আমরা কি শিক্ষিত মানুষ তৈরি করছি, নাকি শুধু সার্টিফিকেটধারী?

আমরা কি শিক্ষিত মানুষ তৈরি করছি, নাকি শুধু সার্টিফিকেটধারী?

ফন্ট সাইজ:

এআই বদলে দিচ্ছে পৃথিবী । আর আমরা! পড়ে আছি সনদের পেছনে। শিক্ষাব্যবস্থা কি কেবল পরীক্ষার্থী তৈরি করছে, দক্ষ মানুষ নয়? বদলে যাচ্ছে চাকরির বাজার, গুরুত্ব বাড়ছে যোগ্যতা ও সৃজনশীলতার। সনদনির্ভর শিক্ষার ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে ভাবার সময় এখনই।

কোন বোর্ডে পাসের হার কত, কতজন জিপিএ-৫ পেল, কে প্রথম হলো, কোন শিক্ষার্থী কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির পরীক্ষায় শীর্ষস্থান অর্জন করল, এসব নিয়ে সংবাদমাধ্যমে বিস্তর আলোচনা হয়। কিন্তু এই আলোচনার ভিড়ে একটি মৌলিক প্রশ্ন প্রায়ই হারিয়ে যায়: আমাদের শিক্ষার্থীরা আসলে কী শিখছে? তারা ভবিষ্যতের পৃথিবীর জন্য কতটা প্রস্তুত হচ্ছে?
২০২৬ সালের এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফলাফল সেই প্রশ্নটিকে নতুন করে সামনে এনেছে। ১১টি শিক্ষা বোর্ডে পাসের হার ৫২ দশমিক ১২ শতাংশ। অর্থাৎ পরীক্ষায় অংশ নেওয়া প্রায় অর্ধেক শিক্ষার্থী উত্তীর্ণ হতে পারেনি। মোট অকৃতকার্য হয়েছে ৫ লাখ ৯৪ হাজার ১১৩ জন। গত বছর পাসের হার ছিল ৫৮ দশমিক ৮৩ শতাংশ। দুই বছরের ব্যবধানে ২০২৪ সালের ৭৭ দশমিক ৭৮ শতাংশ থেকে পাসের হার নেমে এসেছে ৫২ দশমিক ১২ শতাংশে। জিপিএ-৫ পাওয়ার সংখ্যাও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।

এই ফলাফলকে শুধু শিক্ষার্থীদের ব্যর্থতা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং এটি আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা, পাঠদান পদ্ধতি, মূল্যায়ন প্রক্রিয়া, শিক্ষক-শিক্ষার্থী সম্পর্ক এবং সামগ্রিক শিক্ষার পরিবেশ নিয়ে গভীরভাবে ভাবার উপলক্ষ। পাঁচ লাখের বেশি শিক্ষার্থী অকৃতকার্য হওয়ার অর্থ পাঁচ লাখের বেশি পরিবারে হতাশা, অনিশ্চয়তা ও উদ্বেগ তৈরি হওয়া। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এত বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী কি হঠাৎ করেই অযোগ্য হয়ে গেল? নাকি দীর্ঘদিনের কোনো কাঠামোগত দুর্বলতা এবার ফলাফলে দৃশ্যমান হয়েছে?

এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট করা জরুরি। পরীক্ষায় পাসের হার কম হলেই শিক্ষার মান বেড়েছে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। আবার পাসের হার বেশি হলেই শিক্ষার্থীরা বেশি শিখেছে, সেটিও নিশ্চিত নয়। অতীতে পাসের হার ও জিপিএ-৫ বাড়ানোর প্রবণতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এবার উত্তরপত্র মূল্যায়নে কঠোরতা ও নির্মোহতার কথা বলা হয়েছে। যদি সত্যিই মূল্যায়ন প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও মানদণ্ড বজায় রাখা হয়ে থাকে, তাহলে সেটি ইতিবাচক। কিন্তু প্রকৃত মূল্যায়ন নিশ্চিত করার পাশাপাশি শিক্ষার্থীরা যেন প্রয়োজনীয় শিক্ষা ও সহায়তা পায়, সেটিও রাষ্ট্রের দায়িত্ব।

আন্তর্জাতিক তুলনায় বাংলাদেশের অবস্থানও কিছু প্রশ্ন তৈরি করে। ভারতের কেন্দ্রীয় মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের দ্বাদশ শ্রেণির পরীক্ষায় ২০২৬ সালে পাসের হার ৮৫ দশমিক ২০ শতাংশ। শ্রীলঙ্কা, পাকিস্তান, দক্ষিণ আফ্রিকা ও জর্ডানের উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের পরীক্ষার ফলেও বাংলাদেশের সঙ্গে পার্থক্য দেখা যায়। অবশ্য এসব পরীক্ষার পাঠ্যক্রম, মূল্যায়ন পদ্ধতি ও পাসের শর্ত এক নয়। তাই সরাসরি তুলনা করে কোনো দেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে ভালো বা খারাপ ঘোষণা করা ঠিক হবে না। কিন্তু বাংলাদেশের ফলাফলের ধারাবাহিক অবনতি যে উদ্বেগের কারণ হতে পারে, তা অস্বীকার করার উপায় নেই।

এই উদ্বেগের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরেকটি বড় পরিবর্তন। সেটি হলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের দ্রুত বিস্তার। পৃথিবী এমন এক সময়ের দিকে এগোচ্ছে, যখন শুধু ডিগ্রি কিংবা প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পরিচয় দিয়ে কর্মক্ষেত্রে টিকে থাকা কঠিন হয়ে উঠতে পারে। যে কাজ একসময় করতে একজন দক্ষ ওয়েব ডেভেলপার, গ্রাফিক ডিজাইনার কিংবা লেখকের প্রয়োজন হতো, এখন তার অনেক কিছুই এআইয়ের সহায়তায় অল্প সময়ে করা সম্ভব হচ্ছে। একটি ওয়েবসাইট তৈরি, ভিডিওর থাম্বনেইল বানানো, প্রচ্ছদের নকশা করা, লেখা সম্পাদনা কিংবা তথ্য বিশ্লেষণের মতো কাজে এআই ইতোমধ্যে বড় পরিবর্তন এনেছে।

পাঁচ-সাত বছর আগেও যে প্রযুক্তিগত সক্ষমতা সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে ছিল, এখন তার অনেকটাই স্মার্টফোন ও ইন্টারনেটের মাধ্যমে সহজলভ্য। একজন শিক্ষার্থী নিজেই ওয়েবসাইট তৈরি করতে পারে, গ্রাফিক ডিজাইনের প্রাথমিক কাজ করতে পারে, নতুন কোনো বিষয়ে ধারণা নিতে পারে কিংবা নিজের ব্যবসার জন্য প্রয়োজনীয় উপকরণ তৈরি করতে পারে। ফলে শুধু তথ্য মুখস্থ করা বা তাত্ত্বিক জ্ঞান অর্জন করাই ভবিষ্যতের কর্মবাজারে যথেষ্ট হবে না।

তবে এখানেই একটি সতর্কতা প্রয়োজন। এআই এসেছে বলে বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি কিংবা প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার প্রয়োজন শেষ হয়ে যাচ্ছে! এমন সিদ্ধান্তও বাস্তবসম্মত নয়। চিকিৎসক, প্রকৌশলী, গবেষক, আইনজীবী কিংবা শিক্ষক তৈরির ক্ষেত্রে সুসংগঠিত শিক্ষা, প্রশিক্ষণ, নৈতিকতা ও পেশাগত মানদণ্ডের গুরুত্ব থাকবে। বরং পরিবর্তনটি হচ্ছে শিক্ষার উদ্দেশ্য ও পদ্ধতিতে। শুধু সনদ অর্জনের জন্য শিক্ষা নয়, বাস্তব সমস্যা সমাধানের সক্ষমতা তৈরির জন্য শিক্ষা। এই পরিবর্তনটিই এখন সবচেয়ে জরুরি।

কর্মক্ষেত্রেও নিয়োগদাতাদের চাহিদা বদলাচ্ছে। একটি ডিগ্রি কোনো ব্যক্তির নির্দিষ্ট বিষয়ে পড়াশোনা করার প্রমাণ দিতে পারে, কিন্তু তিনি বাস্তবে কতটা দক্ষ, নতুন পরিস্থিতিতে কতটা দ্রুত শিখতে পারেন, প্রযুক্তির সঙ্গে কতটা মানিয়ে নিতে পারেন কিংবা একটি সমস্যার কার্যকর সমাধান দিতে পারেন, সেটি শুধু সনদ দেখে বোঝা সম্ভব নয়। তাই দক্ষতা, অভিজ্ঞতা, সৃজনশীলতা, যোগাযোগক্ষমতা এবং সমস্যা সমাধানের যোগ্যতা ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

ইউরোপের বিভিন্ন দেশের উচ্চশিক্ষা ও কর্মসংস্থানের অভিজ্ঞতা থেকেও এই পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া যায়। সেখানে অনেক ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম কিংবা সনদের চেয়ে আবেদনকারীর বাস্তব দক্ষতা, কাজের অভিজ্ঞতা এবং নির্দিষ্ট দায়িত্ব পালনের সক্ষমতাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। তবে সব দেশ, সব প্রতিষ্ঠান কিংবা সব পেশায় একই চিত্র নয়। যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যসহ অনেক জায়গায় এখনো বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচিতি ও ডিগ্রির প্রভাব রয়েছে। কাজেই সনদের মূল্য একেবারে শেষ হয়ে গেছে বলা যাবে না। বরং সনদ একা আর সাফল্যের নিশ্চয়তা দিতে পারছে না।

বাংলাদেশের সমস্যাটি হলো, আমরা এখনো শিক্ষাকে অনেকাংশে পরীক্ষার ফলাফল, জিপিএ এবং সার্টিফিকেটের মধ্যে আটকে রেখেছি। পরিবার সন্তানের ভালো ফল চায়, শিক্ষার্থী ভালো ফলের জন্য কোচিং করে, প্রতিষ্ঠান ভালো ফলের বিজ্ঞাপন দেয়, আর সংবাদমাধ্যমও ফলাফলের পরিসংখ্যানকে বড় খবর হিসেবে উপস্থাপন করে। কিন্তু এই পুরো প্রক্রিয়ায় শেখার আনন্দ, অনুসন্ধিৎসা, সৃজনশীলতা ও বাস্তব দক্ষতার জায়গা কোথায়?

একজন শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় প্রথম হলেন, এরপর তিনি কোথায় গেলেন? এ নিয়ে সংবাদ হতে পারে। কিন্তু একইভাবে একজন শিক্ষার্থী ভর্তি পরীক্ষায় অনেক পেছনে থেকেও নিজের দক্ষতা, উদ্ভাবনী চিন্তা কিংবা উদ্যোক্তা হওয়ার সক্ষমতা দিয়ে কীভাবে এগিয়ে গেলেন, সেই গল্পও গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের সংবাদমাধ্যমে পরীক্ষায় প্রথম হওয়া শিক্ষার্থীদের নিয়ে আগ্রহ আছে, কিন্তু ব্যতিক্রমী দক্ষতা অর্জনকারী তরুণদের নিয়ে সেই মাত্রার অনুসন্ধান কতটা রয়েছে? সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে সংবাদমাধ্যমেরও দায়িত্ব আছে।

এখানে অভিভাবকদের ভূমিকা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। একটি পরীক্ষায় খারাপ ফল করলেই সন্তানকে ব্যর্থ, অযোগ্য কিংবা পরিবারের বোঝা মনে করা ভয়াবহ ভুল। আমাদের সমাজে পরীক্ষার ফলাফলকে কেন্দ্র করে যে মানসিক চাপ তৈরি হয়, তা অনেক শিক্ষার্থীর আত্মবিশ্বাস নষ্ট করে দেয়। অথচ একটি পরীক্ষার ফলাফল কোনো মানুষের সামগ্রিক মেধা, যোগ্যতা কিংবা ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করতে পারে না।

ইতিহাসেও এর অসংখ্য উদাহরণ রয়েছে। আলবার্ট আইনস্টাইন জীবনের একটি পর্যায়ে জুরিখের ফেডারেল পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারেননি। পরে আবার চেষ্টা করে উচ্চশিক্ষার পথ তৈরি করেন এবং আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিজ্ঞানীতে পরিণত হন। স্টিভ জবস ও বিল গেটস বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রচলিত শিক্ষাজীবন সম্পন্ন করেননি। কিন্তু তাঁদের অভিজ্ঞতাকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা অপ্রয়োজনীয় হওয়ার প্রমাণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং এসব ঘটনা দেখায়, জীবনে সাফল্যের পথ একটিমাত্র নয়। শিক্ষা, আগ্রহ, উদ্ভাবন, অধ্যবসায় ও বাস্তব অভিজ্ঞতা মিলেই একজন মানুষের সক্ষমতা তৈরি হয়।

এইচএসসিতে অকৃতকার্য হওয়া শিক্ষার্থীদের জন্যও এখন সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ তৈরি করা। এক বা দুই বিষয়ে অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের এক বছর অপেক্ষা না করিয়ে দ্রুত পুনরায় পরীক্ষার সুযোগ দেওয়ার উদ্যোগ ইতিবাচক। এতে অনেক শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবন থেকে একটি বছর বাঁচতে পারে। তবে শুধু পুনঃপরীক্ষার সুযোগ দিলেই দায়িত্ব শেষ হবে না। কেন এত শিক্ষার্থী অকৃতকার্য হলো, কোন বিষয়ে তাদের দুর্বলতা বেশি, পাঠদানের কোথায় ঘাটতি রয়েছে, মূল্যায়ন পদ্ধতিতে কোনো সমস্যা আছে কি না—এসব বিষয় বিশ্লেষণ করতে হবে।

একই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে দেখতে হবে। পরিবার, শিক্ষক ও সমাজের উচিত অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়ানো। তাদের অপমান করা, অন্যের সঙ্গে তুলনা করা কিংবা ভবিষ্যৎ নিয়ে ভয় দেখানো কোনো সমাধান নয়। বরং কোথায় দুর্বলতা রয়েছে, কীভাবে নতুন করে প্রস্তুতি নেওয়া যায় এবং কোন বিকল্প শিক্ষার পথ খোলা আছে, তা বুঝতে সহায়তা করতে হবে।

রাষ্ট্রের দায়িত্বও কম নয়। শিক্ষাব্যবস্থায় সংস্কারের কথা বহুবার বলা হয়েছে। কিন্তু বাস্তব সংস্কার বলতে শুধু পাঠ্যবই পরিবর্তন কিংবা পরীক্ষার নিয়ম বদলানো বোঝায় না। প্রয়োজন এমন শিক্ষাব্যবস্থা, যেখানে শিক্ষার্থী মুখস্থবিদ্যার পরিবর্তে বিশ্লেষণ, যুক্তি, গবেষণা, যোগাযোগ, প্রযুক্তি ব্যবহার ও সমস্যা সমাধান শিখবে। বিদ্যালয় ও কলেজে পর্যাপ্ত শিক্ষক, আধুনিক পাঠদান উপকরণ, বিজ্ঞানাগার, গ্রন্থাগার এবং ব্যবহারিক শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। শিক্ষকদেরও নিয়মিত প্রশিক্ষণ দিতে হবে, যাতে তাঁরা পরিবর্তিত প্রযুক্তি ও কর্মবাজারের সঙ্গে তাল মিলিয়ে শিক্ষার্থীদের প্রস্তুত করতে পারেন।

বিশেষ করে এআইয়ের যুগে প্রযুক্তিকে ভয় পাওয়ার পরিবর্তে তা ব্যবহারের সক্ষমতা তৈরি করতে হবে। তবে প্রযুক্তি ব্যবহারের পাশাপাশি তথ্যের সত্যতা যাচাই, ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা, কপিরাইট, নৈতিকতা এবং প্রযুক্তির সীমাবদ্ধতা সম্পর্কেও শিক্ষার্থীদের ধারণা দিতে হবে। এআইয়ের দেওয়া উত্তর মুখস্থ করা শিক্ষা নয়; সেই উত্তর যাচাই করা, তার ভুল ধরতে পারা এবং প্রয়োজনে আরও ভালো সমাধান তৈরি করাই প্রকৃত দক্ষতা।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার মর্যাদা। বাংলাদেশে এখনো অনেক পরিবার মনে করে, সাধারণ শিক্ষার বাইরে অন্য কোনো পথ বেছে নেওয়া মানে পিছিয়ে পড়া। এই ধারণা বদলাতে হবে। দক্ষ ইলেকট্রিশিয়ান, ওয়েল্ডার, প্লাম্বার, কৃষি উদ্যোক্তা, রন্ধনশিল্পী, ডিজিটাল কনটেন্ট নির্মাতা কিংবা প্রযুক্তি প্রশিক্ষিত কর্মীরও সমাজ ও অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে। দক্ষতা থাকলে একজন মানুষ চাকরির পাশাপাশি নিজেই কর্মসংস্থান তৈরি করতে পারেন। তবে এসব পেশায় প্রবেশের জন্য মানসম্মত প্রশিক্ষণ, স্বীকৃতি এবং ন্যায্য পারিশ্রমিক নিশ্চিত করাও জরুরি।

আমাদের মনে রাখতে হবে, সব শিক্ষার্থীর লক্ষ্য বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, সরকারি কর্মকর্তা কিংবা করপোরেট চাকরিজীবী হওয়া নয়। প্রত্যেকের আগ্রহ, সক্ষমতা ও সম্ভাবনা আলাদা। শিক্ষাব্যবস্থার কাজ হওয়া উচিত সেই সম্ভাবনা চিহ্নিত করা এবং বিকাশের সুযোগ তৈরি করা। শুধু একটি নির্দিষ্ট ধরনের সাফল্যকে সামাজিক মর্যাদার মানদণ্ড বানিয়ে রাখলে বিপুলসংখ্যক তরুণের সম্ভাবনা অঙ্কুরেই বিনষ্ট হবে।

বাংলাদেশের সামনে এখন দুটি বড় চ্যালেঞ্জ। প্রথমটি হলো বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থার দুর্বলতা দূর করে শিক্ষার্থীদের প্রকৃত শেখার সুযোগ নিশ্চিত করা। দ্বিতীয়টি হলো দ্রুত পরিবর্তনশীল প্রযুক্তিনির্ভর পৃথিবীর জন্য নতুন প্রজন্মকে প্রস্তুত করা। এই দুই চ্যালেঞ্জ পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কিত। আমরা যদি এখনো শিক্ষাকে শুধু পরীক্ষার ফল ও সনদের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখি, তাহলে ভবিষ্যতের কর্মবাজারে আমাদের তরুণদের প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা কঠিন হবে।

এইচএসসির ফলাফলে যারা উত্তীর্ণ হয়েছে, তাদের অভিনন্দন। যারা হয়নি, তাদের জন্যও ভবিষ্যতের দরজা বন্ধ হয়ে যায়নি। একটি পরীক্ষার ফলাফল জীবনের একটি অধ্যায়ের সমাপ্তি হতে পারে, পুরো জীবনের নয়। তবে এই ব্যর্থতার দায় শুধু শিক্ষার্থীদের কাঁধে চাপিয়ে দিয়ে রাষ্ট্র, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সমাজ দায় এড়াতে পারে না।

সবশেষে প্রশ্নটি তাই শুধু কতজন পাস করল, কতজন ফেল করল, তা নয়। প্রশ্ন হলো, আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা কতজন মানুষ তৈরি করতে পারছে, যারা নিজের চিন্তায় সিদ্ধান্ত নিতে পারে, বাস্তব সমস্যার সমাধান করতে পারে, নতুন প্রযুক্তি ব্যবহার করতে পারে এবং পরিবর্তিত পৃথিবীতে নিজের জায়গা তৈরি করতে পারে?

সনদ দরকার, উচ্চশিক্ষাও দরকার। কিন্তু সনদ যেন শিক্ষার বিকল্প না হয়ে ওঠে। কারণ ভবিষ্যতের পৃথিবীতে কেবল কী পড়েছেন, তা নয়, কী জানেন, কী পারেন এবং সেই জ্ঞান দিয়ে কী করতে পারেন, সেটিই ক্রমশ বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে এই বাস্তবতা বুঝতে হবে এখনই। নইলে আমরা হয়তো প্রতিবছর লাখ লাখ সনদ বিতরণ করব, কিন্তু সেই সনদ হাতে নিয়ে কর্মহীন তরুণের সংখ্যা কমাতে পারব না।

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও কলামিস্ট
E-mail: [email protected]