হুমকিতে শতাধিক প্রজাতি

হালদার দুই পাড়ে ১,০২৯ প্রজাতির উদ্ভিদ

হুমকিতে শতাধিক প্রজাতি

ফন্ট সাইজ:

মাছের প্রাকৃতিক প্রজননক্ষেত্র হিসেবে পরিচিত হালদা নদীর দুই পাড়ে রয়েছে সমৃদ্ধ উদ্ভিদবৈচিত্র্য। নদীর দুই তীরে গবেষণা চালিয়ে ১ হাজার ২৯ প্রজাতির উদ্ভিদ শনাক্ত করেছেন গবেষকরা। এর মধ্যে ৫১৭ প্রজাতির ঔষধি উদ্ভিদ রয়েছে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ২৩টি প্রজাতিকে বিপন্ন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এ ছাড়া যথাযথ সংরক্ষণের উদ্যোগ না নিলে আরও ১০০টি প্রজাতি ভবিষ্যতে বিপন্ন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। শুধু উদ্ভিদবৈচিত্র্য নয়, গবেষণায় হালদা নদী দূষণের ২৯টি উৎসও চিহ্নিত করা হয়েছে। এতে নদীটির পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেয়ার প্রয়োজনীয়তা উঠে এসেছে।

মঙ্গলবার চট্টগ্রামে বেসরকারি সামাজিক উন্নয়ন ও গবেষণা সংস্থা ইফেক্টিভ ক্রিয়েশন অন হিউম্যান ওপিনিয়ন (ইকো) আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে গবেষণার এসব তথ্য প্রকাশ করা হয়। বাংলাদেশ স্টিল রি-রোলিং মিলসের (বিএসআরএম) সহযোগিতায় গবেষণাটি পরিচালিত হয়। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৬ সালের অক্টোবর পর্যন্ত চলা এ গবেষণায় নেতৃত্ব দেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ওমর ফারুক (রাসেল)। সহযোগী নেতৃত্বে ছিলেন ইকো’র সায়েন্টিফিক অফিসার এবং চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের সাবেক ও বর্তমান শিক্ষার্থীরা। গবেষণার সার্বিক তত্ত্বাবধানে ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়টির উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের সাবেক সভাপতি ও মেহেরপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. শেখ বখতিয়ার উদ্দীন। গবেষণায় দেখা গেছে, শনাক্ত হওয়া ১ হাজার ২৯ প্রজাতির উদ্ভিদ ৫৮৭টি গণ ও ১৫২টি পরিবারের অন্তর্ভুক্ত। এর মধ্যে ২১২ প্রজাতির বড় বৃক্ষ, ১৩৩টি গুল্ম, ১৩৩টি লতা, ৫২২টি বীরুৎ এবং ৯টি পরজীবী উদ্ভিদ রয়েছে। এ ছাড়া পাওয়া গেছে দু’টি নগ্নবীজি, ১৩টি মসগোত্রীয়, ৩৫টি ফার্ন ও সাত প্রজাতির ছত্রাক। উদ্ভিদগুলোর মধ্যে ৭৬৫টি স্থানীয় এবং ২৪৪টি বিদেশি প্রজাতির। একবীজপত্রী উদ্ভিদ রয়েছে ২২৩টি এবং দ্বিবীজপত্রী ৭৪৯টি। দ্বিবীজপত্রী উদ্ভিদের মধ্যে ফ্যাবেসি এবং একবীজপত্রী উদ্ভিদের মধ্যে ধান ও ঘাসজাতীয় পোয়াসি গোত্রের প্রাধান্য রয়েছে। হালদার দুই পাড়ে পাওয়া উদ্ভিদের মধ্যে ৫১৭টি ঔষধি প্রজাতি শনাক্ত করেছেন গবেষকরা। এসব উদ্ভিদের মধ্যে রয়েছে কুর্চি, বট, আপাং, কালমেঘ, হিজল, ছাতিম, আকন্দ, হাতিশুঁড়, সোনালু ও স্বর্ণলতা। গবেষকদের মতে, এসব উদ্ভিদ নদীতীরের জীববৈচিত্র্য সমৃদ্ধ করার পাশাপাশি ভবিষ্যতে ঔষধি উদ্ভিদ নিয়ে গবেষণার নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে। অন্যদিকে, ২৩টি বিপন্ন উদ্ভিদ প্রজাতির মধ্যে রয়েছে বাটনা, লেইস্যা গর্জন বা লেকুয়া গর্জন, চাউ তাল, ঈশ্বরমূল, নেরা মিলাতি, পাখা ঢেকিয়া, বনিপদ, মাইল্লা আম, পানিজাম ও চালমুগড়া। এছাড়া ভবিষ্যতে বিপন্ন হওয়ার ঝুঁকিতে থাকা ১০০টি প্রজাতির তালিকাও তৈরি করা হয়েছে। এর মধ্যে নীলভুট্টা, তেজবহুল, ফাইজ গাছ, সিধা জারুল, কুর্চি পাম, খনা, অশোক, বরুন ও লবঙ্গ লতা উল্লেখযোগ্য।

গবেষণায় হালদা নদীর দূষণের জন্য ২৯টি উৎস চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে পানি দূষণের ১৩টি, বায়ু দূষণের ১০টি, মাটি দূষণের ১১টি, শব্দ দূষণের চারটি, তাপীয় দূষণের চারটি, ধূলি দূষণের পাঁচটি, ভারী ধাতু দূষণের ছয়টি, প্লাস্টিক দূষণের তিনটি এবং ভূমিক্ষয়ের একটি উৎস রয়েছে। একাধিক দূষণের ধরন একই উৎসের সঙ্গে সম্পর্কিত হওয়ায় এসব সংখ্যার যোগফল ২৯টির বেশি। হালদা নদীর উদ্ভিদবৈচিত্র্য রক্ষা ও দূষণ নিয়ন্ত্রণে ১৩টি সুপারিশ করেছে ইকো। এর মধ্যে রয়েছে দুর্লভ ও বিপন্ন উদ্ভিদ সংরক্ষণ, নদীভাঙন রোধে স্থানীয় প্রজাতির গাছ লাগানো, উদ্ভিদবৈচিত্র্য ও পানির গুণমান নিয়মিত পর্যবেক্ষণ এবং নদীতীরবর্তী কৃষকদের জৈব পদ্ধতিতে চাষাবাদে উৎসাহিত করা।

পাশাপাশি নদী দূষণ নিয়ন্ত্রণ, খননের মাটি নিরাপদ স্থানে অপসারণ, অবৈধ দখল বন্ধ, প্লাস্টিক ও কঠিন বর্জ্যের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা, শিল্পবর্জ্য শোধন এবং অপরিকল্পিত বসতি ও স্থাপনা নিয়ন্ত্রণের সুপারিশ করা হয়েছে। নালা ও ড্রেনের অপরিশোধিত পানি সরাসরি নদীতে ফেলা বন্ধের বিষয়েও গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। গবেষক দলের প্রধান অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ওমর ফারুক (রাসেল) বলেন, হালদা নদীকে সাধারণত মাছের প্রাকৃতিক প্রজননক্ষেত্র হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু নদীর দুই পাড়ে যে সমৃদ্ধ উদ্ভিদবৈচিত্র্য রয়েছে, তা নিয়ে আগে পূর্ণাঙ্গ গবেষণা হয়নি। তাদের গবেষণায় ১ হাজার ২৯ প্রজাতির উদ্ভিদ শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে ৭২৯টি প্রজাতি হালদা নদী এলাকায় প্রথমবারের মতো নথিভুক্ত করা হয়েছে।

তিনি বলেন, সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, এসব উদ্ভিদের মধ্যে ২৩টি বিপন্ন এবং আরও ১০০টি প্রজাতি ভবিষ্যতে বিপন্ন হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। পাশাপাশি ৫১৭টি ঔষধি উদ্ভিদের সন্ধান পাওয়া গেছে, যা ভবিষ্যতে গবেষণার নতুন ক্ষেত্র তৈরি করবে। অধ্যাপক ওমর ফারুক আরও বলেন, হালদাকে শুধু মাছের প্রজননক্ষেত্র হিসেবে দেখলে চলবে না। নদীর দুই পাড়ের উদ্ভিদ, জলজ প্রাণী, মাটি ও পানির সমন্বিত পরিবেশ রক্ষা করতে হবে। নদী দখল ও দূষণ বন্ধের পাশাপাশি বিপন্ন উদ্ভিদ সংরক্ষণ, দেশীয় প্রজাতির গাছ রোপণ, শিল্পবর্জ্য শোধন এবং নিয়মিত পানি ও উদ্ভিদবৈচিত্র্য পর্যবেক্ষণ জরুরি। এ জন্য সরকারি সংস্থার পাশাপাশি স্থানীয় জনগণ, কৃষক, জেলে ও গবেষকদের সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি। গবেষণার তথ্য হালদা নদী সংরক্ষণের পরিকল্পনা ও নীতিনির্ধারণে কাজে লাগবে বলেও আশা প্রকাশ করেন এই গবেষক।