধী মনোভাব দূর করতে সাহায্য করবে।
২০২৩ সালে ইসলাম গ্রহণ করা পেশায় দন্তচিকিৎসক নগুয়েন বলেন, হয়তো এই দুই ব্যক্তির কারণে মানুষ চোখ খুলতে শুরু করবে এবং তাদের দৃষ্টিভঙ্গি বদলাবে। ৫৩ বছর বয়সী আজার মোহাম্মদ ২০২৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব পান। এ বছরই তিনি প্রথমবার ভোট দিয়েছেন। তিনি ডেমোক্রেটদের পুরো প্যানেলকে ভোট দিয়েছেন, মূলত বাস্তবসম্মত কিছু কারণে। টেক্সাসের রিচার্ডসনে একজন ঠিকাদার হিসেবে কাজ করেন মোহাম্মদ। তার প্রতিষ্ঠানে বেশির ভাগ কর্মী লাতিনো। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের অভিবাসনবিরোধী কঠোর অভিযানের প্রভাব তার কর্মীদের ওপর পড়ায় তিনি হতাশ হয়েছেন। ৩৩ বছর আগে ভারত থেকে যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসী হওয়া মোহাম্মদ বলেন, আমরা এখানে কাজ করতে এসেছি। কর দিয়ে এই দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখি। আমরা কঠোর পরিশ্রম করি। পিউয়ের তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের মোট জনসংখ্যার প্রায় ১ শতাংশ মুসলিম। ঐতিহাসিকভাবে তারা ডেমোক্রেট পার্টির সঙ্গে বেশি সম্পৃক্ত থাকলেও সাম্প্রতিক সময়ে তাদের রাজনৈতিক অবস্থান আরও পরিবর্তনশীল হয়ে উঠেছে। এর একটি উদাহরণ মিশিগানের ২০২৪ সালের নির্বাচন। সে সময় আরব-আমেরিকান ভোটাররা ইসরাইলের প্রতি বাইডেন প্রশাসনের সমর্থন নিয়ে হতাশা প্রকাশ করেন এবং ট্রাম্পকে রাজ্যটিতে বিজয়ী হতে সহায়তা করেন। আটলান্টার উপশহর জর্জিয়ার ক্লার্কস্টনে, যা শরণার্থীদের আশ্রয়স্থল হিসেবে পরিচিত, ৪১ বছর বয়সী লিমুজিন চালক খুশাল গুরবাজ ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ বন্ধের প্রত্যাশায় জন অসফকে ভোট দেন।
তবে তিনি একই সঙ্গে তার রাজ্যের রিপাবলিকান গভর্নর প্রার্থী রিক জ্যাকসনকেও ভোট দেন। তার ধারণা ছিল, ডেমোক্রেট কেইশা ল্যান্স বটমসের তুলনায় জ্যাকসন অপরাধ মোকাবিলায় বেশি দক্ষ হবেন। যদিও শেষ পর্যন্ত বটমসই জয়ী হন।
