যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে নজিরবিহীন সাফল্য পেয়েছে ডেমোক্রেটিক পার্টি। প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট-কংগ্রেসের দুই কক্ষের নিয়ন্ত্রণ নেয়ার পাশাপাশি ঐতিহ্যগতভাবে রিপাবলিকানদের সমর্থন পাওয়া বেশ কয়েকটি এলাকাতেও এগিয়েছে দলটি। নির্বাচনের এই ফল প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প এবং তার রাজনৈতিক কর্মসূচির জন্য বড় ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
কংগ্রেসের দুই কক্ষের নিয়ন্ত্রণ ডেমোক্রেটদের হাতে যাওয়ায় ট্রাম্পের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক কঠিন হয়ে উঠতে পারে। আইন প্রণয়ন ও কংগ্রেসের নজরদারির ক্ষেত্রে ডেমোক্রেটরা এখন বেশি প্রভাব বিস্তারের সুযোগ পাবে। এমন পরিস্থিতিতে নিজের প্রশাসনের কর্মসূচি রক্ষায় প্রেসিডেন্টের ভেটো ক্ষমতা ব্যবহারের ইঙ্গিত দিয়েছেন ট্রাম্প।
ভোটের আগে সিবিএস নিউজকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে প্রেসিডেন্টের ভেটো ক্ষমতাকে ‘চূড়ান্ত ক্ষমতা’ বলে বর্ণনা করেন তিনি। জানান, ডেমোক্রেটদের পাস করা কোনো আইনের সঙ্গে একমত না হলে সেটি আটকে দিতে পারেন। দুই পক্ষের মধ্যে সমঝোতা না হলে এই ক্ষমতা প্রয়োগ করবেন বলেও ইঙ্গিত দিয়েছেন তিনি। এ কারণে নিজেকে ‘মিস্টার ভেটো’ বলেও উল্লেখ করেছেন।
এ ছাড়া নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে ‘ভেটো’ শব্দটি পোস্ট করেন তিনি। এর মধ্য দিয়ে ডেমোক্রেটদের পাস করা আইন আটকে দেয়ার ক্ষমতা প্রয়োগের প্রস্তুতির ইঙ্গিত দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট।
ভেটো ক্ষমতা কী, কীভাবে এটি প্রয়োগ করা হয়
সিবিএস নিউজকে টেলিফোনে দেয়া সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ ডেমোক্র্যাটদের হাতে গেলেও নিজের কর্মসূচি এগিয়ে নিতে তিনি আত্মবিশ্বাসী।
ডেমোক্রেটদের সংখ্যাগরিষ্ঠ কংগ্রেসের মুখোমুখি হওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, ‘আমার হাতে চূড়ান্ত ক্ষমতা রয়েছে-এর নাম ভেটো।’ ডেমোক্রেটদের পাস করা আইন প্রত্যাখ্যান করে আইনপ্রণেতাদের আলোচনায় বসতে বাধ্য করতে পারেন বলেও জানান তিনি।
ট্রাম্পের ভাষায়, ‘অন্যথায় আমি সবকিছুতেই ভেটো দেব। তারা নিশ্চয়ই সেটা চাইবে না।’
ফক্স নিউজকে দেয়া আরেক সাক্ষাৎকারে ভেটোকে মার্কিন প্রেসিডেন্টের হাতে থাকা সবচেয়ে শক্তিশালী ক্ষমতাগুলোর একটি বলে বর্ণনা করেন ট্রাম্প। তিনি বলেন, ‘আপনারা জানেন, অতীতেও বহুবার এমন হয়েছে। এটি ভেটো দেয়ার ক্ষমতা-একজন প্রেসিডেন্টের হাতে থাকা সবচেয়ে শক্তিশালী ক্ষমতাগুলোর একটি। তারা এমন সব আইন পাঠাবে, যেগুলো সম্পূর্ণ অযৌক্তিক। আমি সেগুলোতে ভেটো দেব।’
সিবিএসকে দেয়া সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প সুপ্রিম কোর্টের ‘ট্রাম্প বনাম স্লটার’ মামলার রায়ের কথাও উল্লেখ করেন। ওই রায়ের মাধ্যমে ফেডারেল ট্রেড কমিশনের সদস্য রেবেকা স্লটারকে অপসারণের ক্ষেত্রে তার ক্ষমতা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
ট্রাম্প বলেন, ‘স্লটার মামলার রায় প্রেসিডেন্টকে এমন ব্যাপক ক্ষমতা দিয়েছে, যা আগে কখনো ছিল না।’ তার বক্তব্যে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে, ডেমোক্রেট-নিয়ন্ত্রিত কংগ্রেসের সঙ্গে দর-কষাকষিতে ভেটো ক্ষমতাকে গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে চান তিনি।
তবে মার্কিন সংবিধানে প্রেসিডেন্টের ভেটো প্রত্যাখ্যান করার ক্ষমতাও কংগ্রেসকে দেয়া হয়েছে।
মার্কিন সংবিধানে প্রেসিডেন্টের ভেটো ক্ষমতা কী?
যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের প্রথম অনুচ্ছেদের সপ্তম ধারায় প্রেসিডেন্টের ভেটো ক্ষমতার কথা বলা হয়েছে। প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেটে পাস হওয়া কোনো বিল আইনে পরিণত হওয়ার আগে সেটি প্রত্যাখ্যান করার ক্ষমতা রয়েছে প্রেসিডেন্টের।
কোনো বিল হোয়াইট হাউসে পৌঁছানোর পর প্রেসিডেন্টের সামনে মূলত দুটি পথ থাকে। তিনি বিলে স্বাক্ষর করে সেটিকে আইনে পরিণত করতে পারেন। অথবা আপত্তি জানিয়ে সেটি কংগ্রেসে ফেরত পাঠাতে পারেন।
প্রেসিডেন্ট ১০ দিনের মধ্যে (রোববার বাদে) বিলে স্বাক্ষর না করলে বা আপত্তিসহ ফেরত না পাঠালে সাধারণত সেটি আইনে পরিণত হয়, যদি এ সময়ের মধ্যে কংগ্রেসের অধিবেশন চালু থাকে।
তবে ওই ১০ দিনের মধ্যে কংগ্রেসের অধিবেশন মুলতবি হয়ে গেলে এবং প্রেসিডেন্টের পক্ষে বিলটি ফেরত পাঠানোর সুযোগ না থাকলে সেটি আইনে পরিণত হয় না। এই পদ্ধতিকে বলা হয় ‘পকেট ভেটো’।
প্রেসিডেন্টকে পুরো বিলটি গ্রহণ অথবা প্রত্যাখ্যান করতে হয়। কংগ্রেসে পাস হওয়া কোনো বিলের নির্দিষ্ট ধারা বাদ দেয়া কিংবা তাতে নিজের মতো পরিবর্তন আনার ক্ষমতা ভেটোর আওতায় নেই।
ট্রাম্পের ভেটো কংগ্রেস কীভাবে বাতিল করতে পারে?
প্রেসিডেন্ট কোনো বিলে ভেটো দিলেও কংগ্রেস চাইলে তা অকার্যকর করতে পারে। তবে এর জন্য প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট-উভয় কক্ষেই দুই-তৃতীয়াংশ সদস্যের সমর্থন প্রয়োজন। অর্থাৎ ট্রাম্প কোনো বিল প্রত্যাখ্যান করলেও পর্যাপ্ত আইনপ্রণেতার সমর্থন পেলে কংগ্রেস সেটি আবার পাস করে আইনে পরিণত করতে পারবে।
প্রতিনিধি পরিষদের ৪৩৫টি আসনের সবগুলোতে ভোট হলে ভেটো বাতিল করতে প্রয়োজন হবে ২৯০ ভোট। আর ১০০ সদস্যের সিনেটে প্রয়োজন হবে ৬৭ ভোট।
ডেমোক্রেটদের নিজেদের আসনসংখ্যা দুই-তৃতীয়াংশের কম হলে ভেটো বাতিল করতে উভয় কক্ষেই উল্লেখযোগ্যসংখ্যক রিপাবলিকান আইনপ্রণেতার সমর্থন পেতে হবে।
কংগ্রেসের তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় সরকার প্রতিষ্ঠার পর থেকে প্রেসিডেন্টদের দেয়া ভেটোর খুব সামান্য অংশই কংগ্রেস বাতিল করতে পেরেছে।
ডেমোক্রেটদের চাপে রাখতে কীভাবে ব্যবহার করবেন ট্রাম্প?
ভেটো শুধু কোনো আইন প্রত্যাখ্যানের হাতিয়ার নয়; কোনো বিল হোয়াইট হাউসে পৌঁছানোর আগেই এর সম্ভাব্য প্রয়োগ আইনপ্রণেতাদের সঙ্গে প্রেসিডেন্টের দর-কষাকষিতে প্রভাব ফেলতে পারে।
ডেমোক্রেটরা এমন কোনো আইন পাস করলে, যার বিরোধিতা করছেন ট্রাম্প, তিনি সেটিতে ভেটো দেয়ার হুমকি দিতে পারেন। এতে আইনপ্রণেতারা বিলের কিছু ধারা পরিবর্তন করতে কিংবা প্রেসিডেন্টের সমর্থন পেতে প্রশাসনের সঙ্গে সমঝোতায় বসতে বাধ্য হতে পারেন।
ট্রাম্প নিজেও এমন কৌশল অনুসরণের ইঙ্গিত দিয়েছেন। সিবিএস নিউজকে তিনি বলেন, ‘ঐতিহাসিকভাবে দেখা গেছে, কয়েক মাস ভেটো দেয়ার পর তারা এসে বলে, আমাদের একটা সমঝোতায় পৌঁছাতে হবে।’
তবে প্রেসিডেন্ট কোনো বিলে ভেটো দিলেই সেটি চূড়ান্তভাবে আটকে যায় না। দুই কক্ষের দুই-তৃতীয়াংশ সদস্যের সমর্থন পেলে কংগ্রেস সেই ভেটো অকার্যকর করে দিতে পারে।
