হত্যা মামলা নিষ্পত্তিতে সময় লাগে ৩০ বছর!

হত্যা মামলা নিষ্পত্তিতে সময় লাগে ৩০ বছর!

ফন্ট সাইজ:

২৭ বছর আগে রাজধানীর ব্যস্ত সড়কে চলন্ত ট্রাকে আগুন। অগ্নিদগ্ধ হয়ে প্রাণ যায় চালক নওশাদ নসুর। ঘটনার পর পুলিশ বাদী হয়ে হত্যা ও বিস্ফোরক আইনে একটি মামলা করেন। আসামি করা হয় বিএনপি’র এক শীর্ষ নেতাসহ ২৯ জন নেতাকর্মীকে। দীর্ঘ প্রায় তিন বছর তদন্তের পর অভিযোগপত্রও দেয় পুলিশ। এতে প্রধান আসামিসহ অব্যাহতি দেয়া হয় ২০ জনকে। কিন্তু এরপর? এরপর কেটে গেছে আরও প্রায় ২৪ বছর। মামলার ৮ আসামি এখনো আদালতে ঘুরছেন। মামলাটি সাক্ষ্যগ্রহণ পর্যায়েই আটকে আছে। অভিযোগপত্রে থাকা ১৭ সাক্ষীর কেউই ২৭ বছরে আদালতে এসে সাক্ষ্য দেননি। সাক্ষী হাজির করতে আদালত থেকে সমন, গ্রেপ্তারি পরোয়ানা, এমনকি জামিন অযোগ্য গ্রেপ্তারি পরোয়ানাও জারি হয়েছে। তবু সাক্ষীদের আদালতে হাজির করা যায়নি। এই মামলায় অন্তত ২৬০ বার সাক্ষ্যগ্রহণের দিন ধার্য হয়। প্রতিবারই কোনো না কোনো কারণে শুনানি পিছিয়েছে। প্রতিবার রাষ্ট্রপক্ষের পক্ষ থেকে সাক্ষী হাজির করতে সময় চাওয়া হয়। আদালতও বিরতিহীনভাবে সেই আবেদন মঞ্জুর করেছেন। এভাবেই বছরের পর বছর ঝুলে আছে মামলাটি। ভুগছে মামলার ৮ আসামি।

এজাহার সূত্রে জানা গেছে, ১৯৯৯ সালের ২৫শে নভেম্বর। আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে বিএনপি’র ডাকা হরতাল চলছিল। রাজধানীর মতিঝিল থানার উত্তর শাহজাহানপুরে ইসলামী ব্যাংক হাসপাতালের সামনে একটি চলন্ত ট্রাকে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। আগুনে ট্রাকের চালক ও হেলপার অগ্নিদগ্ধ হন। তাদের উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেয়া হলে ট্রাকচালক নওশাদ নসু মারা যান। ঘটনার পর মতিঝিল থানার তৎকালীন উপ-পরিদর্শক নজরুল ইসলাম বাদী হয়ে বিস্ফোরক আইনে মামলা করেন। মতিঝিল থানার মামলা নম্বর-১৬৯। মামলায় বিএনপি’র স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাসসহ ২৯ জনকে আসামি করা হয়। তিন বছর তদন্তের পর বদলে গেল আসামির তালিকা মামলার তদন্ত শেষ করতে পুলিশের সময় লাগে প্রায় তিন বছর।

২০০২ সালে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়। তবে অভিযোগপত্রে বড় ধরনের পরিবর্তন আসে। মামলার প্রধান আসামি মির্জা আব্বাসসহ ২০ জনের নাম বাদ দেয়া হয়। বাকি আট আসামির বিরুদ্ধে বিচার চালানোর সিদ্ধান্ত হয়। অর্থাৎ যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছিল, তাদের বড় একটি অংশ তদন্ত শেষে অভিযোগপত্র থেকেই বাদ পড়ে গেলেও আটজনের জন্য শেষ হলো না আইনি লড়াই। মামলার নথি পর্যালোচনা করে দেখা যায়, অভিযোগপত্রে ১৭ জন সাক্ষীর নাম রয়েছে। কিন্তু এত দীর্ঘ সময়ে তাদের কেউই আদালতে সাক্ষ্য দেননি। সরকারি সাক্ষীদের মধ্যে রয়েছেন এসআই মাহবুবুর রহমান, এসআই ইসহাক মল্লিক, এসআই রফিকুল ইসলাম, এএসআই হারুনুর রশীদ, মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট শহিদুল ইসলাম এবং ঢাকা মেডিকেল কলেজের ফরেনসিক বিভাগের লেকচারার ডা. মোস্তাক রহিমসহ অন্যরা। তাদের আদালতে হাজির করতে একাধিকবার সমন জারি হয়েছে। দেয়া হয়েছে গ্রেপ্তারি পরোয়ানাও। এমনকি কোনো কোনো সাক্ষীর বিরুদ্ধে জামিন অযোগ্য গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হলেও শেষ পর্যন্ত আদালতে হাজির করা সম্ভব হয়নি।

বাদীও এলেন না আদালতে: মামলার দীর্ঘসূত্রতার আরেকটি চিত্র সামনে আসে ২০১৮ সালে। মামলার বাদী মতিঝিল থানার তৎকালীন এসআই নজরুল ইসলামের বিরুদ্ধেও আদালত থেকে জামিন অযোগ্য গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়। কিন্তু তাকেও আদালতে হাজির করা সম্ভব হয়নি। মামলার বাদী থেকে শুরু করে গুরুত্বপূর্ণ সরকারি সাক্ষীর কেউই যদি আদালতে হাজির না হন, তাহলে বিচার এগোবে কীভাবে? এমন প্রশ্নই এখন ঘুরপাক খাচ্ছে মামলাটিকে ঘিরে।

জট লেগেছে যেখানে: মামলার এজাহার, অভিযোগপত্র ও শুনানির নথিপত্র পর্যালোচনায় দেখা যায়, মূল জট সাক্ষ্যগ্রহণেই। সরকারি সাক্ষীদের কেউই আদালতে এসে সাক্ষ্য না দেয়ায় মামলার পরবর্তী ধাপেও যেতে পারছে না বিচারপ্রক্রিয়া। পুলিশ সাক্ষীদের খোঁজ করার চেষ্টা করেছে। কর্মস্থলে নোটিশ পাঠানো হয়েছে। একাধিকবার সমন দেয়া হয়েছে। কিন্তু তাতেও কাজ হয়নি। রাষ্ট্রপক্ষও বারবার সাক্ষী হাজিরের জন্য সময় চেয়েছে। দিনের পর দিন, বছরের পর বছর সেই সময়ের আবেদন মঞ্জুর হয়েছে। ফলে মামলার বিচার এগিয়ে যাওয়ার বদলে শুধু নতুন তারিখ পড়েছে। মামলাটিতে এখন পর্যন্ত অন্তত ২৬০ বার সাক্ষ্যগ্রহণের দিন ধার্য হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট নথি থেকে জানা গেছে। কিন্তু ২৬০ বারের বেশি তারিখ পড়লেও সাক্ষ্য দিয়েছেন এমন একজন সাক্ষীও নেই। একটি মামলার বিচার শুরু হওয়ার পর যদি দুই যুগের বেশি সময় ধরে সাক্ষ্যগ্রহণই শেষ না হয়, তাহলে বিচারপ্রক্রিয়ার গতি নিয়ে প্রশ্ন ওঠাই স্বাভাবিক।
আসামিপক্ষের আইনজীবীদের দাবি, সাক্ষীদের আদালতে হাজির করতে রাষ্ট্রপক্ষের ধারাবাহিক ব্যর্থতার কারণেই মামলাটি ঝুলে আছে। দীর্ঘদিনেও সাক্ষী হাজির না হওয়ায় মামলাটি খারিজের জন্য আসামিপক্ষের পক্ষ থেকে আদালতে একাধিকবার আবেদন করা হয়েছে। কিন্তু তাতেও মামলার নিষ্পত্তি হয়নি। বরং পরবর্তী সময়ে আবারো সাক্ষ্যগ্রহণের তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে। অর্থাৎ একদিকে সাক্ষী নেই, অন্যদিকে মামলাও শেষ হচ্ছে না। আসামিদের বছরের পর বছর আদালতে হাজিরা দিতে হচ্ছে।

এক আদালত থেকে আরেক আদালতে: মামলার নথি অনুযায়ী, ২০০২ সালের মার্চে বিচারের জন্য মামলাটি প্রথমে ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতে পাঠানো হয়। পরে সেখান থেকে অতিরিক্ত মহানগর দায়রা আদালতে স্থানান্তর করা হয়। এর কয়েক মাস পর মামলাটি ঢাকার পরিবেশ আপিল আদালতে (বিশেষ দায়রা জজ আদালত) পাঠানো হয়। আদালত বদলেছে। সময় বদলেছে। মামলার আসামিদের জীবনে পরিবর্তন এসেছে। কিন্তু মামলাটি রয়ে গেছে একই জায়গায় সাক্ষ্যগ্রহণের অপেক্ষায়।

কেন আটকে যায় হত্যা মামলা: ২০২১ সাল থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত নিষ্পত্তি হওয়া বেশ কয়েকটি হত্যা মামলা পরিচালনা করা আইনজীবীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মামলা দায়ের থেকে শুরু করে প্রতিটি মামলার চূড়ান্ত বিচারকাজ শেষ করতে গড়ে সময় লেগেছে ২৫ বছরেরও অধিক। কোনোটিতে পার হয়েছে ৩০ বছর। এসব গুরুত্বপূর্ণ মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি নিয়েও ধাপে ধাপে শঙ্কা তৈরি হয়েছে। অনেক গুরুত্বপূর্ণ ও চাঞ্চল্যকর হত্যা মামলা বিচারিক আদালতের রায়ের পরও হাইকোর্টে এসে আটকে আছে। মূলত তদন্তে সময়ক্ষেপণ। চার্জশিট দাখিলে গাফিলতি। সাক্ষী হাজিরে অপারগতা ও রাষ্ট্রপক্ষের অদক্ষতায় হত্যা মামলা নিষ্পত্তিতে যুগের পর যুগ চলে যায়। অধিকাংশ মামলা চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হতে ২৫ থেকে ৩০ বছর লেগে যায়। এতে বিনা বিচারে আসামিদের লম্বা সময় কনডেম সেলে থাকতে হয়। অনেকে মারাও যান।

নসু হত্যা মামলার আইনজীবী এডভোকেট শাকিল আহমেদ রিপন মানবজমিনকে বলেন, কাউকে বিনা বিচারে বছরের পর বছর জেল ও হয়রানি করা অমানবিক। মামলাটি ছিল মূলত রাজনৈতিক। হরতালে গাড়িতে কে বা কারা গাড়িতে আগুন দিয়েছে, সেই মামলায় পুলিশ পরিকল্পিতভাবে বিএনপি নেতাদের আসামি করেছে। মামলায় যাদের সাক্ষী করা হয়েছে, তারা কেউই আদালতে সাক্ষী দিতে আসেনি। অথচ আসামিরা ২৭ বছর ধরে আদালতে ঘুরছে। আমরা রাষ্ট্রপক্ষকে মামলাটি খারিজের কথা বলেছি, কিন্তু আদালত বারবার সাক্ষ্য কল করে শুনানির তারিখ দিয়ে দেন। এটা বিচারবিভাগের অমানবিক ঘটনার মধ্যে অন্যতম।

আরেক আইনজীবী এডভোকেট জয়নাল আবেদীন মিসবাহ মানবজমিনকে বলেন, এটা একটি রাজনৈতিক মামলা। হরতালের সময় মামলার বাদীর ওপর চাপ ছিল, বিএনপি’র নেতাদের ধরতে হবে তাই একটি সাজানো মামলা দেয়া হয়েছে। একটা মামলায় তদন্ত কর্মকর্তা, সাক্ষী অন্য পুলিশ সদস্য, মেডিকেল অফিসার কাউকেই আদালতে আনা যায়নি তাহলে মামলা ঝুলিয়ে রাখার প্রয়োজন আছে বলে মনে হয় না। এতে আসামিরা অসহনীয় যন্ত্রণার মধ্যে আছে। এই ধরনের মামলা খারিজ হয়ে যায়, কিন্তু এটা কিছুতেই আদালত বুঝতে পারছে না। আমরা এই মামলার বিষয়ে উচ্চ আদালতের নজরে আনবো।