মন্ত্রীদের পিএস বা এপিএস হিসেবে বিচারকদের পদায়ন স্বাধীন বিচারব্যবস্থার পরিপন্থী

মন্ত্রীদের পিএস বা এপিএস হিসেবে বিচারকদের পদায়ন স্বাধীন বিচারব্যবস্থার পরিপন্থী

ফন্ট সাইজ:

বাংলাদেশে প্রায় সময় প্রজ্ঞাপন বা স্মারক জারি করে অধস্তন আদালতের বিচারকদের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের নির্বাহী পদে বা শীর্ষ পর্যায়ের রাজনৈতিক নেতা তথা মন্ত্রীদের একান্ত সচিব (পিএস) বা সহকারী একান্ত সচিব (এপিএস) পদে পদায়ন করা হয় বা প্রেষণে পাঠানো হয়। এই রীতি ও নিয়ম দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছে। কিন্তু বিচারকদের এভাবে নির্বাহী বিভাগে পদায়ন ও শীর্ষ পর্যায়ের রাজনীতিবিদদের সংস্পর্শে আনা এবং পূনরায় বিচার বিভাগে ফিরিয়ে নিয়ে আসা ক্ষমতার পৃথকীকরণ নীতি ও স্বাধীন বিচারব্যবস্থার ধারণার পরিপন্থী। এ ধরনের পদায়ন বিচারব্যবস্থার উপর সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলে। বিচারকদের ইস্পাত কঠিন ইন্টেগ্রিটি ধীরে ধীরে লোপ পায় এবং জনগণ বিচারব্যবস্থার প্রতি আস্থা হারায়।
অধস্তন আদালতের বিচারকদের সম্পূর্ণ আলাদা প্রক্রিয়ায় নিয়োগ দেওয়া হয়। এক সময় বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসের (বিসিএস) প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার মাধ্যমে প্রশাসন ক্যা ডার ও বিচার বিভাগে (মুন্সেফ, পরে সহকারী জজ) নিয়োগ দেয়া হলেও পরবর্তীতে বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস (বিজেএস) এর স্বতন্ত্র প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার মাধ্যমে বিচারকদের (সহকারী জজ) আলাদাভাবে নিয়োগ দেয়া শুরু হয়। এটি নি:সন্দেহে প্রশংসনীয় উদ্যোগ। কিন্তু স্বচ্ছ নিয়োগ প্রক্রিয়ার মাধ্যষমে বিচারকদের নিয়োগ দিয়ে পরবর্তীতে কেন যে তাদের নির্বাহী বিভাগে পাঠিয়ে বিচারক ও বিচার বিভাগের মর্যাদা, স্বাতন্ত্রতা ও নিরপেক্ষতা প্রশ্নবিদ্ধ করা হচ্ছে তা বোধগম্য নয়।

অধস্তন আদালতের বিচারকদের মন্ত্রীদের পিএস বা এপিএস হিসেবে প্রেষণে পাঠালে বিচার বিভাগের মর্যাদা ও নিরপেক্ষতা ক্ষুণ্ন হয়। একজন বিচারক যখন একজন রাজনৈতিক শীর্ষ নেতা যিনি নির্বাহী বিভাগের ক্ষমতাধর মন্ত্রী হয়েছেন তার ব্যক্তিগত সচিব হিসেবে ফাইলপত্র নাড়াচাড়া করেন বা দাপ্তরিক কাজের তদারকি করেন তখন বিচারক পদের যে নিরপেক্ষতা ও গাম্ভীর্যতা থাকে তা ন্যা চারালি ব্যাহত হয়, হতে বাধ্যক। সমাজ ও দেশের প্রায় সবকিছুতেই অতি রাজনীতিকরণ বিদ্যমান- এমন বাস্তবতায় পিএস, এপিএস ও মন্ত্রীদের মধ্য। একটি কানেকশন, যোগাযোগ, বোঝাপড়া ও শখ্য‍তা গড়ে ওঠে এবং ওঠা স্বাভাবিক। ভবিষ্যতে সেই পিএস ও এপিএস যখন আবার বিচারকের আসনে ফিরবেন, তখন তার দেওয়া রায়ের নিরপেক্ষতা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন উঠতে পারে, সন্দেহের উদ্রেক হওয়া স্বাভাবিক।

বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত পাবলিক কোনো সেক্টরে সুষ্ঠু ও গতিশীল প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেনি। সরকারি অফিস ও দপ্তরে জনগণের সেবা পেতে কী পরিমাণ ভোগান্তি ও হয়রানীর সম্মুখীন হতে হয় তা বলার অপেক্ষা রাখে না। সরকারি অফিসে কোনোকিছুই স্মুথলি ফাংশন করে না। কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের মধ্যে “কাস্টমার সার্ভিস মেন্টালিটি” এখনও গড়ে ওঠেনি। উপরের ফোন, লবিং, কানেকশন, ঘুষ ও উৎকোচ - এগুলো হলো সেবা নিশ্চিতের এক একটি উপাদান। এমতাবস্থায়, বিচারকরা নির্বাহী বিভাগের এমন বাস্তব পরিবেশে কাজ করে বিচার বিভাগে পুনরায় ফিরে গিয়ে নিরপেক্ষতা বজায় রেখে বিচার করতে পারবেন? পূর্বের রাজনৈতিক বস তথা মন্ত্রীরা যদি আবদার ও তদবির করেন তা কতজন এগুলো এড়িয়ে বা পাশ কাঠিয়ে তাদের নৈতিকতার উচ্চ অবস্থান বজায় রেখে বিচারকাজ চালিয়ে যেতে পারবেন?

নব্বই দশকের গোড়ার দিকে তৎকালীন প্রধান বিচারপতি সাহাবুদ্দিন আহমদ নির্বাহী বিভাগের সর্বোচ্চ পদ তথা অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির পদ তিন মাস ধারণ করে আবার তার পূর্ব পদ তথা প্রধান বিচারপতির পদে ফিরে যান। এরপর সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে তার সামনে “গোলাম আজম বনাম বাংলাদেশ” মামলাটি শুনানির জন্য আসে। তিনি চাইলে প্রধান বিচারপতি হিসেবে সেই মামলার শুনানিতে অংশগ্রহণ করতে পারতেন। কিন্তু যেহেতু তিনি নির্বাহী বিভাগের সর্বোচ্চ পদ অলংকৃত করেছেন এবং সেই সময় রাষ্ট্রের প্রধান নির্বাহী হিসেবে ঐ ফাইলটি তিনি নাড়াচাড়া করেছেন সেহেতু তিনি নিজ থেকে সেই মামালার শুনানি থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়েছেন।

অধ্যাপক গোলাম আজমের মামলার প্রধান কৌঁসুলি ব্যারিস্টার এ আর ইউসুফ নব্বই দশকের মাঝামাঝি সময়ে লন্ডন সফরে এলে তার সঙ্গে এ নিয়ে আমার দীর্ঘ কথা হয়। তাকে নিয়ে একটি সেমিনারও আয়োজন করি লন্ডনে। একান্ত আলাপচারিতায় তিনি বলেছিলেন, তৎকালীন প্রধান বিচারপতি সাহাবুদ্দিন আহমদ (যিনি কিছুদিন আগে শীর্ষ নির্বাহী পদে পদায়িত ছিলেন) যদি নিজ থেকে নিজেকে সরিয়ে না নিতেন তাহলে আমরা অবজেকশন দিতাম। সে পর্যন্ত অবশ্য যাওয়া লাগেনি কেননা বিচারপতি সাহাবুদ্দিন আহমদ নিজেই নিজেকে প্রত্যাহার করেছেন।ওই সময় আপিল বিভাগে প্রধান বিচারপতি সাহাবুদ্দিন আহমদসহ পাঁচজন বিচারপতি ছিলেন। বিচারপতি সাহাবুদ্দিন আহমদ ছাড়া বাকি চারজন বিচারপতি (যথাক্রমে বিচারপতি হাবিবুর রহমান, বিচারপতি এটিএম আফজাল, বিচারপতি মোস্তফা কামাল ও বিচারপতি লতিফুর রহমান) “গোলাম আজম বনাম বাংলাদেশ” শীর্ষক নাগরিকত্ব মামলার শুনানিতে অংশ নেন ও সর্বসম্মত রায় দেন।

বিচারপতি সাহাবুদ্দিন আহমদ যে সততা ও নিরপেক্ষতা দেখিয়েছেন সেটা এবং সেই মানের ইন্টেগ্রিটি আমরা আশা ও প্রত্যাশা করি সব বিচারকদের কাছ থেকে। বিচারপতি ও বিচারকদের মান ও অবস্থান সম্পূর্ণ আলাদা। তাদের কাছে থেকে জনগণ শুধুমাত্র ও কেবলমাত্র “ন্যায় বিচার” আশা করে। তাদের স্থান ও মর্যাদা স্রষ্টার পর (next to God)। তাইতো উচ্চ আদালতে তাদের সম্মোধন করা হয় “মাই লর্ড” বলে। এমন অবস্থানে থাকা বিচারকদের শীর্ষ পর্যায়ের রাজনৈতিক নেতা তথা মন্ত্রীদের পিএস ও এপিএস বানানো এবং পরে আবার তাদের বিচার বিভাগে ফিরিয়ে এনে বিচারকের দায়িত্বে বসানো অনেকটা বেমানান ও দৃষ্টিকটু।

বৃটেনে বিচারকদের কোনোদিন মন্ত্রীদের পিএস বা এপিএস করা হয় না। ৩৭ বছর ধরে বৃটেনে বসবাস করছি। বৃটেনে আইন পেশায় নিয়োজিত আছি বিগত প্রায় তিন দশক ধরে। বৃটেনের রাজনীতি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করি। কিন্তু কোনোদিনই দেখিনি বা শুনিনি যে, আদালতের বিচারকদের রাজনৈতিক নেতা তথা মন্ত্রীদের পিএস বা এপিএস হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়েছে বা ওই নিমিত্তে প্রেষণে পাঠানো হয়েছে। ফলে বৃটেনে একটি শক্ত ও স্বাধীন বিচারব্যবস্থা গড়ে উঠেছে যেখানে জনগণের আস্থা আকাশচুম্বি। আর এজন্যই তো বিচার বিভাগকে ও বিচারকদেরকে নির্বাহী বিভাগ বাঘের মতো ভয় পায়।

বাংলাদেশে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও নির্বাহী বিভাগ থেকে বিচার বিভাগকে পৃথকীকরণের ব্যা পারে 'মাসদার হোসেন বনাম রাষ্ট্র' মামলা একটি ঐতিহাসিক ও যুগান্তকারী মামলা। বিচার বিভাগকে নির্বাহী বিভাগ থেকে পৃথক ও স্বাধীন রাখার ব্যটপারে ১২ দফা সুনির্দিষ্ট নীতিমালা বা গাইডলাইন দেশের সর্বোচ্চ আদালত তথা সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ দিয়েছেন। বিচারকদের এভাবে মন্ত্রীদের পিএস বা এপিএস হিসেবে পদায়ন করা সর্বোচ্চ আদালতের ওই ১২ দফা নির্দেশনার পরিপন্থী। তাছাড়া এটি ২০২৫ সালের জুডিশিয়াল সার্ভিস গঠন বিধিমালার আওতা ও পরিধিরও বাইরে।

বিচারকদের নির্বাহী বিভাগের পদায়ন বা মন্ত্রী পদদারী শীর্ষ রাজনৈতিক ব্যধক্তিদের পিএস ও এপিএস করা ক্ষমতা স্বতন্ত্রীকরণ নীতির লঙ্ঘন। বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী বিচার বিভাগ ও নির্বাহী বিভাগ সম্পূর্ণ পৃথক। সংবিধানের ২২ অনুচ্ছেদে স্পষ্ট করে বলা আছে “The Sate shall ensure the separation of the judiciary from the executive organs of the State” (অর্থাৎ “রাষ্ট্রের নির্বাহী অঙ্গসমূহ হইতে বিচার বিভাগের পৃথকীকরণ রাষ্ট্র নিশ্চিত করিবেন”)। একজন বিচারককে নির্বাহী বিভাগের রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব তথা মন্ত্রীর অধীনে পিএস বা এপিএস হিসেবে কাজ করতে দেওয়া এই সাংবিধানিক কাঠামোর মৌলিক ধারণার সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ ও সাংঘর্ষিক।
মন্ত্রীদের পিএস ও এপিএস পদের জন্যক যত লোকবল প্রয়োজন এডমিন তথা প্রশাসন ক্যাডার থেকে নেয়া হোক। প্রয়োজনে এডমিন ক্যা ডারে বিসিএসের মাধ্যমে আরো বেশি লোকবল নিয়োগ দেয়া হোক। ২০ কোটি মানুষের মধ্য থেকে দক্ষ প্রশাসনিক কর্মকর্তা নিয়োগ দেয়া কোনো ব্যা পারই না। আইনি জ্ঞান ও অভিজ্ঞতাসম্পন্ন লোক মন্ত্রীদের পিএস বা এপিএস দরকার হলে প্রতিযোগিতামূলক স্বতন্ত্র পরীক্ষার মাধ্যঞমে আইনজীবীদের মধ্য থেকেও নিয়োগ দেয়া যেতে পারে। দেশের স্বাধীন ও নিরপেক্ষ বিচারব্যবস্থার স্বার্থে, ন্যায় বিচারের লক্ষ্যে এবং সর্বোপরি জনগণের সর্বশেষ আশ্রয়স্থল বিচার বিভাগের প্রতি মানুষের আস্থার স্বার্থে বিচারকদের নির্বাহী বিভাগে পদানত বা প্রেষণে প্রেরণ করা বন্ধ হোক। এই সংস্কৃতি বিচার বিভাগকে দীর্ঘ মেয়াদে ধুঁকে ধুঁকে ক্ষতি করে যা হয়তো তাৎক্ষণিকভাবে তেমনটা বোঝা যায় না।

নাজির আহমদ: বিশিষ্ট আইনজীবী, রাষ্ট্রচিন্তক, সংবিধান বিশেষজ্ঞ, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী এবং ইংল্যান্ডের প্র্যাকটিসিং ব্যারিস্টার।

Email:
[email protected]