জাপানে ৪দিনের সরকারি সফর শেষে দেশের উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ফেরার পথে যান্ত্রিক ত্রুটি ধরা পড়ায় উড়তে বিলম্ব হয় প্রধানমন্ত্রীকে বহনকারী বাংলাদেশ বিমানের ফ্লাইট। ত্রুটি সারিয়ে নির্ধারিত সময়ের
প্রায় সাড়ে পাঁচ ঘণ্টা পর ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা হয় উড়োজাহাজটি। সরকারপ্রধান হিসেবে এটি ছিল তার তৃতীয় দ্বিপক্ষীয় সফর। এই সফরে টোকিওর সঙ্গে কৌশলগত অংশীদারিত্ব জোরদার, বাণিজ্য সমপ্রসারণ এবং বড় অঙ্কের বিনিয়োগের ওপর জোর দেয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর সফরের মাধ্যমে দুই দেশের মধ্যে সহযোগিতার নতুন ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। জাপানের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ ঋণের প্রতিশ্রুতি পেয়েছে বাংলাদেশ। দেশটি ঢাকার দু’টি উন্নয়ন প্রকল্পে প্রায় ২৯৫.৫ মিলিয়ন ডলার ঋণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। পাশাপাশি বেসরকারি খাতে ১৭টি বিনিয়োগ ও সহযোগিতা প্রকল্পের ঘোষণা এসেছে। এ ছাড়া চারটি সহযোগিতা দলিলে সই করেছে দুই দেশ।
জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির আমন্ত্রণে গত ২৬শে অক্টোবর টোকিও পৌঁছান তারেক রহমান। সঙ্গে তার সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমান ও অন্যান্য মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মকর্তারাও ছিলেন। গতকাল স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ৬টায় নারিতা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে বিজি-৩৭৭ ফ্লাইটটির ঢাকার উদ্দেশ্যে যাত্রা করার কথা ছিল। কিন্তু উড্ডয়নের প্রস্তুতির সময় যান্ত্রিক ত্রুটি ধরা পড়ে। পরে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা ও মেরামত শেষে স্থানীয় সময় রাত পৌনে ১১টার দিকে উড়োজাহাজটি ঢাকার উদ্দেশ্যে উড্ডয়ন করে।
সফরের অন্যতম অর্জন দুই দেশের মধ্যে অর্থনৈতিক সহযোগিতা সমপ্রসারণের উদ্যোগ। আগামী পাঁচ বছরে বাংলাদেশের জ্বালানি, অবকাঠামো ও তথ্যপ্রযুক্তি খাতে ৬.৩ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের প্রত্যাশা করা হচ্ছে। এসব উদ্যোগের মাধ্যমে দুই লাখ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যও রয়েছে। জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদারে বাংলাদেশকে ৫০ বিলিয়ন জাপানি ইয়েনের জরুরি ঋণ সহায়তার বিষয়েও দুই পক্ষ একমত হয়েছে।
চারটি সহযোগিতা দলিল স্বাক্ষর: সফরে বিভিন্ন খাতে সহযোগিতা বাড়াতে দুই দেশের মধ্যে একাধিক চুক্তি, সমঝোতা স্মারক ও সহযোগিতার দলিল স্বাক্ষরিত হয়েছে। এর মধ্যে বাংলাদেশের উপকূলীয় নিরাপত্তা জোরদারে টহল জাহাজ সরবরাহের জন্য সর্বোচ্চ ২.১২ বিলিয়ন জাপানি ইয়েনের অনুদান চুক্তি রয়েছে।
এ ছাড়া দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক গভীর করা এবং ব্যবসা ও বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নয়নে সহযোগিতার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতেও প্রযুক্তি বিনিময়, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সমপ্রসারণে সমঝোতা হয়েছে। দক্ষতা উন্নয়ন ও কর্মসংস্থান বাড়ানোর বিষয়টিও সহযোগিতার আওতায় এসেছে। জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় দুই দেশের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সহযোগিতা জোরদারের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।
দু’টি প্রকল্পে ঋণের প্রতিশ্রুতি: বাংলাদেশের দু’টি উন্নয়ন প্রকল্পে মোট ৪৬.৫৬ বিলিয়ন জাপানি ইয়েন বা প্রায় ২৯৫.৫ মিলিয়ন ডলার ঋণ দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে জাপান। এর মধ্যে বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়ন প্রকল্পে ১৫.৮৮ বিলিয়ন ইয়েন এবং উপজেলা পরিচালন ও উন্নয়ন প্রকল্পের দ্বিতীয় পর্যায়ে ৩০.৬৮ বিলিয়ন ইয়েন দেয়ার কথা রয়েছে। প্রথম প্রকল্পের লক্ষ্য দেশে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি করা। দ্বিতীয় প্রকল্পের মাধ্যমে স্থানীয় পর্যায়ে সুশাসন ও উন্নয়ন কার্যক্রম জোরদার করা হবে। তবে ঋণের প্রতিশ্রুতির অর্থ তাৎক্ষণিক ছাড় নয়। প্রকল্পের অগ্রগতি ও নির্ধারিত শর্ত অনুযায়ী অর্থ ছাড় হবে।
বেসরকারি খাতে ১৭টি উদ্যোগ: সরকারি পর্যায়ের সমঝোতার পাশাপাশি দুই দেশের বেসরকারি খাতেও ব্যবসায়িক সম্পর্ক সমপ্রসারণের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। জাপান এক্সটার্নাল ট্রেড অর্গানাইজেশনের (জেট্রো) উদ্যোগে আয়োজিত কার্যক্রমে বাংলাদেশ ও জাপানের প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ১৭টি বিনিয়োগ ও সহযোগিতা প্রকল্পের ঘোষণা দেয়া হয়। এসব উদ্যোগের লক্ষ্য দুই দেশের ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীদের মধ্যে যোগাযোগ বাড়ানো এবং নতুন বাণিজ্যিক অংশীদারিত্ব গড়ে তোলা।
গত ২৭শে অক্টোবর জাপানের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে তারেক রহমান ও সানায়ে তাকাইচির দ্বিপক্ষীয় বৈঠক হয়। পরে দুই নেতা যৌথ সংবাদ সম্মেলনে অংশ নেন এবং যৌথ বিবৃতি প্রকাশ করেন। বৈঠকে কৌশলগত অংশীদারিত্ব, আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতা এবং অর্থনৈতিক সহযোগিতা সমপ্রসারণ নিয়ে আলোচনা হয়।
যান্ত্রিক ত্রুটিতে ফ্লাইট বিলম্ব: সফর শেষে বৃহস্পতিবার স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ৬টার দিকে ঢাকার উদ্দেশ্যে যাত্রার প্রস্তুতি নেয় বিজি-৩৭৭ ফ্লাইটটি। বোর্ডিং শেষে উড়োজাহাজটিকে টার্মিনাল থেকে পুশব্যাক করা হয়। পরে রানওয়ের দিকে যাওয়ার সময় ককপিটে স্পয়লারে ত্রুটিসংক্রান্ত সংকেত দেখা যায়। নিরাপত্তার স্বার্থে পাইলট উড্ডয়নের সিদ্ধান্ত বাতিল করেন। এরপর উড়োজাহাজটিকে পার্কিং এলাকায় ফিরিয়ে নেয়া হয়। ত্রুটি শনাক্তের পর প্রকৌশলীরা পরীক্ষা ও মেরামতের কাজ শুরু করেন। ইঞ্জিনিয়ার সাদেকুল ইসলাম ভূঁইয়া ও প্রকৌশলী মান্নানের নেতৃত্বে একটি কারিগরি দল কাজ করে। মেরামত ও প্রয়োজনীয় পরীক্ষা শেষে স্থানীয় সময় রাত পৌনে ১১টার দিকে ফ্লাইটটি ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা হয়। ফ্লাইটটি রাত ২টায় ঢাকায় পৌঁছার কথা রয়েছে।
