চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের এসএসসি পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশে জালিয়াতির অভিযোগ উঠেছে। ২০২৬ সালের এসএসসি পরীক্ষায় ১০ বিষয়ে অকৃতকার্য এক শিক্ষার্থীকে নম্বর বাড়িয়ে পাস দেখানোর অভিযোগে মামলা হয়েছে। এ ঘটনায় ওই শিক্ষার্থীসহ শিক্ষা বোর্ডের কম্পিউটার সেলের তিন কর্মচারীকে আসামি করা হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার নগরের পাঁচলাইশ মডেল থানায় মামলাটি করেন চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের সচিব অধ্যাপক মোহাম্মদ জহিরুল হক স্বপন। মামলার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন পাঁচলাইশ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোজাম্মেল হক।
মামলার আসামিরা হলেন- বোর্ডের কম্পিউটার সেলের স্ক্যানিং অপারেটর ইমতিয়াজ আহমেদ চৌধুরী, রাশেদুল ইসলাম এবং কম্পিউটার অপারেটর (সলভার) নূর হোসেন রায়হান। এ ছাড়া, ১৭ বছর বয়সী এক শিক্ষার্থীকে আসামি করা হয়েছে।
মামলার এজাহার সূত্রে জানা গেছে, অভিযুক্ত শিক্ষার্থী হাসিবুল আলী শোভন আগ্রাবাদ সরকারি কলোনি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এ বছর বিজ্ঞান বিভাগে এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেয়। গত ১০ই আগস্ট প্রকাশিত ফলাফলে তাকে সব বিষয়ে উত্তীর্ণ দেখানো হয়। পরে ফল পুনর্নিরীক্ষণের আবেদন করলে উত্তরপত্রের প্রকৃত নম্বরের সঙ্গে প্রকাশিত ফলাফলের বড় ধরনের অসঙ্গতি ধরা পড়ে। পুনর্নিরীক্ষণের দায়িত্বে থাকা শিক্ষক পদার্থবিজ্ঞানের উত্তরপত্রে দেয়া নম্বরের সঙ্গে বোর্ডের কম্পিউটার সেল থেকে পাওয়া নম্বরের পার্থক্য দেখতে পান। বিষয়টি বোর্ড কর্তৃপক্ষকে জানানো হলে অভ্যন্তরীণ তদন্ত শুরু হয়। তদন্তে শিক্ষার্থীর একাধিক বিষয়ে একই ধরনের অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া যায়।
এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে, শিক্ষার্থীর ১১টি বিষয়ের সৃজনশীল অংশের নম্বর পরিবর্তন করে ফলাফল প্রকাশ করা হয়েছিল। বাংলা প্রথম পত্রের উত্তরপত্রে পাওয়া ২৩ নম্বরের পরিবর্তে ফলাফলে ৩৩ এবং দ্বিতীয় পত্রে ২৪ এর পরিবর্তে ৬২ দেখানো হয়। ইংরেজি প্রথম পত্রে ৩৩ এর জায়গায় ৮৩ এবং দ্বিতীয় পত্রে ২০ এর পরিবর্তে ৮২ নম্বর বসানো হয়।
এ ছাড়া গণিতে ৯ এর পরিবর্তে ৬৬, ইসলাম শিক্ষায় ৭ এর পরিবর্তে ৬৪, উচ্চতর গণিতে শূন্যের পরিবর্তে ৪৬, পদার্থবিজ্ঞানে শূন্যের পরিবর্তে ৪৫, রসায়নে ১ এর পরিবর্তে ৪৬, জীববিজ্ঞানে ১ এর পরিবর্তে ৪৬ এবং বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয়ে ৪ এর পরিবর্তে ৬৫ নম্বর দেখানো হয়।
ঘটনা তদন্তে বোর্ডের চেয়ারম্যানের নির্দেশে তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়। দু’জন আইসিটি বিশেষজ্ঞের কারিগরি সহায়তায় কমিটি মূল উত্তরপত্র, পরীক্ষকদের পাঠানো নম্বর ফর্দ, প্রকাশিত ফলাফল, এমসিকিউ’র ওএমআর শিট এবং কম্পিউটার সেলের বিভিন্ন তথ্য উপাত্ত পর্যালোচনা করে। গত ৯ই সেপ্টেম্বর তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয়া হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শিক্ষার্থীর ইন্ধনে এবং কম্পিউটার সেলের সংশ্লিষ্ট তিন কর্মচারীর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সহযোগিতায় যোগসাজশের মাধ্যমে নম্বর পরিবর্তন করা হয়। প্রকৃত নম্বরের জায়গায় বাড়তি নম্বর বসিয়ে ফলাফলের হিসাব বদলে দেয়া হয়। পরে পরিবর্তিত ফলাফল অনলাইনে প্রকাশ করা হয়।
অনিয়ম শনাক্ত হওয়ার পর শিক্ষার্থীর ফলাফল স্থগিত করে বোর্ড কর্তৃপক্ষ। গত ১৫ই অক্টোবর তাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেয়া হয়। ২৬শে অক্টোবর শিক্ষার্থী জবাব দিলেও তা সন্তোষজনক না হওয়ায় মামলা করার সিদ্ধান্ত নেয় বোর্ড। মামলায় দণ্ডবিধির ৪২০, ৪৬৫, ৪৬৬, ৪৬৭, ৪৬৮, ৪৭১ ও ৪৭৭(ক) ধারা এবং পাবলিক পরীক্ষা (অপরাধ) আইন, ১৯৮০ এর সংশ্লিষ্ট ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে।
অন্য একটি শিক্ষা বোর্ডের জ্যেষ্ঠ এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ফলাফল প্রস্তুতের কারিগরি প্রক্রিয়ায় প্রোগ্রামার ও সহকারী প্রোগ্রামারদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। অথচ এ মামলায় দৈনিক মজুরিভিত্তিক কর্মচারীদের আসামি করা হয়েছে। ফলে মূল দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের ভূমিকা যথাযথভাবে তদন্ত করা হয়েছে কি না- তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, এ ধরনের নম্বর পরিবর্তনের ক্ষেত্রে মূল ডিভাইসে প্রবেশের সুযোগ কারা পান, তা তদন্তে স্পষ্ট হওয়া দরকার। শিক্ষার্থী এমসিকিউ অংশেও অকৃতকার্য হয়েছিল কি না- সেটিও যাচাই করা প্রয়োজন। এ বিষয়ে শিক্ষা বোর্ডের সচিব অধ্যাপক মোহাম্মদ জহিরুল হক স্বপন বলেন, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা অনুযায়ী তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের ভিত্তিতে মামলা করা হয়েছে। কমিটি যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ পেয়েছে, তাদের বিরুদ্ধেই এজাহার দেয়া হয়েছে। তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা এবং অন্য কেউ জড়িত থাকলে তাদের পরিচয়ও বেরিয়ে আসবে। পাঁচলাইশ থানার ওসি মোজাম্মেল হক বলেন, শিক্ষা বোর্ডের সচিব বাদী হয়ে চারজনের বিরুদ্ধে মামলা করেছেন। বিষয়টি তদন্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে।
উল্লেখ্য, চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডে এর আগেও পরীক্ষার ফলাফল জালিয়াতির অভিযোগ উঠেছিল। ২০২৩ সালের এইচএসসি পরীক্ষায় তৎকালীন বোর্ড সচিব অধ্যাপক নারায়ণ চন্দ্র দেবনাথের ছেলের ফলাফল নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়। নগরের একটি বেসরকারি কলেজ থেকে পরীক্ষায় অংশ নেয়া তার ছেলে নক্ষত্র দেবনাথের জিপিএ-৫ পাওয়া নিয়ে কয়েকজন শিক্ষক প্রশ্ন তোলেন। পরে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের ভিত্তিতে ২০২৪ সালের ২৪শে অক্টোবর নক্ষত্র দেবনাথের ফলাফল বাতিল করা হয়। তদন্ত কমিটি অধ্যাপক নারায়ণ চন্দ্র দেবনাথের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা করার সুপারিশ করে। পরবর্তী সময়ে এ ঘটনায় মামলা হয় এবং তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। এ ছাড়া, ২০২৩ সালের এইচএসসি পরীক্ষার ফল জালিয়াতির অভিযোগে বোর্ডের তৎকালীন এক পরিচালক ও তার সন্তানসহ চারজনের বিরুদ্ধে ২০২৫ সালের ২১শে জানুয়ারি পাঁচলাইশ থানায় আরেকটি মামলা হয়।
