এক বিকালের বজ্রপাত তছনছ করে দিয়েছে ছয়টি জীবন, কেড়ে নিয়েছে ছয়টি পরিবারের স্বপ্ন। কেউ মাত্র ১০ বছরের শিশু, কেউ কিশোর, কেউবা তরুণ। শুক্রবার দুপুরেও যারা মাছ ধরতে গিয়েছিল সোনাপাতি বিলে, বিকালের বজ্রপাতে তাদের নিথর দেহ ফিরেছে বাড়িতে। শনিবার সকালে একই গোরস্থানে পাশাপাশি ছয়টি কবরে চিরনিদ্রায় শায়িত হয়েছেন তারা। স্বজনদের কান্না আর আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠেছে পাবনা সদর উপজেলার মালঞ্চি ইউনিয়নের আকাশ-বাতাস। এই শোকের মধ্যে সবচেয়ে মর্মান্তিক বিষয়, নিহতদের মধ্যে একই পরিবারের তিন ভাইয়ের সন্তান ও এক ভাগ্নে রয়েছে। এক দুর্ঘটনায় পরিবারের এতগুলো তরুণ প্রাণ হারিয়ে স্বজনদের জীবনে নেমে এসেছে অপূরণীয় শূন্যতা। যে পরিবারে একসঙ্গে বেড়ে ওঠা, হাসি-আনন্দ আর ভবিষ্যতের স্বপ্ন ছিল, সেই পরিবারেই এখন প্রিয়জন হারানোর হাহাকার। শনিবার সকাল ১০টায় মালঞ্চি ইউনিয়নের মহাদেবপুর গোরস্থান মাঠে নিহত ছয়জনের জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজায় স্বজনদের পাশাপাশি স্থানীয় বাসিন্দারাও অংশ নেন।
পরে একই গোরস্থানে সারিবদ্ধভাবে ছয়জনকে দাফন করা হয়। পাশাপাশি ছয়টি কবর যেন একসঙ্গে নিভে যাওয়া ছয়টি জীবনের করুণ স্মৃতি হয়ে রইল। নিহতরা হলেনÑ মালঞ্চি ইউনিয়নের গজমতিকুণ্ডা এলাকার রবিউল ইসলামের ছেলে শাওন (২৪), নলমুড়া এলাকার ইসমাইল মোল্লার ছেলে রব্বেল মোল্লা (২০), শাজাহান প্রামাণিকের ছেলে মিজানুর রহমান (১০), নাজিম উদ্দিনের ছেলে সাজিদ (১৪), শাহাদুলের ছেলে আব্দুল্লাহ (১৮) এবং ইবাদুলের ছেলে ইমন (১৪)। স্থানীয় ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, শুক্রবার দুপুরে বিভিন্ন এলাকা থেকে কয়েকজন সোনাপাতি বিলে মাছ ধরতে যান। বিকালে বৃষ্টি শুরু হলে নয়জন বিলের মধ্যে একটি টং বা মাচাল ঘরে আশ্রয় নেন। এ সময় আকস্মিক বজ্রপাতে ঘটনাস্থলেই ছয়জনের মৃত্যু হয়। গুরুতর আহত হন আরও তিনজন।
আহতরা হলেনÑ সিয়াম (১৯), সাদাত (২০) ও রিপন (২৪)। তাদের মধ্যে সিয়াম ও সাদাতের শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে উন্নত চিকিৎসার জন্য রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। অপর আহত রিপনের চিকিৎসা চলছে। বজ্রপাতের পর বেশ কিছুক্ষণ টং ঘরের মধ্যেই পড়ে ছিলেন হতাহতরা। সন্ধ্যার দিকে আশপাশের লোকজন বিষয়টি জানতে পেরে সেখানে ছুটে যান। পরে নিহতদের মরদেহ উদ্ধার করা হয় এবং আহতদের হাসপাতালে নেয়া হয়। একটি সাধারণ বিকাল কীভাবে মুহূর্তেই এতগুলো পরিবারের জীবনে চিরস্থায়ী শোকের কারণ হয়ে উঠতে পারে, তারই নির্মম সাক্ষী এখন মালঞ্চি ইউনিয়ন। পরিবারের সদস্যদের কাছে এই হারানোর বেদনা কোনো সান্ত্বনাতেই পূরণ হওয়ার নয়। একই পরিবারের তিন ভাইয়ের সন্তান ও ভাগ্নের মৃত্যু শোককে আরও গভীর করেছে। পরিবারের একাধিক তরুণ সদস্যকে একসঙ্গে হারানোর এই ক্ষতি কতোটা অসহনীয়, তা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। এদিকে বজ্রপাতে নিহত ও আহতদের পরিবারকে সরকারি আর্থিক সহায়তা দেয়া হয়েছে।
পাবনা সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তামারা তাসবিহা জানান, শনিবার সকালে নিহতদের জানাজা সম্পন্ন হয়েছে। সরকার ঘোষিত বজ্রপাতে নিহত ও আহতদের আর্থিক সহায়তা নীতিমালার আওতায় নিহত প্রত্যেকের পরিবারকে ৫০ হাজার টাকা এবং আহত প্রত্যেকের পরিবারকে ২৫ হাজার টাকা করে সহায়তা দেয়া হয়েছে। সরকারি সহায়তা বিপর্যস্ত পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়ানোর একটি উদ্যোগ হলেও স্বজন হারানোর বেদনা তাতে মুছে যাওয়ার নয়। মালঞ্চির মহাদেবপুর গোরস্থানে পাশাপাশি ছয়টি কবর এখন শুধু ছয়জনের সমাধি নয়, একই সঙ্গে একাধিক পরিবারের স্বপ্নভঙ্গের নীরব সাক্ষী।
