বাংলাদেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড পোশাকশিল্পে অশনিসংকেত

এএফপির প্রতিবেদন

বাংলাদেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড পোশাকশিল্পে অশনিসংকেত

ফন্ট সাইজ:

বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি তৈরি পোশাকশিল্প। তুলনামূলক কম মজুরিতে বিপুলসংখ্যক শ্রমিকের শ্রমের ওপর ভর করে গড়ে উঠেছে এ শিল্পের সাফল্য। তবে দীর্ঘদিন ধরেই এ খাতে মজুরি, কর্মপরিবেশ ও শ্রমিক অধিকার নিয়ে বিরোধ চলছে।
এরই মধ্যে শনিবার থেকে বিক্ষোভে নেমেছেন পোশাকশ্রমিকেরা। ধর্মঘট পালনকারী শ্রমিকদের দাবি, বর্তমান ন্যূনতম মাসিক মজুরি দ্বিগুণেরও বেশি বাড়াতে হবে।
এ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের অর্জন, সম্ভাবনা ও ক্রমবর্ধমান সংকটের নানা দিক তুলে ধরেছে বার্তা সংস্থা এএফপি।

অর্থনীতিতে পরিবর্তন
১৯৭১ সালে পাকিস্তান থেকে স্বাধীনতা অর্জনের সময় বাংলাদেশ ছিল বিশ্বের অন্যতম দরিদ্র দেশ। মুক্তিযুদ্ধের কারণে দেশটির অর্থনীতি তখন ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল।
পরবর্তী সময়ে তৈরি পোশাকশিল্পের সম্প্রসারণ দক্ষিণ এশিয়ার প্রায় ১৭ কোটি মানুষের এই দেশটির অর্থনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আনে। কৃষিনির্ভর অর্থনীতি থেকে বাংলাদেশ পরিণত হয় বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উৎপাদন ও রপ্তানিকেন্দ্রে।
বাংলাদেশ ব্যাংক তৈরি পোশাকশিল্পকে দেশের ‘রপ্তানি ইঞ্জিন’ হিসেবে অভিহিত করেছে। চীনের পর বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম তৈরি পোশাক রপ্তানিকারক বাংলাদেশ। বৈশ্বিক পোশাকবাজারের প্রায় ৭ শতাংশ বাংলাদেশের দখলে।

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের বড় বড় ফ্যাশন ব্র্যান্ডকে পোশাক সরবরাহ করে এ খাত থেকে বছরে সর্বোচ্চ ৩৮ বিলিয়ন ডলার রপ্তানি আয় করে বাংলাদেশ।
জানুয়ারিতে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) বলেছে, গত দুই দশকে বাংলাদেশের ‘উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক রূপান্তরের’ প্রধান চালিকাশক্তি ছিল তৈরি পোশাকশিল্প। এ শিল্পের কারণে কর্মসংস্থান ও মাথাপিছু আয় বেড়েছে, কমেছে দারিদ্র্য।
বিশ্বের পোশাক সরবরাহকারী
বাংলাদেশ গার্মেন্ট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিজিএমইএ) তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের ১৫০টিরও বেশি দেশে তৈরি পোশাক সরবরাহ করে বাংলাদেশ। সংগঠনটির সদস্য হিসেবে রয়েছে প্রায় ৪ হাজার পোশাক কারখানা। বাংলাদেশের একক বৃহত্তম রপ্তানি বাজার যুক্তরাষ্ট্র। অন্যদিকে ইউরোপীয় ইউনিয়ন হচ্ছে সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক গোষ্ঠীভিত্তিক বাজার।

বাংলাদেশের পোশাকের বড় বাজারগুলোর মধ্যে রয়েছে জার্মানি, বৃটেন, স্পেন, ফ্রান্স, নেদারল্যান্ডস, ইতালি, কানাডা ও বেলজিয়াম। ফ্রুট অব দ্য লুম, লেভি স্ট্রস থেকে শুরু করে ভিএফ করপোরেশনের মতো আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশের কারখানায় তৈরি পোশাক সংগ্রহ করে। ভিএফ করপোরেশনের অধীনে রয়েছে ভ্যানস, টিম্বারল্যান্ড ও দ্য নর্থ ফেসের মতো ব্র্যান্ড।

তবে পশ্চিমা বাজারের ওপর নির্ভরতা কমাতে নতুন বাজার খুঁজছে বাংলাদেশ। এ ক্ষেত্রে জাপান, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, ভারতসহ এশিয়ার অন্যান্য দেশের দিকে নজর দিচ্ছে রপ্তানিকারকেরা।

শ্রমিকের নিরাপত্তা
বিজিএমইএর হিসাব অনুযায়ী, বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্পে সরাসরি কাজ করেন ৪০ লাখেরও বেশি মানুষ। তাদের অর্ধেকের বেশি নারী। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) হিসাবে, এ শিল্পের ওপর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে নির্ভরশীল মানুষের সংখ্যা ৪ কোটি পর্যন্ত হতে পারে। অর্থাৎ দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় এক-চতুর্থাংশের জীবিকা কোনো না কোনোভাবে এই শিল্পের সঙ্গে যুক্ত।

তবে দ্রুত শিল্পায়নের পেছনে রয়েছে বড় ধরনের মানবিক মূল্য।
২০১৩ সালে সাভারের রানা প্লাজা ধসে ১১০০-এর বেশি মানুষ নিহত হন। আহত হন হাজার হাজার শ্রমিক। ওই দুর্ঘটনায় পোশাকশিল্পের কারখানাগুলোর ভয়াবহ নিরাপত্তাহীনতা সামনে আসে। ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে শ্রমিকদের কাজ করানো এবং পর্যাপ্ত শ্রমিক সুরক্ষার অভাব নিয়ে বিশ্বজুড়ে সমালোচনা শুরু হয়।

দুর্ঘটনার পর কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা বাড়াতে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বড় ধরনের উদ্যোগ নেয়া হয়। এর অংশ হিসেবে আন্তর্জাতিক পোশাক ব্র্যান্ড ও শ্রমিক সংগঠনগুলোর মধ্যে একটি চুক্তি হয়। এর আওতায় কারখানা পরিদর্শন এবং নিরাপত্তাব্যবস্থা কার্যকর করার উদ্যোগ নেয়া হয়।

যেসব চ্যালেঞ্জের মুখে
বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্প বর্তমানে উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, জ্বালানিসংকট, আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা এবং পশ্চিমা খুচরা বিক্রেতাদের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতার মতো নানা চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে।
এ ছাড়া রপ্তানি আয়ের বড় অংশ একটি সীমিতসংখ্যক উৎপাদিত পণ্যের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় বিশ্ববাজারে পোশাকের চাহিদা কমে গেলে পুরো অর্থনীতিই ঝুঁকিতে পড়ে।
বাংলাদেশ ব্যাংক সতর্ক করে বলেছে, ভোক্তাদের আচরণে পরিবর্তন এবং বৈশ্বিক চাহিদার ওঠানামার কারণে এ শিল্প স্বল্পমেয়াদে ক্রমবর্ধমান চাপের মুখে পড়ছে।
২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর রাজনৈতিক অস্থিরতাও কারখানার কার্যক্রম ও উৎপাদনে বিঘ্ন ঘটায়। সাম্প্রতিক সময়ে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে সৃষ্ট জ্বালানিসংকটও শিল্পটির ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করেছে।

আইএমএফ বলছে, তৈরি পোশাকশিল্প কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও দারিদ্র্য কমাতে ভূমিকা রাখলেও বাংলাদেশ এখনো পর্যাপ্ত দক্ষ ও উচ্চ বেতনের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারছে না। বিশেষ করে তরুণদের জন্য এ ধরনের কর্মসংস্থানের ঘাটতি রয়েছে।
সংস্থাটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘শিক্ষার হার বৃদ্ধির তুলনায় বিদ্যমান শিল্পকাঠামোয় কর্মসংস্থান সৃষ্টির গতি পিছিয়ে রয়েছে।’

মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে বিক্ষোভ
শ্রমিকদের অভিযোগ, খাদ্য, বাসস্থান, যাতায়াত ও চিকিৎসার ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় তাদের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কমে গেছে। এ অবস্থায় তারা মাসিক ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা করার দাবি জানিয়েছেন। বর্তমানে ন্যূনতম মজুরি ১২ হাজার ৫০০ টাকা। শ্রমিকদের এই দাবি বাস্তবায়িত হলে মজুরি বাড়বে প্রায় ১৪০ শতাংশ।

শ্রমিক প্রতিনিধি ও কারখানার মালিকদের সঙ্গে আলোচনার পর রোববার মজুরি পর্যালোচনায় ছয় সদস্যের একটি বোর্ড গঠন করেছে সরকার। সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান কর্মকর্তাদের শ্রমিকদের অধিকার নিশ্চিত করা এবং তাদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নের নির্দেশ দিয়েছেন।
তবে শিল্পাঞ্চলগুলোতে বিক্ষোভ অব্যাহত রয়েছে। সোমবার শ্রমিকেরা একটি গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়ক অবরোধ করেন। এ সময় পুলিশের সঙ্গে তাদের সংঘর্ষও হয়।