জাপানের সঙ্গে বিগ-বি (বে অব বেঙ্গল ইন্ডাস্ট্রিয়াল গ্রোথ বেল্ট) নিয়ে আলোচনায় তৃতীয় কোনো দেশের প্রসঙ্গ আসেনি বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির। তিনি বলেন, বিগ-বি নিয়ে আলোচনা বাংলাদেশ ও জাপানের দ্বিপক্ষীয় অর্থনৈতিক
অংশীদারিত্বের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। এ উদ্যোগে অন্য কোনো দেশকে যুক্ত করা কিংবা বঙ্গোপসাগরকেন্দ্রিক সমুদ্রপথ নিয়েও কোনো আলোচনা হয়নি।
শুক্রবার দুপুরে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের জাপান সফর নিয়ে সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। সেখানে সফরের বিস্তারিত তুলে ধরার পর সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী। মাতারবাড়িকে কেন্দ্র করে বিগ-বি উদ্যোগের আওতায় ভারত, নেপাল ও ভুটানকে যুক্ত করে বৃহত্তর শিল্প সরবরাহ-ব্যবস্থা গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে কি-না জানতে চান এক সাংবাদিক। জবাবে হুমায়ুন কবির বলেন, জাপান সরকারের সঙ্গে আলোচনায় বাংলাদেশ শুরু থেকেই দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক, বিশেষ করে অর্থনৈতিক সম্পর্ককে গুরুত্ব দিয়েছে। যৌথ বিবৃতিতেও তৃতীয় কোনো দেশের উল্লেখ নেই।
তিনি আরও বলেন, অন্য কোনো দেশকে নিয়ে আলোচনা করতে হলে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর প্রতিনিধিদেরও আলোচনার টেবিলে থাকতে হবে। তাদের সঙ্গে বসেই এ ধরনের আলোচনা করতে হবে।
বিগ-বি নিয়ে আলোচনার প্রসঙ্গ তুলে প্রতিমন্ত্রী বলেন, যৌথ বিবৃতিতে বিষয়টিকে বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যকার একান্ত অর্থনৈতিক অংশীদারিত্বের অংশ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। দুই দেশের মধ্যকার এই অংশীদারিত্বের বাইরে অন্য কোনো দেশকে নিয়ে আলোচনা হয়নি।
বঙ্গোপসাগরকেন্দ্রিক যোগাযোগব্যবস্থা ও সমুদ্রপথ নিয়ে জাপানের সঙ্গে কোনো আলোচনা হয়েছে কিনা- জানতে চাইলে তিনি বলেন, বঙ্গোপসাগর কিংবা সমুদ্রপথ নিয়ে কোনো আলোচনা হয়নি। এ ধরনের বিষয়ে আলোচনা করতে হলে সংশ্লিষ্ট অংশীদারদের উপস্থিতি প্রয়োজন।
এদিকে বিগ-বি ও মাতারবাড়ী প্রসঙ্গে জামায়াতে ইসলামীর আমীরের মন্তব্যের বিষয়ে জানতে চাইলে হুমায়ুন কবির বলেন, জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশের বৃহত্তম ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল। দলটির কাছ থেকে দায়িত্বশীল আচরণ ও বক্তব্য প্রত্যাশা করেন তিনি। এ বিষয়ে সরকারের অবস্থান বুঝতে জাপান সফরের যৌথ বিবৃতি পড়ার আহ্বান জানান।
তিনি বলেন, যৌথ বিবৃতি পড়লেই বিষয়টি পরিষ্কার হবে। না দেখে, না বুঝে বা না পড়ে দেশ বিক্রি হয়ে যাওয়ার মতো মন্তব্য করা ঠিক নয়।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে জাপানের রাজার সাক্ষাৎ না হওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে হুমায়ুন কবির বলেন, জাপানের রাজা রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে তেমন সম্পৃক্ত হন না। তিনি নিজেকে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের বাইরে রাখেন। এ বিষয়ে প্রশ্ন করার আগে জাপানের রাজা সম্পর্কে আরও একটু খোঁজখবর ও গবেষণা করা উচিত বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
বিনিয়োগে অংশীদার হতে চায় বাংলাদেশ: জাপানের সঙ্গে পাঁচ বছরে ৬৩০ কোটি ডলারের বিনিয়োগ প্রতিশ্রুতি এবং ঋণের সুদের হার নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে হুমায়ুন কবির বলেন, বাংলাদেশ এখন আর আগের মতো ঋণ, অনুদান ও আর্থিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল থাকতে চায় না। বরং বিভিন্ন দেশের সঙ্গে প্রকৃত বিনিয়োগ অংশীদারিত্ব গড়ে তুলতে চায়।
তিনি বলেন, ১৫ থেকে ২০ বছর আগে বাংলাদেশ ঋণ, সহজ শর্তের ঋণ ও সহায়তার ওপর নির্ভরশীল ছিল। এখন সেই অবস্থান থেকে বেরিয়ে এসে বাংলাদেশ বিনিয়োগ অংশীদার হতে চায়। যেসব দেশের সঙ্গে ব্যবসা হবে, তা হবে পারস্পরিক বিনিয়োগের ভিত্তিতে। এক্ষেত্রে কোনো পক্ষই অন্য পক্ষের ওপর নির্ভরশীল থাকবে না। জাপানের ঋণের সুদের হার প্রায় ৩ শতাংশে পৌঁছানোর বিষয়টি তুলে ধরে এক সাংবাদিক জানতে চান, বহুপক্ষীয় ঋণদাতা সংস্থাগুলোর তুলনায় বেশি সুদে জাপানের ঋণ নেয়া হবে কিনা। জবাবে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ৬৩০ কোটি ডলারের বিনিয়োগ প্রতিশ্রুতি মূলত বেসরকারি খাতের বিনিয়োগের। কোন বিনিয়োগ বাংলাদেশের জন্য উপযোগী, তা আলোচনার মাধ্যমে নির্ধারণ করা হবে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করবে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে এবং আন্তর্জাতিক অর্থায়নের অন্যান্য বিকল্পের সঙ্গে প্রতিযোগিতামূলক হবে-এমন বিনিয়োগই গ্রহণ করা হবে। এ বিষয়ে বাংলাদেশের বাছাই করার সুযোগ রয়েছে।
রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে মিয়ানমারকেই উদ্যোগ নিতে হবে: জাপান সফরে রোহিঙ্গা সংকট ও মিয়ানমার পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনার বিষয়ে হুমায়ুন কবির বলেন, রোহিঙ্গা সংকট বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকার। দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় সব পর্যায়েই বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করবে বাংলাদেশ। তিনি বলেন, রোহিঙ্গা ইস্যুতে জাপান বাংলাদেশকে সহযোগিতা করবে। এ বিষয়ে জাপানের সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে। তবে সংকটের মূল সমাধান মিয়ানমারের হাতে। দেশটিকে আলোচনায় আসতে হবে এবং সংকট সমাধানে উদ্যোগ নিতে হবে। বাংলাদেশের একার পক্ষে এ সংকটের সমাধান সম্ভব নয়।
