২০২৬ সালের এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফলাফল বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার গুণগত মান, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা এবং সামাজিক বৈষম্য নিয়ে নতুন করে ভাবনার অবকাশ তৈরি করেছে। এ বছর ১১টি শিক্ষা বোর্ডে গড় পাসের হার ৫২.১২ শতাংশ, যা ২০২৫ সালের ৫৮.৮৩ শতাংশের তুলনায় ৬.৭১ শতাংশ পয়েন্ট কম। জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৬৯ হাজার ৯৭ থেকে কমে ৪০ হাজার ৮৪ হয়েছে। একই সময়ে শূন্য পাস করা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ২০২ থেকে বেড়ে ২৯৩ হয়েছে এবং শতভাগ পাস করা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ৩৪৫ থেকে কমে ১৩৯-এ দাঁড়িয়েছে। এসব তথ্য শিক্ষাব্যবস্থার বিভিন্ন স্তরে বিদ্যমান সমস্যার প্রতি সতর্কবার্তা দেয়।
এই ফলাফল বিশ্লেষণে ইতিহাসবিদ এডওয়ার্ড গিবন, আর্নল্ড টয়েনবি ও এরিক হবসবমের চিন্তাপদ্ধতি প্রাসঙ্গিক। গিবনের দৃষ্টিতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কার্যকারিতা, প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা পরীক্ষা করা প্রয়োজন। একটি প্রতিষ্ঠান কাগজে-কলমে টিকে থাকলেই তার শিক্ষাদানের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালিত হচ্ছে, এমন নয়। টয়েনবির ‘চ্যালেঞ্জ ও সাড়া’ তত্ত্ব মনে করিয়ে দেয়, সংকটের মুখে নেতৃত্ব ও প্রতিষ্ঠান কতটা কার্যকর উদ্যোগ নিতে পারে, সেটিই তাদের সক্ষমতার পরীক্ষা। অন্যদিকে হবসবমের সামাজিক ইতিহাসের আলোকে শিক্ষার সুযোগ ও ফলাফলের সঙ্গে শ্রেণি, অর্থনৈতিক অবস্থা এবং সম্পদ বণ্টনের সম্পর্ক বিবেচনা করতে হয়।
বাংলাদেশে শিক্ষার প্রবেশাধিকার বেড়েছে, বিশেষ করে মেয়েদের অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। এ বছর পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারী ছাত্রীদের সংখ্যা ছাত্রদের চেয়ে ২৬ হাজার ৬৪৫ জন বেশি। এটি ইতিবাচক সামাজিক পরিবর্তনের পরিচায়ক। তবে শিক্ষায় অংশগ্রহণ বাড়লেই মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত হয় না। শহর ও গ্রামের প্রতিষ্ঠান, সচ্ছল ও দরিদ্র পরিবার এবং বিভিন্ন অঞ্চলের শিক্ষার্থীদের মধ্যে শিক্ষক, প্রযুক্তি, গ্রন্থাগার, পরীক্ষাগার, কোচিং ও পারিবারিক সহায়তার সুযোগে বড় পার্থক্য রয়েছে। ফলে একই পরীক্ষায় অংশ নিলেও সবাই সমান প্রস্তুতি নিয়ে প্রতিযোগিতা করে না।
শিক্ষাব্যবস্থার আরেকটি সমস্যা হলো পরীক্ষাকেন্দ্রিকতা। মুখস্থনির্ভর শিক্ষা ও কোচিং-নির্ভর প্রস্তুতি শিক্ষার্থীর বিশ্লেষণী ক্ষমতা, সৃজনশীলতা ও বাস্তব দক্ষতা বিকাশে বাধা সৃষ্টি করে। জন ডিউই ও পাওলো ফ্রেইরের শিক্ষাদর্শন অনুসারে শিক্ষার উদ্দেশ্য হওয়া উচিত প্রশ্ন করতে শেখানো, যুক্তি তৈরি করা এবং অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে জ্ঞান অর্জন করা।
এই সংকটের দায় শুধু শিক্ষার্থীর নয়। শিক্ষক নিয়োগ ও প্রশিক্ষণ, প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা, শিক্ষা বোর্ডের তদারকি, প্রশাসনিক জবাবদিহি এবং রাষ্ট্রীয় নীতির কার্যকারিতা—সবকিছু পর্যালোচনা করতে হবে। বন্যা, মহামারি ও প্রযুক্তিগত বৈষম্যের মতো চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় শিক্ষাব্যবস্থার প্রস্তুতিও জরুরি।
অতএব, ২০২৬ সালের ফলাফলকে আতঙ্ক বা দায় চাপানোর উপলক্ষ না করে সংস্কারের সুযোগ হিসেবে নিতে হবে। শূন্য পাস করা ২৯৩টি প্রতিষ্ঠানের কারণ অনুসন্ধান, পূর্ণাঙ্গ তথ্য প্রকাশ, শিক্ষক প্রশিক্ষণ, মূল্যায়ন পদ্ধতির সংস্কার, দুর্বল শিক্ষার্থীদের সহায়তা এবং অঞ্চলভিত্তিক বৈষম্য কমানো জরুরি। শিক্ষার প্রকৃত সাফল্য শুধু পরীক্ষায় পাস বা সনদ অর্জনে নয়; বরং জ্ঞান, যুক্তিবোধ, দক্ষতা ও দায়িত্বশীল নাগরিকত্ব গড়ে তোলার মধ্যেই নিহিত। বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে এই সংকেতগুলোকে রাষ্ট্র, প্রতিষ্ঠান ও সমাজ কতটা গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণ করে তার ওপর।
লেখক : প্রফেসর ও চেয়ারম্যান, রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় এবং নির্বাহী পরিচালক, চট্টগ্রাম সেন্টার ফর রিজিওনাল স্টাডিজ বাংলাদেশ (সিসিআরএসবিডি)।
