তাহসিফের মৃত্যু ঘিরে রহস্য

তাহসিফের মৃত্যু ঘিরে রহস্য

ফন্ট সাইজ:

বিমান বাহিনীর সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট তাহসিফ সাউরির মৃত্যু ঘিরে রহস্য তৈরি হয়েছে। বুধবার বিকাল সাড়ে ৪টার দিকে তুরাগ নদের রাজাবাড়ী ঘাট এলাকা থেকে ভাসমান অবস্থায় তার লাশ উদ্ধার করে টঙ্গী নৌ-পুলিশ ফাঁড়ি। আগের দিন সন্ধ্যায় উত্তরার বাসা থেকে বের হয়ে আর ফিরেননি তিনি। ২০২৪ সালের ৫ই আগস্ট শেখ হাসিনার পালানোর একটি ভিডিও প্রকাশ করে আলোচনায় এসেছিলেন তাহসিফ সাউরি। পরে তাকে শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগে চাকরিচ্যুত করা হয়। তাহসিফকে হত্যা করে লাশ নদে ফেলে দেয়া হয়েছে বলে দাবি করেছে পরিবার। তাহসিফের মৃত্যু ঘিরে নানা প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। তিনি যে বাইক নিয়ে বাসা থেকে বের হয়েছিলেন সেই বাইকটি গতকাল পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। যে ‘ছোট ভাইর বন্ধু’র সঙ্গে তিনি বের হয়েছিলেন সেই বন্ধু’র ভাষ্য অনুযায়ী মধ্যরাতে দুইজন দুইদিকে যাওয়ার পর তাহসিফের গন্তব্য কোথায় ছিল? তার লাশ তুরাগ নদে গেল কীভাবে। হাতঘড়ি, মোবাইল ফোন লাশের সঙ্গে থাকায় ছিনতাইয়ের সন্দেহও জোরালো মনে করছেন না তদন্ত সংশ্লিষ্টরা। তাহলে কীভাবে মৃত্যু হলো তাহসিফের? গতকাল তাহসিফের বাবা এনায়েতুল করিম জানিয়েছেন, ‘তার ছেলে এক একটা ভয় নিয়ে থাকতেন। তবে কি সেই ভয় তা তিনি বলেননি।’

গতকাল রাজধানীর সোহ্‌রাওয়ার্দী হাসপাতালে ময়নাতদন্ত শেষে তাহসিফের লাশ উত্তরায় দাফন করা হয়।
তাহসিফ সাউরির বাবা কে এম এনায়েতুল করিম হেলাল বলেন, আমার তিন ছেলেমেয়ের মধ্যে তাহসিফ সবার বড়। কয়েকদিন আগে বাইক এক্সিডেন্ট করে আঘাত পাওয়ায় সে বাসায়ই থাকতো। ২৭শে অক্টোবর সন্ধ্যায় তাহসিফ ওর মাকে বলে-দীপ নামে আমার একটা বন্ধু আসছে। আমি নিচে থেকে ঘুরে আসছি’। এই বলে বাসা থেকে বের হয়ে যায়। এরপর বাসায় আসতে দেরি হওয়ায় ওর মাকে বেশ কয়েকবার ফোন দেয়। সবশেষ রাত দেড়টার দিকে সে তার মাকে কয়েক সেকেন্ডের একটা ভয়েস মেসেজ পাঠায়-‘আমি রওনা হইছি, চলে আসছি’। তারপর থেকেই তার আর কোনো সন্ধান পাচ্ছিলাম না আমরা। যথাযথভাবে আমরা থানায় যোগাযোগ করি। এরই মধ্যে ২৮ তারিখ সন্ধ্যার আগে উত্তরখান থানা থেকে আমাকে ফোন করে জানালো তাহসিফের লাশ পাওয়া গেছে নদীতে। তিনি বলেন, এটা কোনোভাবেই সুইসাইড হতে পারে না। তাহসিফ সারাদিন ওর মায়ের সঙ্গে ছিল। শপিং করেছে। ভেরি হ্যাপি মুডে ছিল। সরকার তদন্ত করলে প্রকৃত অপরাধীদের বের করতে পারবে। এনায়েতুল করিম বলেন, যেই বন্ধুর সঙ্গে সে বের হয়েছিল দীপ, তাকে আমরা চিনি। তার সঙ্গেও আমাদের কথা হয়েছে। সে বলেছে- কিছু জানে না। দীপ বলেছে- সে নাকি আগের দিন রাত ১২টা পর্যন্ত আমার ছেলের সঙ্গেই ছিল।

পদ্মা অয়েল কোম্পানির সাবেক এই বোর্ড ডাইরেক্টর বলেন, আমার ছেলে তাহসিফ এখনো বিয়ে করেনি। সে সিঙ্গেলই ছিল। ৫ই আগস্টের পর এয়ারফোর্স থেকে বলা হয়, শৃঙ্খলাভঙ্গের দায়ে তাকে চাকরি থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে। এরপর বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডে কিছুদিন চাকরি করে। এরপর নেত্রনিউজে কাজ করে। সবশেষ ভার্গো ট্যোবাকো কোম্পানিতে এডমিন অ্যান্ড সিকিউরিটি অফিসার হিসেবে কাজ করতো। ২৭ তারিখ সে সারাদিন মায়ের সঙ্গে শপিং করেছে। আমার জন্যেও শপিং করেছে। সব স্বাভাবিকই ছিল। স্বাভাকিভাবেই সে মায়ের সঙ্গে কথা বলে নিচে যায়। তাই সে কোনোভাবেই আত্মহত্যা করতে পারে না। আমার ছেলেকে হত্যা করা হয়েছে। হত্যার পর তাকে আরেক এলাকায় নিয়ে নদীতে ফেলে দেয়া হয়েছে।

এদিকে শেষবার তাহসিফের বাসা থেকে বের হওয়ার সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, ২৭শে অক্টোবর সন্ধ্যা ৬টা ২৪ মিনিটের দিকে তাহসিফের সঙ্গে দেখা করতে তার বাসা উত্তরা ১৮ নম্বর সেক্টরের করবি-১৪ এর পার্কিং এ নিজের মোটরসাইকেল নিয়ে দাঁড়িয়ে দীপ। ৬টা ২৪ মিনিট ৪০ সেকেন্ডে সবুজ পাঞ্জাবি, সাদা পায়জামা ও কালো জুতা পরে হাতে মোবাইল নিয়ে এসে দ্বীপের সঙ্গে হাত মেলান তাহসিফ। এরপর দুইজনেই আলাদা আলাদা মোটরসাইকেলে চেপে বাসা থেকে বের হয়ে যান।

সেদিন তাহসিফের সঙ্গে বের হওয়া বন্ধু শাহরিয়ার দীপ বলেন, আসলে তাহসিফ ভাই আমার খুব কাছের বড় ভাই। তার সঙ্গে গত ৬ বছরের সম্পর্ক আমার। তার সঙ্গে আমার একটা সিকিউরিটি কোম্পানির ব্যবসাও ছিল। সেদিন মূলত তার বাসায় গিয়েছিলাম- তার মোটরসাইকেল মেরামত করতে। এ নিয়ে আগে কথা হয়েছিল। সেই কথা মতোই আমি তার বাসার নিচে গিয়ে তাকে ফোন দিই। এরপর অনেকক্ষণ ধরে আমার দু’জন মিলে অনেক চেষ্টা করে তার বাইকটা স্টার্ট করি। আমরা দু’জন মিলেই পাশের একটা সার্ভিসিং সেন্টারে গিয়ে তার বাইকটা সারাই। ইঞ্জিনে অয়েল দিই। সব কাজ শেষে তাকে সময় দেয়ায় তিনি আমাকে ডিনার করার জন্য অফার করেন। আমিও না করিনি। পরে রুয়াপ কমপ্লেক্সের মধ্যে কুরকুরে নামে একটা রেস্টুরেন্ট আছে। সেখানেই আমরা ডিনার করি। ডিনারের সময়েই তার সঙ্গে আমার শেষ কথা হয়। এরপর আমরা দু’জনেই রুয়াপ থেকে বাইক নিয়ে একসঙ্গে বের হয়ে যাই। ভাইয়া কী যেন একটা কাজে চলে যান। আর আমি বাসায় চলে আসি। সবশেষে হাউজ বিল্ডিং থেকে আমি ডানে চলে আসি আর তিনি বামে চলে যান। এরপর বাসায় এসে আমি ভাইকে আবার ফোন করি। কিন্তু তার ফোনটা বন্ধ ছিল। সে যখন আমার সঙ্গে ডিনার করছিল তখনো তার ফোনে চার্জ না থাকায় আমার পাওয়ার ব্যাংক নিয়ে ফোন চার্জ করছিল। তাই ভাবলাম তার ফোনে হয়তো চার্জ নেই। পরদিন সকালে ফোন দিলেও তার ফোন বন্ধ পাই। এরপর শুনি তার লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। দীপ বলেন, তাহসিফ ভাই মাঝে মাঝে আমাকে একটা কথা বলতেন, আমি যদি না থাকি আমার ছোট ভাইকে দেখে রাখিস। তবে কেন এসব বলতেন সে সম্পর্কে কখনো কিছু বলেননি।

এদিকে তুরাগ নদের যেই স্থান থেকে তাহসিফের লাশ উদ্ধার করা হয়, সরজমিন সেই রাজবাড়ী ঘাটে গিয়ে দেখা যায়, নদী পারাপারের জন্য ঘাটটিতে বেশ কয়েকটি নৌকা ও স্পিড বাঁধা রয়েছে। তাহসিফের লাশ উদ্ধারের সময়ে সেখানে উপস্থিত থাকা ও লাশের সুরতহাল তৈরির সাক্ষী মো. আব্দুল কাদের খোকন, মো. রাসেল, মো. সুমনসহ আরও বেশ কয়েকজন স্থানীয় বাসিন্দারা বলেন, বুধবার দুপুর ২টা হবে। হঠাৎ দেখি আশুলিয়ার দিক থেকে একটা মানুষের লাশ ভেসে আসছে। আর নদীর পাশ দিয়ে বেশ কয়েকজন মানুষ ওই লাশ দেখতে দেখতে নদীর পাড় দিয়ে এগিয়ে আসছে। এরই মধ্যে লাশটা ওই সাদা রঙের ওই স্পিড বোট ও কচুরিপানায় এসে বেঁধে যায়। স্পিডবোটটায় না ঠেকলে নদীর স্রোতে আরও সামনের দিকে ভাসতে ভাসতে চলে যেতো। এরপর আমরা ৯৯৯-এ ফোন দিই। পরে টঙ্গী নৌ-পুলিশ ফাঁড়ির সদস্যরা ঘটনাস্থলে এসে লাশটি উদ্ধার করে নিয়ে যায়। তারা বলেন, যখন লাশটা উঠানো হয়, তার নাক ও কান দিয়ে রক্ত ঝরছিল। হাতগুলো মুঠ করা ছিল। হাতের চামড়া মনে হচ্ছিল খসে পড়বে। পুরো লাশ শক্ত হয়ে গিয়েছিল।
বিষয়টি নিয়ে গাজীপুরের টঙ্গী নৌ-পুলিশ ফাঁড়ির ইন্সপেক্টর ফিরোজ উদ্দিন বলেন, বুধবার বিকাল সাড়ে ৪টার দিকে ৯৯৯-এর মাধ্যমে খবর আসে, রাজাবাড়ী ঘাটসংলগ্ন তুরাগ নদীতে একটি লাশ ভাসছে।

খবর পেয়ে টঙ্গী নৌ-পুলিশ ফাঁড়ির গাজীপুরের কর্মকর্তা ও ফোর্স ঘটনাস্থলে পৌঁছে লাশটি উদ্ধার করে সুরতহাল প্রতিবেদন প্রস্তুত করেন। উদ্ধারের সময় মরদেহটির বয়স আনুমানিক ২৮ বছর বলে ধারণা করা হয়। তার পরনে ছিল সাদা পাজামা ও কালো জামা। মুখে হালকা দাড়ি ছিল। তবে তার শরীরে কোনো আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়নি। লাশের হাতে একটি ঘড়ি এবং পকেটে একটি আইফোন পাওয়া যায়। তবে প্রথমে কোনোভাবেই তার পরিচয় মিলছিল না। এরপর তার সঙ্গে থাকা আইফোন চার্জ দেয়া হয়। সেই ফোনের মাধ্যমেই তার পরিচয় শনাক্ত করা হয়- নিহতের নাম তাহসিফ। তার বাবার নাম কে এম এনায়েতুর রহমান এবং তার ঠিকানা উত্তরা ১৮ নম্বর সেক্টর, রোড ১৪/বি। পরে তার এক স্বজনকে খবর দেয়া হয়। ওই স্বজনের উপস্থিতেই তাহসিফের লাশ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য রাজধানীর শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয়। ময়নাতদন্তের পর লাশ তার পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। তবে ঠিক কীভাবে তার মৃত্যু হয়েছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত কিছু বলতে পারেননি এই নৌ-পুলিশ কর্মকর্তা। একই সঙ্গে এখনো পর্যন্ত তাহসিফের ব্যবহৃত মোটরসাইকেলটিও উদ্ধার করতে পারেনি পুলিশ।

নৌ-পুলিশের ঢাকা অঞ্চলের পুলিশ সুপার আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, নিহত অবসরপ্রাপ্ত ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কে এম তাহসিফ সাউরির লাশ উদ্ধারের বিষয়ে আমাদের নৌ-পুলিশের টঙ্গী নৌ-পুলিশে ফাঁড়িতে একটি জিডি করা হয়েছে (জিডি নং-৫৪৩)। বিষয়টি নিয়ে আমাদের এক এসআই তদন্ত করছেন। তদন্তের পরে এ বিষয়ে বিস্তারিত বলা যাবে।
উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের ৫ই আগস্ট শেখ হাসিনার দেশত্যাগের দৃশ্য ধারণ ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশের ঘটনায় আলোচনায় এসেছিলেন বিমান বাহিনীর দুই কর্মকর্তা- ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট রিফাত আশরাফী ও ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কে এম তাহসিফ সাউরি। তাদের একজন ভিডিও ধারণ করেছিলেন। তাহসিফ সাউরি ওই ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করে আলোচনায় এসেছিলেন। পরে শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে এই দুই কর্মকর্তাকে চাকরিচ্যুত করা হয়।