রাজনৈতিক উত্তেজনায় নতুন মাত্রা

মজুরি বোর্ড গঠনের পরও থামেনি আন্দোলন

রাজনৈতিক উত্তেজনায় নতুন মাত্রা

ফন্ট সাইজ:

পোশাক শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণের দাবিতে চলমান আন্দোলন ক্রমেই জটিল রূপ নিচ্ছে। শ্রমিকদের বেতন কাঠামো পুনঃনির্ধারণে সরকার মজুরি বোর্ড গঠন করলেও আন্দোলন থামেনি। বরং বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে বিক্ষোভ, সড়ক অবরোধ, সংঘর্ষ ও কারখানা বন্ধের ঘটনায় পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। এরই মধ্যে আন্দোলনে
রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ সামনে এসেছে। গ্রেপ্তার হয়েছেন আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের কয়েকজন নেতা-কর্মী। পাঁচটি মামলায় প্রায় সাড়ে ১১ হাজার অজ্ঞাত পরিচয় ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে। সরকার ও রাজনৈতিক নেতাদের বক্তব্যে শ্রমিক আন্দোলনকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক মেরূকরণের বিষয়টিও স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

মজুরি বোর্ড গঠনের পরও কেন আন্দোলন?
গত ১লা নভেম্বর পোশাকশ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি পুনঃনির্ধারণে ছয় সদস্যের মজুরি বোর্ড গঠন করে সরকার। শ্রম ও কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী বোর্ড গঠনের ঘোষণা দিয়ে শ্রমিকদের কর্মস্থলে ফিরে যাওয়ার আহ্বান জানান।
বাংলাদেশ শ্রম আইন অনুযায়ী গঠিত এই বোর্ডের নেতৃত্বে রয়েছেন সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ শেখ আশফাকুর রহমান। বোর্ডে শ্রমিক ও মালিকপক্ষের দু’জন করে প্রতিনিধি এবং একজন স্বাধীন প্রতিনিধি রয়েছেন। তাদের দায়িত্ব পোশাক শ্রমিকদের নতুন মজুরি কাঠামো পর্যালোচনা করে সুপারিশ প্রণয়ন করা।

তবে বোর্ড গঠনের পরও শ্রমিকদের মধ্যে অসন্তোষ কমেনি। তাদের দাবি, বর্তমান ১২ হাজার ৫০০ টাকা ন্যূনতম মজুরি দিয়ে ক্রমবর্ধমান জীবনযাত্রার ব্যয় সামাল দেওয়া কঠিন। বাড়িভাড়া, খাদ্য, চিকিৎসা ও পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধির কারণে এই মজুরি দিয়ে সংসার চালানো সম্ভব হচ্ছে না। তাই মাসিক ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণের পাশাপাশি ছাঁটাই শ্রমিকদের পুনর্বহাল এবং শ্রমিকদের কালো তালিকাভুক্তির প্রথা বন্ধের দাবিও জানাচ্ছেন তারা।

আন্দোলনে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ: চলমান শ্রমিক বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার অভিযোগও সামনে এসেছে। ২রা নভেম্বর সচিবালয়ে তৈরি পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ’র নেতাদের সঙ্গে বৈঠক শেষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সাংবাদিকদের বলেন, কিছু শিল্পমালিক আন্দোলনে উসকানি দিচ্ছেন। তাদের কারও কারও রাজনৈতিক পরিচয় আওয়ামী লীগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। সাবেক সংসদ সদস্য, মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীরাও এর সঙ্গে জড়িত বলে সরকারের কাছে তথ্য রয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ভাষ্য, শ্রমিকদের দাবিকে সামনে রেখে কিছু গোষ্ঠী সড়ক অবরোধ, অগ্নিসংযোগ ও সহিংসতার মাধ্যমে অস্থিতিশীলতা তৈরির চেষ্টা করছে। এ ধরনের কর্মকাণ্ডের ভিডিও, অডিওসহ বিভিন্ন তথ্যপ্রমাণ সংগ্রহ করা হয়েছে। একই সঙ্গে কিছু কারখানা উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে বন্ধ রাখার অভিযোগ তুলে মালিকপক্ষের কাছে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের তালিকা চাওয়া হয়েছে।

এর আগে ১লা নভেম্বর ঢাকার মিরপুরসহ বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে বিক্ষোভ ও সংঘর্ষের ঘটনায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ, নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ ও যুবলীগের ১৯ নেতা-কর্মীকে গ্রেপ্তারের খবর প্রকাশিত হয়। পরদিন মিরপুর এলাকায় আরও ৩০ জনকে আটক করার তথ্য জানিয়েছে পুলিশ।
‘পলাতক অপশক্তির’ অস্থিরতা সৃষ্টির অভিযোগ:
প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদি আমিনও শ্রমিক আন্দোলনকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের অভিযোগ তুলেছেন। তার বক্তব্য, শ্রমিক আন্দোলনে প্রবেশ করে ‘পলাতক অপশক্তি’ অস্থিরতা সৃষ্টির চেষ্টা করছে এবং এ বিষয়ে প্রমাণ পাওয়া গেছে। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, প্রকৃত শ্রমিকদের স্বার্থ রক্ষা এবং তাদের ন্যায্য দাবি পূরণে সরকার আন্তরিক। তবে শ্রমিকদের আন্দোলনের আড়ালে যারা সহিংসতা ও নাশকতা চালাচ্ছে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে।

অন্যদিকে শ্রমিকদের দীর্ঘদিনের মজুরি অসন্তোষ, কর্মক্ষেত্রে অনিশ্চয়তা ও শ্রম অধিকার নিয়ে অভিযোগও উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। ফলে আন্দোলনের রাজনৈতিক ব্যবহারের অভিযোগের পাশাপাশি শ্রমিকদের প্রকৃত দাবিগুলো কতো দ্রুত এবং কার্যকরভাবে সমাধান করা যায়, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে উঠেছে।

আন্দোলন অব্যাহত, বন্ধ বহু কারখানা: ২রা নভেম্বরও গাজীপুরের বিভিন্ন এলাকায় পোশাক শ্রমিকদের বিক্ষোভ অব্যাহত ছিল। পল্লী বিদ্যুৎ, মৌচাক, নলজানি ও লক্ষ্মীপুরা এলাকায় শ্রমিকদের সড়কে নামার খবর পাওয়া গেছে। কোথাও ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক অবরোধের কারণে যান চলাচল ব্যাহত হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ ও বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) সদস্যরা দায়িত্ব পালন করেন।

এর আগে ১লা নভেম্বর আন্দোলন ও সংঘর্ষের কারণে মিরপুর, সাভার, আশুলিয়া, গাজীপুর ও ময়মনসিংহের অন্তত ৫২৯টি পোশাক কারখানায় ছুটি ঘোষণা করা হয় বলে বিজিএমইএ’র পরিস্থিতি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রায় ৯ লাখ ৮৭ হাজার শ্রমিক কর্মস্থলে যেতে পারেননি বলে জানা গেছে। এদিকে সোমবার গাজীপুরে দেড় শতাধিক কারখানায় ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। এদিন ৫২৯টি কারখানা বন্ধ রাখা হয় বলে বিজিএমইএ জানিয়েছে।
কারখানা বন্ধের কারণে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি রপ্তানি পণ্য সময়মতো সরবরাহ, আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের সঙ্গে চুক্তি এবং শ্রমিকদের নিয়মিত আয় নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। শিল্পমালিকদের আশঙ্কা, দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা দেশের প্রধান রপ্তানি খাতকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। এ ছাড়া মালিকরা ‘কাজ নেই মজুরি নেই’ নীতিতেও যেতে পারেন বলে জানিয়েছেন।

শ্রমিক প্রতিনিধিদের আহ্বান: কাজে ফিরুন, দাবি নিয়ে আলোচনা চলুক:
২রা নভেম্বর নবগঠিত মজুরি বোর্ডের শ্রমিক প্রতিনিধিরা সংবাদ সম্মেলনে আন্দোলনরত শ্রমিকদের কাজে ফিরে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। একই সঙ্গে আটক শ্রমিক ও শ্রমিক নেতাদের মুক্তি এবং তাদের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলা প্রত্যাহারের দাবি তুলেছেন তারা। শ্রমিক প্রতিনিধিদের বক্তব্য, ন্যায্য মজুরি দাবি করা অপরাধ নয়। শ্রমিকদের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে এবং তাদের দাবিগুলো যথাযথভাবে মজুরি বোর্ডে উপস্থাপন করা হবে। এজন্য শ্রমিক সংগঠনগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে একটি সমন্বিত মজুরি প্রস্তাব তৈরির উদ্যোগ নেয়া হবে বলেও জানান তারা।

সংকটের সমাধান কোন পথে?
পোশাকশিল্প বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। এ খাতে প্রায় ৪০ লাখ শ্রমিক কাজ করেন এবং দেশের রপ্তানি আয়ের বড় অংশ আসে তৈরি পোশাক থেকে। ফলে শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করা যেমন জরুরি, তেমনি উৎপাদন ও রপ্তানি কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখাও গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমান পরিস্থিতিতে তিনটি বিষয় বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। প্রথমত, মজুরি বোর্ডকে শ্রমিকদের জীবনযাত্রার বাস্তব ব্যয় বিবেচনায় নিয়ে গ্রহণযোগ্য ও ন্যায্য মজুরি কাঠামো প্রণয়ন করতে হবে। দ্বিতীয়ত, শ্রমিকদের শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের অধিকার নিশ্চিত করার পাশাপাশি সহিংসতা ও নাশকতার অভিযোগগুলো নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন। তৃতীয়ত, শ্রমিক, মালিক ও সরকারের মধ্যে কার্যকর সংলাপের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি সমাধান খুঁজতে হবে।

মজুরি বোর্ড গঠনের মধ্যদিয়ে সরকার আলোচনার একটি প্রাতিষ্ঠানিক পথ তৈরি করেছে। কিন্তু শ্রমিকদের অসন্তোষ, রাজনৈতিক অভিযোগ ও শিল্পাঞ্চলের অস্থিরতা একসঙ্গে মোকাবিলা করতে না পারলে সংকট আরও দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এখন দেখার বিষয়, নতুন মজুরি কাঠামো নির্ধারণের প্রক্রিয়া কতো দ্রুত এগোয় এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো আলোচনার মাধ্যমে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে কতোটা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।