রাজধানীর ঐতিহ্যবাহী মার্কেট- ইস্টার্ন প্লাজা শপিং কমপ্লেক্স। নব্বই দশক থেকেই রাজধানীর সবচেয়ে আধুনিক ও জনপ্রিয় মার্কেট এটি। সম্প্রতি অনেকটাই জনপ্রিয়তা হারিয়েছে এই মার্কেট। এখন আগের মতো ক্রেতা সমাগম দেখা যায় না ইস্টার্ন প্লাজায়। এমনকি ঈদ মৌসুমেও মার্কেটটি ফাঁকা দেখা গেছে। ক্রেতাদের একই শপিং কমপ্লেক্সে এসে এক ছাদের নিচে বিভিন্ন ধরনের পণ্য ও সেবা নিতে পারেন- সেই উদ্দেশ্যেই এই শপিং কমপ্লেক্সটি তৈরি করা হলেও মার্কেটে এখন এসব পণ্য নেই বললেই চলে। ব্যবসায়ের ধরন বদলে টিকে থাকার চেষ্টা করছেন দোকান মালিকরা। ফলে পোশাক কিংবা হরেক রকম পণ্যের জায়গায় এখন নির্দিষ্ট পণ্যের উপর নির্ভর করে ব্যবসা শুরু করেছেন ব্যবসায়ীরা।
ইস্টার্ন প্লাজার ব্যবাসায়ীরা জানান, এই মার্কেটে এখন আগের মতো বিক্রি নেই। অনেক জামা-কাপড় কিংবা হরেক রকম পণ্যের দোকান লোকসানের কারণেই সারা মাস বন্ধ থাকছে। পাঁচতলা মার্কেটের অংশে বিভিন্ন ফ্লোরে পুরাতন দোকানিদের সরিয়ে নতুন দোকান বসিয়ে মার্কেট সচলের চেষ্টা করছে মালিক সমিতি। দোকানিরা বলছেন, তারা দীর্ঘদিন ধরেই মার্কেটটিতে ব্যবসা করে আসছেন। কিন্তু মালিকরা একরকম বাধ্য করেই তাদের উচ্ছেদ করে নতুন করে ব্যবসা শুরু করতে চাচ্ছেন। ভয়ভীতি ও হুমকি দিয়ে দ্বিতীয় ও তৃতীয় তলার ব্যবসায়ীদের সরিয়ে সেখানে শুধু মোবাইল ফোনের দোকান চালুর চেষ্টা চলছে বলেও দাবি করেন তারা। পুরাতন ব্যবসায়ে যে দোকান ভাড়া উঠতো নতুন করে ভাড়া দেয়ায় ভাড়া দ্বিগুণ বা তিনগুণ বেশি টাকায় ভাড়া দিচ্ছেন মালিকরা।
বুধবার সরজমিন ইস্টার্ন প্লাজায় গিয়ে দেখা গেছে, মার্কেটের সামনে বড় করে দোকান ভাড়া দেয়ার ব্যানার লাগিয়ে রাখা হয়েছে। অবশ্য এই ব্যানার অনেক আগ থেকে লাগানো রয়েছে। ভবনটির নিচ তলায় জামাকাপড়, বাচ্চাদের খেলনা, কসমেটিকস, কিছু গেজেট শপ রয়েছে। সেখানে তিন থেকে চারটি দোকান বন্ধ দেখা গেছে। ২য় তলায় শপিং সেন্টার সরিয়ে সবটা এক্সেসরিজের দোকান করা হচ্ছে। এই ফ্লোর সবটাই গেজেট শপ বানানোর পরিকল্পনা করেছে মালিক সমিতি। এই ফ্লোরে যে কয়টা দোকান খোলা দেখা গেছে সবই গেজেট শপ। ফলে হাতে গোনা অল্প কয়েকটি পোশাক বা ফ্যাশন শপ দেখা গেছে। ৩য় তলায় সব পোশাকসামগ্রীসহ জুতা ও জুয়েলার্সের দোকান দেখা গেছে। চতুর্থ তলায় লেদারের আইটেমে ভর্তি থাকলেও সেসব দোকান তুলে দিয়ে সেখানে ফুড কোর্ট ও রেস্তরাঁ ভাড়া দেয়া হয়েছে। পঞ্চম তলায় সম্পূর্ণ এক্সেসরিজের জন্য বরাদ্দ রয়েছে আগ থেকেই। মূলত দ্বিতীয় ও তৃতীয় তলায় ব্যবসার ধরন বদলাচ্ছে ইস্টার্ন প্লাজা।
মার্কেটের বিভিন্ন ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বললে নাম প্রকাশ করতে চাননি কোনো ব্যবসায়ীই। হোম টেক্সটাইল শপ মালিক বলেন, আমার নিজের দোকান। যার কাছে ভাড়া দিয়েছিলাম সে পালিয়ে চলে যায় ব্যবসায় লোকসান দিয়ে। কয়েক লাখ টাকা বকেয়া ছিল। সবকিছু আমার ঘাড়ে এখন। তাই কোনো রকম দোকান খুলে বসেছি যাতে পুষিয়ে উঠতে পারি। এই দোকান মালিক বলেন, আগে সকাল দশটার মধ্যে যদি বিক্রি করে যাত্রা না করতে পারতাম আমাদের মাথা ঠিক থাকতো না। অথচ এখন দুই দিনেও বিক্রি না হলে ব্যবসা করতে হচ্ছে আমাদের। কিছু করার নেই। মার্কেটের দ্বিতীয় তলার আরেকজন ব্যবসায়ী বলেন, এখানে অনেকগুলো দোকানই সারা মাস বন্ধ থাকে। কারণ তারা লোকসানে থাকে। লোকসানে থেকে তারা ব্যবস্যায় করে পুষাতে পারে না। দোকান বন্ধ রাখলেও তাদের সার্ভিস চার্জ যেমন বিদ্যুৎ বিল, সিকিউরিটি, ভাড়া সবকিছুই দেয়া লাগে। এভাবে দোকানের সাটার বন্ধ করে রাখলে খোলা দোকানগুলোতেও আর ক্রেতা আসে না। ফলে বন্ধ রাখা ওইসব দোকানগুলোসহ অন্যান্য দোকানগুলো ভাড়া দেয়ার উদ্যোগ নিয়েছে মালিক সমিতি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন লেদারসামগ্রীর ব্যবসায়ী বলেন, এই মার্কেটের ডাউনফলের কারণ মালিক সমিতি। তারা মার্কেট ম্যানেজ করতে পারছে না। চতুর্থ তলায় লেদারের আইটেমের অনেকগুলো দোকান ছিল। অথচ মালিক সমিতি সবগুলো দোকানকে উঠিয়ে দিয়েছে। তিনি বলেন, একজন মহিলা এই মার্কেটে আসলে তিনি শুধু শাড়িই কিনতে চান না। তিনি চান যাতে অন্যান্য সামগ্রীও কিনতে পারেন। অথচ মার্কেটে হরেক রকমের দোকানপাট সব উচ্ছেদ করে দেয়া হচ্ছে। সব ইলেকট্রনিক্স কিংবা মোবাইল এক্সেসরিজের দোকান ভাড়া দেয়া শুরু করেছে। এখন অনেক পুরাতন ক্রেতাও এসে ঘুরে যাচ্ছেন।
এদিকে গত সোমবার শপিং কমপ্লেক্সের দ্বিতীয় ও তৃতীয় তলায় দীর্ঘদিন ধরে ব্যবসা করে আসা দোকানিদের উচ্ছেদ চেষ্টার প্রতিবাদে মানববন্ধন ও সংবাদ সম্মেলন করেছেন ব্যবসায়ীরা। প্রতিবাদে ব্যবসায়িক পরিবেশ ও নিজেদের অধিকার রক্ষার দাবি তোলেন তারা। সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, প্রতিষ্ঠার সময় রাজউকের অনুমোদিত পরিকল্পনা অনুযায়ী ইস্টার্ন হাউজিং কর্তৃপক্ষ বিভিন্ন তলায় বিভিন্ন শ্রেণির পণ্যের ব্যবসায়ীদের কাছে দোকান বিক্রি করে। বহুমুখী এই ব্যবসায়িক পরিবেশের কারণেই ইস্টার্ন প্লাজা মার্কেট দীর্ঘ তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে সুনামের সঙ্গে ব্যবসা পরিচালনা করে আসছে। দীর্ঘদিনের এই ব্যবসায়ী রীতি ও নিয়ম ভেঙে দোকান মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক শওকত আলীর নেতৃত্বে দ্বিতীয় ও তৃতীয় তলায় মোবাইল ফোনের দোকান চালুর উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। এতে দীর্ঘদিন ধরে ব্যবসা করে আসা অন্যান্য দোকানিরা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন এবং তাদের জীবিকা ঝুঁঁকিতে পড়বে। ব্যবসায়ীদের দাবি, এ বিষয়ে আদালতের নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। ওই নিষেধাজ্ঞা তোয়াক্কা না করেই তারা উচ্ছেদ কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।
সার্বিক বিষয়ে কথা বলতে ইস্টার্ন প্লাজা দোকান মালিক সমবায় সমিতির অফিসে গেলে সমিতির কোনো সদস্যকে পাওয়া যায়নি। এমনকি সেখানে থেকে কোষাধ্যক্ষ আনোয়ার কবিরের মোবাইল ফোন নাম্বার নিয়ে একাধিকবার কল করলেও তিনি সাড়া দেননি।
প্রসঙ্গত, ইস্টার্ন প্লাজা একসময় আভিজাত্যে ও বিলাসবহুল পণ্যের জন্য প্রসিদ্ধ ছিল। একদম গোড়ার দিক থেকেই ইস্টার্ন প্লাজায় চলন্ত সিঁড়ি ও ক্যাপসুল লিফট ছিল, যা এখনও আছে। রাজধানীর সচ্ছল পরিবারের মানুষদের কাছে ঈদের কেনাকাটায় প্রথম পছন্দ ছিল ইস্টার্ন প্লাজা। এমনকি তখন শুধু ঘোরাঘুরির জন্য ইস্টার্ন প্লাজায় আসতেন অনেকে। পরে আরও অনেক অভিজাত বিপণিবিতান গড়ে উঠায় ইস্টার্ন প্লাজা তার জৌলুস হারায়।
