আলজেরিয়ার ১৯৫৪ সালের মুক্তিবিপ্লব বিশ্বজুড়ে উপনিবেশবিরোধী আন্দোলন ও মুক্তিসংগ্রামে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব রেখেছে বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশে নিযুক্ত দেশটির রাষ্ট্রদূত ড. আবদেলওয়াহাব সাইদানি। তিনি বলেন, আলজেরিয়ার স্বাধীনতাসংগ্রাম শুধু একটি দেশের মুক্তির লড়াই ছিল না, এটি আন্তর্জাতিক রাজনীতির গতিপথ এবং আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের ধারণায়ও পরিবর্তন এনেছে।
শনিবার রাজধানীর একটি হোটেলে ‘আন্তর্জাতিক সম্পর্কে ১৯৫৪ সালের ১ নভেম্বরের আলজেরীয় বিপ্লবের সুদূরপ্রসারী প্রভাব’ শীর্ষক এক আলোচনায় তিনি এসব কথা বলেন। আলজেরিয়ার মুক্তিবিপ্লবের ৭২তম বার্ষিকী উপলক্ষ্যে এই আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়।
রাষ্ট্রদূত বলেন, ফ্রান্সের ১৩২ বছরের ঔপনিবেশিক শাসনের অবসান ঘটাতে আলজেরিয়ার মানুষকে বিপুল আত্মত্যাগ করতে হয়েছে। এই বিপ্লব শুধু দেশটির স্বাধীনতা অর্জনেই ভূমিকা রাখেনি, আন্তর্জাতিক কূটনীতি, মানবাধিকার এবং রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্বের ধারণাকেও প্রভাবিত করেছে।
তিনি বলেন, আলজেরিয়ার স্বাধীনতাযুদ্ধ ফ্রান্সের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় বড় সংকট তৈরি করেছিল। দীর্ঘ যুদ্ধ, ঔপনিবেশিক নীতি নিয়ে বিভক্তি এবং সামরিক ও বসতি স্থাপনকারীদের চাপের মুখে ১৯৫৮ সালে দেশটির চতুর্থ প্রজাতন্ত্রের পতন ঘটে। প্রতিষ্ঠিত হয় পঞ্চম প্রজাতন্ত্র।
রাষ্ট্রদূত আরও বলেন, আলজেরিয়ার জাতীয় মুক্তিফ্রন্ট (এফএলএন) সশস্ত্র প্রতিরোধের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক কূটনীতিকেও স্বাধীনতার আন্দোলনে কাজে লাগায়। জাতিসংঘে আলজেরিয়ার স্বাধীনতার দাবি তুলে ধরে তারা বিষয়টিকে আন্তর্জাতিক আলোচনায় নিয়ে আসে। ১৯৬০ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে উপনিবেশাধীন দেশ ও জনগণের স্বাধীনতার অধিকারসংক্রান্ত প্রস্তাব গৃহীত হওয়ার পেছনেও এই সংগ্রামের গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ছিল।
আলজেরিয়ার বিপ্লব আফ্রিকা ও এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সংহতি জোরদার করেছিল উল্লেখ করে তিনি বলেন, ১৯৫৫ সালের বান্দুং সম্মেলনে উপনিবেশবাদের বিরোধিতা ও স্বাধীনতাকামী জনগণের প্রতি সমর্থনের যে অবস্থান তৈরি হয়, আলজেরিয়ার সংগ্রাম তার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। স্বাধীনতার পর আলজেরিয়া বিভিন্ন দেশের মুক্তি আন্দোলনের সমর্থন ও সহযোগিতার কেন্দ্র হয়ে ওঠে।
স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় নির্যাতন, জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতি ও বেসামরিক মানুষের ওপর সহিংসতা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আলোচনাকেও প্রভাবিত করে বলে উল্লেখ করেন রাষ্ট্রদূত। তিনি বলেন, আলজেরিয়ার বিপ্লবের শিক্ষা হলো, সামরিক শক্তি দিয়ে সব সময় রাজনৈতিক সংকটের সমাধান সম্ভব নয়। জনগণের অধিকার, মর্যাদা ও রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষাকে স্বীকৃতি দিতে হয়।
বাংলাদেশের স্বাধীনতার প্রসঙ্গ টেনে রাষ্ট্রদূত বলেন, আত্মত্যাগ, মর্যাদা ও আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের সঙ্গে বাংলাদেশের মানুষের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। বাংলাদেশ ও আলজেরিয়ার বন্ধুত্ব আরও জোরদার হবে বলেও আশা প্রকাশ করেন তিনি।
