মাওলানা মামুনুল হক ইস্যুতে উলামা সমাজের সার্বজনীন সংগঠন খাদিমুল কোরআন পরিষদ সিলেটে চরম দ্বন্দ্ব চলছে। এ নিয়ে দু’পক্ষ মুখোমুখি অবস্থান করায় সংগঠনের সভাপতি সিলেটের দরগাহ মাদ্রাসার মুহতামিম মাওলানা মাসুক উদ্দিন ও সাধারণ সম্পাদক দরগাহ মাদ্রাসার ইমাম হাফেজ মাওলানা আসজাদ আহমদ পদত্যাগ করেছেন। এ নিয়ে সংকট তৈরি হওয়ায় খাদিমুল কোরআন পরিষদ সিলেটের প্রতিষ্ঠাতা নেতৃবৃন্দ এতে হস্তক্ষেপ করেছেন। সোমবার রাতে বৈঠক করে নতুন করে আহ্বায়ক কমিটি গঠন করা হয়েছে। খাদিমুল কোরআন পরিষদ সিলেট কওমি অঙ্গনের উলামাদের ঐক্যবদ্ধ ও শক্তিশালী একটি সংগঠন। এই সংগঠনের মূল উদ্যেক্তা প্রখ্যাত মুফাসসির আল্লামা নুরুল ইসলাম ওলিপুরী। প্রতি বছর নগরের আলীয়া মাদ্রাসা ময়দানে তিনব্যাপী মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়। এতে তিন দিনই বয়ান করেন মাওলানা ওলিপুরী। এ ছাড়া দেশের শীর্ষ আলেম, উলামারা এসে মাহফিলে বয়ান করেন। প্রতিষ্ঠাতা সদস্যরা জানিয়েছেন— রাজনৈতিক মতাদর্শে ঊর্ধ্বে থেকে সকল আলেম উলামাদের মিশ্রণে এই সংগঠনের কার্যক্রম পরিচালিত হয়। কওমি অঙ্গনে সংগঠন নিরপেক্ষ ও সার্বজনীন সংগঠন হিসেবে পরিচিত। ১৯৯৪ সাল থেকে আলীয়া মাদ্রাসা মাঠে নিরবচ্ছিন্নভাবে এ সংগঠনের তরফ থেকে তিন দিনের মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে।
সংগঠনের নেতারা জানিয়েছেন, গত বছর মাওলানা ওলিপুরীর আমন্ত্রণে সংগঠনের বার্ষিক মাহফিলে এসে বয়ান রেখেছিলেন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের বর্তমান আমীর মাওলানা মামুনুল হক। এবার আলীয়া মাদ্রাসা মাঠে মাহফিলের আয়োজন করা হয়েছে ১৯, ২০ ও ২১শে নভেম্বর। গতবারের দাওয়াতি হিসেবে এবারের মাহফিলেও মামুনুল হকের বয়ান রাখার কথা। তবে এবার মাওলানা মামুনুল হককে নিয়ে আলেম সমাজের অনেকের মতবিরোধ রয়েছে। সম্প্রতি সময়ে মাওলানা নুরুল ইসলাম ওলিপুরীর সঙ্গে আকিদাগত বিষয়ে বাহাসে জড়িয়েছেন মাওলানা মামুনুল হক। এসব বিষয় নিয়ে কওমি অঙ্গনে তোলপাড় চলছে। পাশাপাশি গত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জামায়াতের সঙ্গে জোটবদ্ধ হওয়ার কারণে মাওলানা মামুনুল হককে অতিথি করা নিয়ে আপত্তি অনেকের। এই অবস্থায় এবারের খাদিমুল কোরআন পরিষদের সম্মেলন প্রস্তুতি সভার পূর্বে ওলিপুরী সংগঠনের শীর্ষ নেতৃবৃন্দকে মামুনুল হকের কথা জানিয়ে চিঠি পাঠান। এখানে তিনি মাওলানা মামুনুল হকের আকিদাগত কিছু কিছু বক্তব্যের উত্তর জানতে চান। এসব বক্তব্যের সুরাহা করে তাকে অতিথি হিসেবে নিয়ে আসার কথা ওই চিঠিতে উল্লেখ করেন আল্লামা ওলিপুরী।
উলামারা জানিয়েছেন, খাদিমুল কোরআন পরিষদ সিলেটের এই আয়োজনের মূল উদ্যোক্তা মাওলানা ওলিপুরী। মূলত তাকে ঘিরেই এই মাহফিল। ফলে তার চিঠিকে গুরুত্ব সহকারে নেন সংশ্লিষ্টরা। তবে চিঠির প্রেক্ষিতে পরিষদের কমিটির ভেতরে বিরোধ সৃষ্টি হয়। বৈঠকে অনেক নেতাই মাওলানা ওলিপুরীর পক্ষালম্বন করে মামুনুল হককে মাহফিলে আসা থেকে বিরত রাখার দাবি করেন। আবার কমিটির কেউ কেউ মাওলানা মামুনুল হককে মাহফিলে নিয়ে আসার পক্ষে মত দেন। পর পর কয়েকটি বৈঠকে উপস্থিত থাকা পরিষদের নেতারা জানিয়েছেন— মামুনুল হক ইস্যুতে যে ক’টি বৈঠক হয়েছে সবটিতেই উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। সাংঘর্ষিক অবস্থা বিবেচনা করে সংগঠনের সভাপতি ও সিলেটের দরগাহ মাদ্রাসার মুহতামিম মাওলানা মাসুক উদ্দিন সভাপতির পদ থেকে পদত্যাগ করেন। তার পথ অনুসরণ করে সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক দরগাহ মসজিদের ইমাম ও খতিব হাফেজ মাওলানা আসজাদ আহমদসহ কয়েকজন পদত্যাগ করেন। পদত্যাগকারীদের মধ্যে সংগঠনের সহ-সভাপতি মাওলানা আবুল খয়ের বিতঙ্গীও রয়েছেন। একদিকে ৩ দিনব্যাপী মাহফিল সামনে, অন্যদিকে সংগঠনের গুরুত্বপূর্ণ পদবিধারী নেতৃবৃন্দ পদত্যাগ করায় সংকট মুহূর্তে এসে হাল ধরেছেন খাদিমুল কোরআন পরিষদ সিলেটের প্রতিষ্ঠাতা আহ্বায়ক মাওলানা আবুল হাসান ফয়সল ও প্রতিষ্ঠাকালীন সদস্য সচিব মাওলানা আব্দুল মতিন নবীগঞ্জী। তারা বিষয়টি নিয়ে গত রোববার বিকালে দরগাহ মাদ্রাসায় বৈঠক করেন। ওই বৈঠকে দরগাহ মাদ্রাসার সংগঠকরা তাদের পদত্যাগের সিদ্ধান্তে অটল থাকেন।
এর প্রেক্ষিতে গত সোমবার রাতে নগরের সুবহানীঘাট মাদ্রাসায় প্রতিষ্ঠাকালীন নেতৃবৃন্দ ও সংকটে নিরপেক্ষ অবস্থানে থাকা আলেম, উলামারা বৈঠকে বসেন। ওই বৈঠকে নতুন করে প্রতিষ্ঠাকালীন আহ্বায়ক বর্তমান লন্ডন প্রবাসী মাওলানা আবুল হাসান ফয়সলকে আহ্বায়ক ও প্রতিষ্ঠাকালীন সদস্য সচিব মাওলানা আব্দুল মতিন নবীগঞ্জীকে সদস্য সচিব করে ১১ সদস্য আহ্বায়ক কমিটি গঠন করা হয়েছে। সংগঠনের বর্তমান আহ্বায়ক মাওলানা আবুল হাসান ফয়সল গতকাল বিকালে মানবজমিনকে জানিয়েছেন— মূলত মাওলানা মামুনুল হককে অতিথি করাকে কেন্দ্র করে দ্বন্দ্বের সৃষ্টি হয়। মাওলানা ওলিপুরী নিজে গত বছর মামুনুল হককে দাওয়াত করে নিয়ে এসেছিলেন। পরবর্তী সময়ে জামায়াতের সঙ্গে জোট ও নানা বক্তব্য নিয়ে উলামা সমাজে আলোচনা রয়েছে। পরিস্থিতি দ্বান্দ্বিক পর্যায়ে চলে যাওয়ার কারণে পূর্বের কমিটি বাতিল করে নতুন আহ্বায়ক কমিটি গঠন করা হয়েছে। এ কমিটি সবকিছু নতুন করে শুরু করবে। খুব শিগগিরই সব মাদ্রাসার প্রতিনিধি নিয়ে সাধারণ সভা করে পরবর্তী করণীয় নির্ধারণ করা হবে। তিনি বলেন, এবার হয়তো খাদিমুল কোরআন পরিষদ সিলেটের তিন দিনের মাহফিল পেছানো হতে পারে। এতে স্বল্প সময়ে নির্ধারিত সময়ে আয়োজন করা না-ও যেতে পারে।
তবে মাহফিল অনুষ্ঠিত হবে বলে জানান তিনি। সংগঠনের সদস্য সচিব মাওলানা আব্দুল মতিন নবীগঞ্জী জানিয়েছেন, খাদিমুল কোরআন পরিষদ সিলেট একটি অরাজনৈতিক সংগঠন। এখানে আলেম, উলামা হিসেবে সবার অংশগ্রহণ রয়েছে। এবার যা কিছু হয়েছে রাজনৈতিক কারণে হয়েছে। তিনি বলেন, আমরা সংগঠনকে রাজনীতির ঊর্ধ্বে রাখতে চাই। যেহেতু আল্লামা ওলিপুরীকে ঘিরে এই আয়োজন সুতরাং তার মতামত এখানে সর্বাগ্রে গুরুত্ব পাবে বলে জানান তিনি।
