ভৌগোলিক অবস্থান, বৃহৎ অভ্যন্তরীণ বাজার, ক্রমবর্ধমান অর্থনীতি এবং বিপুল তরুণ জনগোষ্ঠীর কারণে বাংলাদেশ বিদেশি বিনিয়োগের জন্য একটি সম্ভাবনাময় পৃষ্ঠা ২ কলাম ৬
গন্তব্য। দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংযোগস্থলে অবস্থিত বাংলাদেশ আঞ্চলিক বাণিজ্য, উৎপাদন ও সরবরাহব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত হওয়ার সক্ষমতা রাখে। তবে এই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে প্রয়োজন স্বাধীন ও ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে একটি দেশের গ্রহণযোগ্যতা যেমন তার কূটনৈতিক অবস্থানের ওপর নির্ভর করে, তেমনি বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থার ভিত্তি তৈরি হয় সরকারের নীতির ধারাবাহিকতা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির মাধ্যমে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই আন্তর্জাতিক সম্পর্ক জোরদার এবং বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে সক্রিয় কূটনৈতিক উদ্যোগ নিয়েছে। মালয়েশিয়া, চীন, যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশের ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে যোগাযোগ এবং অর্থনৈতিক সহযোগিতা সম্প্রসারণের উদ্যোগ তারই প্রতিফলন। এর ধারাবাহিকতায় প্রধানমন্ত্রীর সাম্প্রতিক জাপান সফর বাংলাদেশের অর্থনৈতিক কূটনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হয়ে উঠেছে। সফরকালে জাপানি বেসরকারি খাত থেকে প্রায় ৬ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার বা ৭৮ হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এসব বিনিয়োগ পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে দুই লাখের বেশি মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে।
প্রধানমন্ত্রী বরাবরের মতো সীমিতসংখ্যক প্রতিনিধিদল নিয়ে বাংলাদেশ বিমানের নিয়মিত ফ্লাইটে জাপান সফর করেন। প্রধানমন্ত্রীর চারদিনের এই সফর শুধু আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সৌজন্য বিনিময়ে সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং রাজনৈতিক যোগাযোগ, ব্যবসায়িক অংশীদারিত্ব, অবকাঠামো উন্নয়ন, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং প্রযুক্তিগত সহযোগিতার এক বিস্তৃত কর্মসূচি ছিল সফরের কেন্দ্রে।
রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্কের নতুন গতি: সফরের প্রথম দিন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন জাপানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী এবং জাপান-বাংলাদেশ সংসদীয় মৈত্রী লীগের সভাপতি তারো আসোর নেতৃত্বাধীন প্রতিনিধিদল। বৈঠকে দুই দেশের দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক, রাজনৈতিক যোগাযোগ এবং অর্থনৈতিক সহযোগিতা আরও জোরদার করার বিষয়ে আলোচনা হয়। একই দিন প্রধানমন্ত্রী সাক্ষাৎ করেন মারুবেনি করপোরেশনের চেয়ারম্যান এবং জাপান-বাংলাদেশ বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা কমিটির (ঔইঈঈঊঈ) সভাপতি মাসুমি কাকিনোকি। বৈঠকে বাংলাদেশ-জাপান অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তি (ঊচঅ) কার্যকর হওয়ার সম্ভাবনা এবং তথ্যপ্রযুক্তি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, উন্নত উৎপাদন-শিল্প, কাফকো আধুনিকায়ন এবং বাংলাদেশে দ্বিতীয় সার কারখানা স্থাপনের মতো সম্ভাবনাময় খাতে জাপানি বিনিয়োগের বিষয়ে আলোচনা হয়। এ ছাড়া জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থার (জাইকা) প্রেসিডেন্ট ড. তানাকা আকিহিকোর সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর বৈঠকে বাংলাদেশের চলমান উন্নয়ন প্রকল্পের বাস্তবায়ন ত্বরান্বিত করা, অগ্রাধিকারমূলক প্রকল্পে অর্থায়ন, সহজ শর্তে ঋণ এবং কারিগরি সহযোগিতা অব্যাহত রাখার বিষয়ে আলোচনা হয়।
সফরের প্রথম দিনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ আয়োজন ছিল নিপ্পন ফাউন্ডেশন ও সাসাকাওয়া পিস ফাউন্ডেশনের অনারারি চেয়ারম্যান ইয়োহেই সাসাকাওয়ার আমন্ত্রণে প্রধানমন্ত্রীর নৈশভোজে অংশগ্রহণ। এ সময় বাংলাদেশে সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণে টিকা উৎপাদন কারখানা স্থাপনের ক্ষেত্রে সম্ভাব্য সহযোগিতা নিয়েও আলোচনা হয়।
শীর্ষ বৈঠক: সম্পর্কের কৌশলগত উত্তরণ: সফরের দ্বিতীয় দিন জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির সঙ্গে আনুষ্ঠানিক শীর্ষ বৈঠকে অংশ নেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাগত জানানো হয় এবং গার্ড অব অনার প্রদান করা হয়। বৈঠকে দুই দেশের দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি জ্বালানি নিরাপত্তা, প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, মহাকাশ গবেষণা, অবকাঠামো উন্নয়ন, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণের বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।
প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশ-জাপান টেক পার্ক প্রতিষ্ঠা, দেশের ছয়টি বিভাগীয় শহরকে সংযুক্ত করে দ্রুতগতির রেল নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা এবং উড়াল সড়ক নির্মাণের প্রস্তাব তুলে ধরেন। একই সঙ্গে বাংলাদেশ-জাপান অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তি (ঊচঅ) দ্রুত কার্যকরের ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন। রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধান, জাতিসংঘ ও ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে সহযোগিতা এবং অগ্রাধিকারমূলক খাতগুলোর কার্যকর বাস্তবায়নে মন্ত্রী পর্যায়ের যৌথ কমিশন গঠনের প্রস্তাবও দেন তিনি।
এই শীর্ষ বৈঠকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, দুই দেশের সম্পর্ককে বিদ্যমান উন্নয়ন সহযোগিতার গণ্ডি পেরিয়ে একটি বিস্তৃত কৌশলগত অর্থনৈতিক অংশীদারিত্বে রূপ দেয়ার স্পষ্ট উদ্যোগ। অর্থাৎ, সম্পর্কটি এখন শুধু অবকাঠামো নির্মাণ কিংবা উন্নয়ন সহযোগিতার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না; বরং শিল্পায়ন, প্রযুক্তি, জ্বালানি, বাণিজ্য ও আঞ্চলিক সংযোগের সমন্বিত কাঠামোর দিকে এগোচ্ছে।
এ ছাড়া, জাপানের অর্থনীতি, বাণিজ্য ও শিল্প মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশের অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের মধ্যে অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদার ও ব্যবসায়িক পরিবেশের উন্নয়নবিষয়ক একটি সহযোগিতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে। জাপানের কৃষি, বন ও মৎস্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে বাংলাদেশের কৃষি মন্ত্রণালয় এবং মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের পৃথক দু’টি সহযোগিতা স্মারক এবং দক্ষতা উন্নয়নের মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টির কর্মসূচিবিষয়ক একটি সহযোগিতা স্মারকসহ মোট চারটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে।
জাপানি বিনিয়োগ আকর্ষণে প্রধানমন্ত্রীর সরাসরি আহ্বান: সফরে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে আসেন জাপান এক্সটার্নাল ট্রেড অর্গানাইজেশনের (ঔঊঞজঙ) প্রেসিডেন্ট কাতাওকা সুসুমু। বাংলাদেশের বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোতে উন্নত উৎপাদন-শিল্প, তথ্যপ্রযুক্তি, অটোমোবাইল, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ খাতে জাপানি বিনিয়োগ বাড়ানো নিয়ে আলোচনা হয় বৈঠকে। পাশাপাশি রপ্তানি বহুমুখীকরণ, দক্ষতা উন্নয়ন, জাপানি ভাষা প্রশিক্ষণকেন্দ্র প্রতিষ্ঠা এবং অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তি বাস্তবায়ন নিয়ে আলোচনা হয়। পরে ঔঊঞজঙ আয়োজিত বাংলাদেশ-জাপান অর্থনৈতিক ফোরামে দেয়া বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের বৃহৎ অভ্যন্তরীণ বাজার, তরুণ ও কর্মক্ষম জনশক্তি এবং ২০৩৪ সালের মধ্যে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পৌঁছানোর লক্ষ্য তুলে ধরেন। তিনি জাপানি ব্যবসায়ীদের বাংলাদেশে বিনিয়োগের আহ্বান জানান।
প্রধানমন্ত্রী বক্তব্যে তিনটি খাতকে বিশেষ বিনিয়োগের ক্ষেত্র হিসেবে চিহ্নিত করেন। প্রথমত, জ্বালানি ও নবায়নযোগ্য শক্তি; দ্বিতীয়ত, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ক্লাউড কম্পিউটিং, রোবোটিকস, ইলেকট্রনিকস ও মহাকাশ প্রযুক্তি; এবং তৃতীয়ত, দেশব্যাপী এলিভেটেড সড়ক ও ছয় বিভাগীয় শহরকে যুক্ত করে উচ্চগতির রেল নেটওয়ার্ক। পাশাপাশি বাংলাদেশ-জাপান টেকনোলজি পার্ক প্রতিষ্ঠা, আড়াইহাজারে জাপানি অর্থনৈতিক অঞ্চলে শিল্পকারখানা স্থাপন এবং বাংলাদেশি তরুণদের জাপানি ভাষা শিক্ষার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন তিনি।
এই ফোরাম ছিল জাপানি বিনিয়োগকারীদের সামনে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা সরাসরি তুলে ধরার একটি গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ। সফরকালে বেসরকারি খাতে অন্তত ১৭টি সমঝোতা স্মারক ও চুক্তির উদ্যোগের মাধ্যমে প্রায় ৬ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এভাবে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর বাংলাদেশে বিনিয়োগের আগ্রহ তৈরি হওয়া সরকারের অর্থনৈতিক কূটনীতির জন্য ইতিবাচক বার্তা। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে উৎপাদন-শিল্প, জ্বালানি, প্রযুক্তি ও অবকাঠামো খাতে নতুন কর্মসংস্থান এবং প্রযুক্তি স্থানান্তরের সুযোগ তৈরি হবে।
রোহিঙ্গা সংকট ও আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে বাংলাদেশের অবস্থান: জাপান সফরের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বিষয় নিয়ে দুই দেশের আলোচনা। মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য থেকে বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের স্বেচ্ছায়, নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসনকে সংকটের চূড়ান্ত সমাধান হিসেবে তুলে ধরেছে দুই দেশ। রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধানে জাপানের মতো গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন সহযোগী ও আন্তর্জাতিক অংশীদারের সমর্থন বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
এ ছাড়া ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে শান্তি ও স্থিতিশীলতা, নৌ ও আকাশপথে চলাচলের স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী সামুদ্রিক বিরোধ শান্তিপূর্ণভাবে নিষ্পত্তির ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছে দুই দেশ। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের সংস্কার, পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণ, মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি এবং গাজা পুনর্গঠনের বিষয়ও দুই দেশের যৌথ বিবৃতিতে উঠে আসে।
বাংলাদেশের সামনে এখন বড় সুযোগ—জাপানের পুঁজি, প্রযুক্তি ও অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে উৎপাদনশীল অর্থনীতি গড়ে তোলা, রপ্তানি বহুমুখীকরণ এবং তরুণ জনগোষ্ঠীর জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের জাপান সফর সেই সম্ভাবনার দরজা খুলে দিয়েছে। এখন প্রয়োজন ঘোষিত উদ্যোগগুলোর সময়োপযোগী বাস্তবায়ন। কারণ, কূটনৈতিক সাফল্যের প্রকৃত মূল্যায়ন হয় তার দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সুফল এবং সাধারণ মানুষের জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তনের মধ্যদিয়ে।
লেখক: প্রধানমন্ত্রীর উপ-প্রেস সচিব
