বাড়ছে বেওয়ারিশ লাশের সংখ্যা

বাড়ছে বেওয়ারিশ লাশের সংখ্যা

ফন্ট সাইজ:

পরিবারের সঙ্গে মোহাম্মদপুরের চাঁদ উদ্যানে বসবাস করতেন মুক্তা আক্তার। বয়স মাত্র ১১ বছর। গত ১৬ই অক্টোবর নানির বাড়ি যাওয়ার উদ্দেশ্যে বাসা থেকে বের হয়ে শ্যামলী বাসস্ট্যান্ডের কাছে ট্রাকচাপায় নিহত হোন। পরে তার লাশ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের মর্গে ঠাঁই হয়। একদিন মর্গে রেখেই লাশটি বেওয়ারিশ হিসেবে আঞ্জুমান মফিদুল ইসলামের কাছে হস্তান্তর করেন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। স্বজনরা দু’দিন পর হাসপাতালে গিয়ে ছবি দেখিয়ে পরিচয় শনাক্ত করলেও ততক্ষণে লাশটি বেওয়ারিশ হিসেবে রায়েরবাজার কবরস্থানে দাফন করা হয়।

এতে পরিচয় থাকার পরও সময়ের ব্যবধানে বেওয়ারিশ হয় আদরের শিশুকন্যার লাশ। মুক্তা একা নয়, নাম পরিচয় থাকার পরও ঢাকায় পড়াশোনা ও কাজের সন্ধানে এসে অনেকে হত্যা, দুর্ঘটনায় মারা গেলেও পরিবারের খোঁজ না থাকায় তাদের বেওয়ারিশ হিসেবে সমাহিত হতে হয়। পরে হাসপাতাল ও আঞ্জুমানের ডাটাবেজ থেকে পরিচয় শনাক্ত হলেও তখন কবরস্থান থেকে লাশ তোলা কঠিন হয়ে পড়ে। আইনি ঝামেলায় বছরের পর বছরও বেওয়ারিশ লাশের পরিচয় পাওয়ার পরও স্বজনরা তা বুঝে পান না। অনেকে দীর্ঘ সময় আদালতে ঘুরে প্রিয়জনের লাশের আশা ছেড়ে দেন। এভাবেই ঢাকা শহরে প্রতি বছর বেওয়ারিশ লাশের সংখ্যা বেড়ে চলেছে। রাজধানীর শাহবাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, নিউ মার্কেট, আজিমপুর, চানখাঁরপুল ও ঢাকা মেডিকেলের আশপাশ এলাকায় বিপুলসংখ্যক ভাসমান মানুষ বসবাস করেন। এসব এলাকায় প্রায়ই অজ্ঞাত মৃতদেহ পাওয়া যায়। পরে তাদের ঢামেকের মর্গে ঠাঁই হয়। কিছুদিন মর্গে থাকার পর ওই লাশ বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন করা হয়। পুলিশের দেয়া তথ্য বলছে, ঢাকার মধ্যে সবচেয়ে বেশি অজ্ঞাতপরিচয় মরদেহ পাওয়া যায় শাহবাগ এলাকায়। গত ২৯শে সেপ্টেম্বর এ এলাকায় একদিনে তিনজনের মরদেহ পাওয়া যায়। আগের দিন ২৬শে সেপ্টেম্বর একই এলাকা থেকে চারজন অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তির লাশ উদ্ধার করা হয়।

পরিচয় কেন মেলে না: পুলিশের তদন্তে বলা হয়, মরদেহ বিকৃত হয়ে গেলে পরিচয় বের করা কঠিন হয়ে যায়। তখন ফিঙ্গারপ্রিন্ট কাজ করে না আর তদন্তও জটিল হয়ে যায়। ফলে স্বজন থাকলেও তাদের কাছে মরদেহ পৌঁছানো সম্ভব হয় না। এ ছাড়া সেপটিক ট্যাঙ্ক, জলাশয়, ডোবা, নদী থেকে উদ্ধার হওয়া লাশের অধিকাংশই অর্ধগলিত থাকে, তাই ডিজিটাল পদ্ধতি ব্যবহার করে এসব লাশের পরিচয় শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে। অনেক সময় দুর্ঘটনায় চেহারা বিকৃত হয়ে গেলেও পরিচয় শনাক্তে জটিলতা তৈরি হয়। এ ছাড়া ছিন্নমূল অনেক নিহত ব্যক্তির জাতীয় পরিচয়পত্র না থাকা, আঙ্গুলের ছাপের তথ্য না মেলা এবং স্বজনদের খুঁজে না পাওয়ায় অনেক মরদেহের পরিচয় শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে। ফুটপাথ, রেলস্টেশন ও বাস টার্মিনালে বসবাসকারী মানুষের মৃত্যুর পর তাদের পরিবারের সন্ধান পাওয়া যায় না। তাই দুর্ঘটনায় নিহত ব্যক্তির পরিচয় তাৎক্ষণিকভাবে শনাক্ত করা সম্ভব না হলে মরদেহ বেওয়ারিশ হিসেবে নথিভুক্ত করা হয়। পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন, নিঃসঙ্গ ও অসহায় মানুষের মৃত্যুর পর তাদের স্বজনদের খুঁজে পাওয়া যায় না। পুলিশ, হাসপাতাল, মর্গ ও দাফনকারী প্রতিষ্ঠানের মধ্যে তথ্য আদান-প্রদানে দুর্বলতায় মরদেহের পরিচয় শনাক্ত ও স্বজনদের খুঁজে বের করার প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হয়।

এ ছাড়া রাজধানীতে দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে বিপুলসংখ্যক মানুষ আসা-যাওয়া করেন। তাদের মধ্যে কেউ নিখোঁজ হওয়ার পর দ্রুত পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করা সম্ভব না হলে মৃত্যুর পর পরিচয় শনাক্ত করাও কঠিন হয়ে পড়ে। বেওয়ারিশ লাশের দাফনসেবা পরিচালনাকারী সংস্থা আঞ্জুমান মফিদুল ইসলাম সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত শুধু ঢাকা শহরে বিভিন্ন কবরস্থানে প্রতিষ্ঠানটি ৪৬০টি বেওয়ারিশ লাশ দাফন করেছে। সবচেয়ে বেশি বেওয়ারিশ লাশ দাফন হয়েছে রায়েরবাজার বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে। হাসপাতাল থেকে সংগ্রহ করা বেওয়ারিশ লাশের মধ্যে গত জুনে ৬৭টি আর জানুয়ারিতে ৩০টি, সেপ্টেম্বরে ৬০টি। গড়ে প্রতি মাসে প্রায় ৫১টি। এদের মধ্যে পুরুষ ৩১৪ জন, নারী ১১৬ জন এবং শিশু রয়েছে ৩০ জন। পরিসংখ্যানে গেল কয়েক বছরের মধ্যে সংখ্যাটি সর্বোচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। যা ২০২৪ সালে ছিল ৫৭০টি। ২০২৫ সালে ৬৬৪টি।

আঞ্জুমানের তথ্য কর্মকর্তা মো. কামরুল আহমেদ বলেন, লাশ যত পচা বা বিকৃতই হোক, তারা মৃত ব্যক্তির ছবি তুলে রাখেন। অনেক সময় স্বজনরা এই ছবি দেখেই চিনতে পারেন। আবার অনেকে হতাশ হয়েই ফিরে যান।

এক বছরে ২৯২ অজ্ঞাতপরিচয় মরদেহের ময়নাতদন্ত: ঢাকা মেডিকেল কলেজের ফরেনসিক মেডিসিন অ্যান্ড টেকনোলজি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ থেকে ২০২৬ সালের আগস্ট পর্যন্ত বিভাগটিতে এক হাজার ৬৯০টি অজ্ঞাতপরিচয় মরদেহের ময়নাতদন্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে ২০২১ সালে ২৪৮টি, ২০২২ সালে ২৩০টি, ২০২৩ সালে ২৫০টি, ২০২৪ সালে ৩২৪টি, ২০২৫ সালে ৩৮৪টি এবং চলতি বছর আগস্ট পর্যন্ত ২৫৪টি অজ্ঞাতপরিচয় মরদেহের ময়নাতদন্ত করা হয়। এভাবে প্রায় পৌনে ছয় বছরে গড়ে ২৯২টি মরদেহের ময়নাতদন্ত হয়েছে। চিকিৎসকরা জানান, অজ্ঞাত মরদেহের পরিচয় শনাক্তে ময়নাতদন্তের সময়ও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংগ্রহ করা হয়। মরদেহের দাঁত ও হাড়ের নমুনা সংগ্রহ করে সংরক্ষণ করা হয়। এসব নমুনা প্রয়োজন অনুযায়ী ঢামেক ও সিআইডিতে রাখা হয়, যাতে পরবর্তী সময়ে স্বজনের সন্ধান পাওয়া গেলে ডিএনএ পরীক্ষাসহ অন্যান্য প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পরিচয় নিশ্চিত করা যায়। অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বলেন, বেওয়ারিশ মৃতদেহের সঙ্গে অনেক নৃশংস হত্যাকাণ্ডের অজানা তথ্য জড়িয়ে থাকে। ব্যক্তিগত, ব্যবসায়িক বা রাজনৈতিক কারণে কিংবা টার্গেটেড কিলিংয়ের পর অপরাধীরা মৃতদেহ গুম করে ফেলতে চায়। তারা মৃতদেহ ফেলে দেয় নদী আর অন্যান্য জলাশয়ে, মহাসড়কে বা নির্জন কোনো জায়গায়, কখনো মাটিতে পুঁতে ফেলে। মৃতদেহের পরিচয় না মেলায় বেশির ভাগ সময় অপরাধীরা পার পেয়ে যায় মন্তব্য করে তিনি যেসব জায়গায় বারবার মরদেহ মিলছে সেখানে সিসিটিভিসহ অন্যান্য সব ধরনের নজরদারি বাড়ানোর ওপর জোর দিয়েছেন।

রায়েরবাজার কবরস্থানের গোরখোদক গোলাম রব্বানী মানবজমিনকে বলেন, আমাদের কাছে অনেক পচা লাশ আসে। যা দাফন করা কষ্ট হয়ে যায়। তাহলে তাকে শনাক্ত করবে কীভাবে? অনেক পরিবারের লোকজন তাদের সন্তান খুঁজতে আমাদের কাছে আসেন। কিন্তু আমাদের দ্বারা তথ্য দেয়া সম্ভব না। আমাদের কাজ দাফন করা। ওটাই আমরা করি।