পিএসসি সংস্কারসহ ১৩ দফা দাবি শিবিরের

পিএসসি সংস্কারসহ ১৩ দফা দাবি শিবিরের

ফন্ট সাইজ:

জুলাই সনদের প্রস্তাবনা অনুযায়ী সরকারি কর্ম কমিশনের সংস্কার,সরকারি চাকরিতে নিয়োগের স্বচ্ছতা নিশ্চিতকরণ,পুলিশ ভেরিফিকেশনের নামে রাজনৈতিক হয়রানি বন্ধসহ ১৩ দফা দাবি জানিয়েছে ইসলামী ছাত্রশিবির। বুধবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘নির্ভীক জুলাই’ স্মৃতিস্তম্ভের পাদদেশে আয়োজিত এ সংবাদ সম্মেলনে এসব দাবি পেশ করেন সংগঠনের সভাপতি নূরুল ইসলাম।
লিখিত বক্তব্যে শিবির সভাপতি বলেন, ছাত্র-জনতার রক্তক্ষয়ী জুলাই অভ্যুত্থানের প্রধান আকাঙ্ক্ষা ছিল একটি বৈষম্যহীন, মেধাভিত্তিক ও ইনসাফপূর্ণ রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা। রাষ্ট্রের প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে যোগ্যতা, দক্ষতা ও সততার মূল্যায়ন নিশ্চিত করা এবং প্রশাসনকে দলীয় প্রভাবমুক্ত করাই ছিল এই অভ্যুত্থানের অন্যতম দাবি। কিন্তু বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর পিএসসিসহ সাংবিধানিক ও সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানগুলোতে দলীয় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার প্রবণতা, নিয়োগে রাজনৈতিক বিবেচনা এবং পুলিশ ভেরিফিকেশনের নামে চাকরিপ্রার্থীদের হয়রানির অভিযোগ জুলাই অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।
তিনি বলেন, গণভোটে ৬৯ শতাংশ মানুষের রায় ও রাষ্ট্র সংস্কারের আকাঙ্ক্ষাকে উপেক্ষা করে সরকার জুলাই জাতীয় সনদের গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার প্রস্তাব বাস্তবায়নে দৃশ্যমান উদ্যোগ নিচ্ছে না। পিএসসি, ইউজিসি, বিচার বিভাগ, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও মাঠ প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে মেধা ও জ্যেষ্ঠতা উপেক্ষা, ভাইভায় নম্বর বাড়ানোর উদ্যোগ, পুলিশ ভেরিফিকেশনের নামে মেধাবীদের বাদ দেওয়া এবং দলীয় বিবেচনায় নিয়োগের উদ্যোগ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতাকে হুমকির মুখে ফেলছে।
শিবির সভাপতি বলেন, পিএসসিকে প্রকৃত অর্থে স্বাধীন ও দলীয় প্রভাবমুক্ত সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে জুলাই জাতীয় সনদে বিদ্যমান কাঠামো পুনর্গঠন করে সংবিধানের অধীনে তিনটি পৃথক কমিশন গঠনের প্রস্তাব রয়েছে। এসব কমিশনের চেয়ারম্যান ও সদস্য বাছাইয়ে সংসদের সরকারি ও বিরোধী দলের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে বাছাই কমিটি গঠন এবং কমিটির দুই-তৃতীয়াংশ ভোটে প্রত্যেক কমিশনের একজন চেয়ারম্যান ও সাতজন সদস্য নির্বাচনের প্রস্তাব করা হয়েছে। তাঁদের পাঁচ বছরের জন্য নিয়োগের কথাও বলা হয়েছে। অথচ সরকার এখন পর্যন্ত এসব সংস্কার বাস্তবায়নে দৃশ্যমান উদ্যোগ নেয়নি।
এ সময় অন্তর্বর্তী সরকারের সময় অধ্যাপক মোবাশ্বের মোনেমের নেতৃত্বাধীন পিএসসি কমিশনের নেওয়া বিভিন্ন সংস্কার উদ্যোগের প্রশংসা করে সেগুলোর ধারাবাহিকতা বজায় রাখার দাবি জানানো হয়। তবে এসব সংস্কার উদ্যোগের ধারাবাহিকতা বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করে নূরুল ইসলাম বলেন, পাঁচ বছরের জন্য নিয়োগপ্রাপ্ত পিএসসির তৎকালীন চেয়ারম্যান অধ্যাপক মোবাশ্বের মোনেম দুই বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই গত ১৮ আগস্ট পদত্যাগ করেছেন। পরবর্তীতে কমিশনের দুই সদস্য ড. মো. মহিউদ্দিন ও অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ সোহেল রহমানের পদত্যাগ এবং জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর চায়ের আমন্ত্রণের পর কমিশনের সদস্যদের পদত্যাগের ঘটনা প্রতিষ্ঠানটির স্বাধীনতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করেছে।

এ ছাড়া পিএসসির পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক ও তথ্যপ্রযুক্তি শাখার গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ এবং মৌখিক পরীক্ষার নম্বর পুনরায় ১০০ থেকে ২০০ করার উদ্যোগের বিষয়ে উদ্বেগ জানানো হয়। লিখিত বক্তব্যে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়, এসব পদক্ষেপের মাধ্যমে নিয়োগপ্রক্রিয়ায় রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত প্রভাব বিস্তারের সুযোগ তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে ৫০তম বিসিএসের চূড়ান্ত ফলাফল প্রকাশের আগে লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষার নম্বর মূল্যায়ন, ফলাফল প্রস্তুত এবং প্রকাশের প্রতিটি ধাপে সর্বোচ্চ স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবি জানানো হয়।
এ ছাড়া সরকারি চাকরির ১১ থেকে ২০তম গ্রেডের নিয়োগে মৌখিক পরীক্ষার নম্বর বাড়ানোর প্রস্তাবের সমালোচনা করে তিনি বলেন, লিখিত পরীক্ষায় অর্জিত মেধা ও যোগ্যতার গুরুত্ব কমিয়ে মৌখিক পরীক্ষায় অতিরিক্ত নম্বর বরাদ্দ করা হলে দলীয় ও ব্যক্তিগত প্রভাব বিস্তারের সুযোগ বাড়বে। নতুন বিধিমালায় বিভিন্ন গ্রেডে লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষার নম্বরের অনুপাত পরিবর্তনের উদ্যোগও উদ্বেগজনক।
৪৫তম বিসিএসের গেজেটে পিএসসির সুপারিশপ্রাপ্ত ১ হাজার ৮০৭ জনের মধ্য থেকে ৫৬ জনকে এবং ৪৯তম বিশেষ বিসিএসের গেজেটে প্রথম দফায় ৫৭ জন প্রার্থীকে বাদ দেওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করে বলা হয়, পুলিশ ভেরিফিকেশনের নামে সুনির্দিষ্ট আইনি কারণ ছাড়া সুপারিশপ্রাপ্ত প্রার্থীদের বাদ দেওয়া তাঁদের নাগরিক ও সাংবিধানিক অধিকারের পরিপন্থী। পরবর্তীতে আন্দোলনের মুখে পুনঃযাচাই ও কয়েকজনের গেজেট প্রকাশের উদ্যোগ নেওয়া হলেও নিয়োগপ্রক্রিয়ায় এ ধরনের অনিশ্চয়তা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।


সংবাদ সম্মেলনে সরকারের প্রতি ১৩ দফা সুনির্দিষ্ট দাবি উপস্থাপন করা হয়। সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন ছাত্রশিবিরের সেক্রেটারি জেনারেল সিবগাতুল্লাহ, কেন্দ্রীয় দপ্তর সম্পাদক আজিজুর রহমান আজাদ, বায়তুলমাল সম্পাদক আনিসুর রহমান, প্রচার সম্পাদক ও ডাকসুর জিএস এস এম ফরহাদ, তথ্য ও মানবাধিকার সম্পাদক তানজির হোছাইন জুয়েল, আন্তর্জাতিক সম্পাদক আসিফ আব্দুল্লাহ, প্ল্যানিং এ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট সম্পাদক সুমন সরকার, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা সভাপতি ও ডাকসুর এজিএস মহিউদ্দিন খান, ঢাকা কলেজ শাখা সভাপতি মোস্কাকিম আহমেদ প্রমুখ।